বর্তমানে দেশে সবচেয়ে বেশি আলোচিত মাদকের নাম ইয়াবা। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পরবর্তী সময়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া এ মাদক ঠেকাতে কঠোর নজরদারি করে আসছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে তাদের ইয়াবা ঠোকানোর কাজে এই ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে অবাধে ঢুকে পড়েছে ফেনসিডিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশেষ কোনও মাদকের প্রতিরোধে যখন প্রায় সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যস্ত থাকে, তখন অন্য মাদকের ওপর নজরদারি কিছুটা কমে। এই সুযোগে বিকল্প আরেকটি মাদক প্রবেশ করে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে ১২ লাখ ৯৭ হাজার ২৫৯ পিস। ২০১৭ (জানুয়ারি-অক্টোবর) সালে ৮ লাখ ৩১ হাজার ৫৫৫ পিস ইয়াবা। এদিকে ২০১৬ সালে ফেনসিডিল আটক হয়েছে ২৩ হাজার ৪৭০ বোতল। আর ২০১৭ (জানুয়ারি-অক্টোবর) সালে আটক হয়েছে ২৩ হাজার ৯৯৪ বোতল ফেনসিডিল।
জানা গেছে, নিজেদের জব্দকৃত মাদকের হিসাব রাখার পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থার জব্দ করা মাদকের হিসাবও রাখে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। ২০১৬ সালে সব সংস্থা ইয়াবা উদ্ধার করেছে ২ কোটি ৯৪ লাখ ৩২ হাজার ৬৭৮ পিস। ২০১৭ (জানুয়ারি-অক্টোবর) সালে উদ্ধার করেছে ৩ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৭২৭ পিস ইয়াবা। অন্যদিকে ২০১৬ সালে ফেনসিডিল জব্দ হয়েছে ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৫১২ বোতল। ২০১৭ (জানুয়ারি-অক্টোবর) সালে ৫ লাখ ৯১ হাজার ২০৯ বোতল।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদর দফতর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে ১ কোটি ৪৯ লাখ ৬৬ হাজার ৮৯১ পিস এবং একই সময়ে ফেনসিডিল জব্দ করা হয়েছে ২ লাখ ৯৩ হাজার ৪৫৮ বোতল।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চলের সহকারী পরিচালক (ঢাকা উত্তর) মোহাম্মদ খোরশিদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কয়েকবছর ধরে ফোকাস বেশি রয়েছে ইয়াবার দিকে। আবার এখন দেখছি ইয়াবার পাশাপাশি ফেনসিডিলও আসা বাড়ছে। কোনও একটির দিকে বেশি ফোকাস দিলে অন্য মাদকের চালান বেড়ে যায়।’
মাদক নির্মূলে কর্মরত সংশ্লিষ্ট একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তার দাবি, কোনও একটি মাদক নির্মূলের লক্ষ্য নিয়ে গোয়েন্দারা কাজ করেন না। সব ধরনের মাদকই টার্গেটে থাকে। কিন্তু যে সময়ে যে মাদকের প্রচলন বেশি থাকে, সে সময় সেসব মাদকদ্রব্য ঠেকাতে বেশি কাজ করা হয়। এটা করতে গিয়ে বিশেষ একটিতে ফোকাস হয়ে যায়। তখন ফোকাস হওয়া মাদকদ্রব্যটি সীমান্ত পেরিয়ে দেশের ভেতরে আনাসহ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগে অন্য একটি মাদকের দিকে আগ্রহ দেখায় মাদক ব্যবসায়ীরা। এভাবে একটি মাদকদ্রব্যকে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর কড়াকড়ি চলার সময় অন্য আরেকটি মাদকদ্রব্য ফাঁক গলে ঢুকে পড়ে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মাদক নির্মূল টিমের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ‘আমরা একক কোনও মাদক নিয়ে কাজ করি না। এরপরও কোনও একটির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়। তখন সে সুযোগটা মাদক ব্যবসায়ীরা কাজে লাগিয়ে বিকল্প মাদক নিয়ে আসে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফেনসিডিলের প্রচলন আগেও ছিল। মাঝখানে কিছুদিন কম এসেছে। তখন ইয়াবা এসেছে প্রচুর। এখন আবার নতুন করে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিলের চোরাচালান বেড়েছে।’
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের(দক্ষিণ) সহকারি