‘রাকিব মরে প্রমাণ করলেন তিনি চোর নন’

আমানুর রহমান রনি
২৮ আগস্ট ২০১৭, ২২:০৪আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৭, ১১:৩১

রাকিবুল ইসলাম  

‘আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী একমাত্র বিপ্লব ভাই। কারণ আমি তাদের সবাইর চুরির ব্যাপারে কিছুই জানি না। আমার এতটুকুই ভুল হয়েছে, টেবিল গুছানোটা। আমি মনে করেছি, ভাই রাত্রে আসছিল ছিছি (সিসি) ক্যামেরা ঠিক করতে। এই মনে করে আমি ট্যাবিল (টেবিল) মুছেছি। কিন্তু তারপরও আমাকে সবাই দায়ী করে। তাই আমি নিজেকে শেষ করে দিলাম। আমাকে সবাই মাফ করে দিয়েন।’  রবিবার দুপুরে রাজধানীর কদমতলীর ২ নম্বর স্মৃতিধারা আবাসিক এলাকায় আত্মহত্যা করার আগে এই সুসাইড নোটটি লিখে যান মো. রাকিবুল ইসলাম ওরফে রাকিব বিশ্বাস (১৯)। পরে স্বজনরা তার প্যান্টের পকেট থেকে এই সুসাইড নোট উদ্ধার করেন। যা পুলিশ জব্দ করেছে।

নিহত রাকিবুল ইসলামের বাবার নাম রবিউল ইসলাম বিশ্বাস। তাদের গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির নলছিটি এলাকায়। বাবা রঙমিস্ত্রী। তারা দীর্ঘদিন ধরেই ২ নম্বর স্মৃতিধারার একটি টিনসেড বাড়িতে কেয়ারটেকার হিসেবে আছেন। ছোট্ট টিনসেড ঘরে বাবা রবিউল ইসলাম বিশ্বাস, মা মিনারা বেগম, ছোট ভাই আবু নাইম হোসেন ও বোন মীমের সঙ্গেই থাকতেন রাকিবুল। ছোট দুই ভাইবোন লেখাপড়া করলেও দারিদ্র্যের কারণে রাকিব লেখাপড়া করতে পারেননি। তাই ছোট বেলা থেকেই বিভিন্ন দোকানে সেলসম্যান হিসেবে কাজ শুরু করেন।

রাকিবুল ইসলামের সুসাইড নোট

রাকিবের ফুফাতো ভাই জসীম বিশ্বাস বাংলা ট্রিবিউনকে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘গত সেপ্টেম্বর থেকে কদমতলীর জিয়া স্মরনীর বিপ্লবের ত্বাহা ইলেক্ট্রনিক্স দোকানে সেলসম্যান হিসাবে কাজ করতেন রাকিব। গত ২৩ আগস্ট রাতে ওই দোকানের ভেন্টিলেটর ভেঙে চুরির ঘটনা ঘটে। কিন্তু মালিক বিপ্লব এ জন্য সেলসম্যান রাকিবকে দায়ী করেন। এ নিয়ে তাকে বকাঝকা করা হয়, মারধর করা হয়। এমনকি বিপ্লব এ নিয়ে কদমতলী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেন। এরপর কদমতলী থানা পুলিশ রাকিবকে দুই বার জিজ্ঞাসাবাদ করে। পুলিশ তাকে মারধর করে। বার বার চুরি হওয়া জিনিস ফেরত দিতে বলে। তাকেই বার বার চুরির জন্য দায়ী করা হয়। তারপরও দোকানে যেতেন রাকিব।’ তিনি বলেন, ‘গত ২৭ আগস্ট সকালে রাকিব দোকানে যান। দুপুর ২ টার দিকে প্রতিদিনের মতো দুপুরের খাবার খেতে বাসায় আসেন। গোসল করার কথা বলে পাশের বাড়ির আবুল কাশেমের বাড়ির নিচ তলার খালি ফ্ল্যাটে যান। অনেক সময় ধরে সে ওই বাসা থেকে বের না হওয়ায় তার মায়ের সন্দেহ হয়। এরপর তিনি জানালায় উঁকি দিয়ে দেখেন, একটি রুমের ভেতরে রাকিব ঝুলতেছেন। তিনি চিৎকার শুরু করেন। এ সময় রাকিবের বাবা ও আশেপাশের লোকজন ছুটে এসে দ্রুত ফ্ল্যাটে ঢুকতে যান। কিন্তু ভেতর থেকে সিটকিনি লাগানো ছিল। এরপর দরজা ভেঙে তাকে নামানো হয়। দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’ এ সময় তিনি বলেন, ‘রাকিব মরে প্রমাণ করলেন তিনি চোর নন।’

রাকিবের লাশের পাশে স্বজনরা

এই ঘটনার পর রবিবার রাতেই নিহতের মা মিনারা বেগম আত্মহত্যায় প্ররোচনা অভিযোগ এনে কমদতলী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা কেবল দোকানের মালিক বিপ্লবকেই আসামি করা হয়।

মিনারা বেগম এজাহারে উল্লেখ করেন, ‘‘রবিবার দুপুরে রাকিব বাসায় আসে। তখন আমাকে বলে, ‘বিপ্লব আমাকে চোর বলে অপমান করেছে। আমাকে মরে যেতে বলেছে। এই লজ্জা কোথায় রাখি মা?’ এই কথা বলে সে গোসলের প্রস্তুতি নেয়। আমার বাসায় পানি না থাকায় বেলা আড়াইটার দিকে আমাদের বাসার পাশের আবুল কাশের বাড়ির নিচ তলার দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্ল্যাটে গামছা নিয়ে গোসল করতে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে সে ফিরে না আসায় আমি বেলা ৩ টার দিকে ওই ফ্ল্যাটের পূর্বপাশের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি, সে ডাইনিং রুমে গামছা দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলতেছে। তখন আমার চিৎকারে আমার স্বামী, ছেলে-মেয়ে ও পাশের মানুষ ছুটে আসে। এরপর তাকে নামিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হয়।’

এজাহারে মিনারা বেগম আরও উল্লেখ করেন, ‘বিপ্লব তাকে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ায়, মানুষের সামনে চোর বলে তার গালে চড়থাপ্পড় মারাসহ বার বার মরে যেতে বলায় সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।’

রাকিবের কর্মস্থল ত্বাহা ইলেক্ট্রনিক্স দোকান

সোমবার দুপুরে রাকিবদের বাসায় গিয়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, ‘ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে রাকিবের লাশ নিয়ে বাসার পাশের রাস্তায় রাখা হয়েছে। লাশের পাশে মা মিনারা বেগম কাঁদছিলেন। তবে ঘটনার পর থেকে দোকানের মালিক বিপ্লবকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ। রাকিবকে দেখতে হাসপাতাল বা বাড়িতে দোকান মালিক যাননি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জিয়া স্মরনীর ত্বাহা ইলেক্ট্রনিক্স দোকানে গিয়ে প্রথমে বন্ধ দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর মধ্যবয়সী একজন নারী এসে দোকানটি খোলেন। এরপর এই প্রতিবেদকের সঙ্গে তার কথা হয়। তার নাম সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি নিজেকে দোকানের মালিক বিপ্লবের স্ত্রী বলে পরিচয় দেন। একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন বলেও জানান।

রাকিবের সুইসাইড নোটের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘রাকিব মরে গিয়ে আমাদের ফাঁসিয়ে গেছে। আমার দোকানের জিনিসও গেলো, আবার আসামিও হলাম।’ তিনি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘২৪ আগস্ট সকালে দোকান খোলে রাকিব। সে দোকানে এসে এই অবস্থা দেখে আমাদের ফোনে জানায়নি।  সবকিছু গুছিয়ে রাখে। আমরা পরে এসে দেখি, দোকানের ল্যাপটপ নেই, ক্যাশের টাকা নেই। সিসি ক্যামেরার তার কাটা।’ তিনি ছোট্ট একটি ভেন্টিলেটর দেখিয়ে বলেন, ‘ওটা দিয়ে কি কোনও মানুষ ঢুকতে করতে পারে? কিভাবে ওই জায়গা থেকে ১৬ ইঞ্চি ল্যাপটপ বের হবে? আমরা তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। জিডি করেছি। সে আত্মহত্যা করেছে বাড়িতে। ঘটনার দিন সকালে সে দোকান খোলে, দুপুরে এক লেবারের কাছে চাবি দিয়ে চলে যায়। এরপর কী হয়েছে, তা আমরা জানি না।’

ময়নাতদন্ত শেষে লাশ নেওয়ার পর প্রতিবেশীর ভিড়

সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘রাকিবকে আমি ছেলের মতো দেখতাম। তাকে বিশ্বাস করতাম। কেন সে এমন করলো, আমরাও বুঝতে পারছি না।’

এর আগে কখনও চুরির ঘটনা ঘটছে কিনা? এর জবাবে তিনি বলেন, ‘না, এর আগে এমন কিছু ঘটেনি।’

রাকিব যে দোকানে কাজ করতেন, সেই দোকানের পাশের একটি দোকান মালিক বলেন, ‘আমরা খারাপ কিছু কখনও এই ছেলের মধ্যে দেখিনি।’

জানতে চাইলে কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়াজেদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ঘটনার পরপরই মামলা নিয়েছি। একজনকে আসামি করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’ তিনি বলেন, ‘রাকিব চুরি করেননি। আমরা বিষয়টি জানতে পেরেছি। তাকে অপবাদ দেওয়ায় তিনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। তাই মামলায় আসামির বিরুদ্ধে আত্মহত্যা প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে।’

/এমএনএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক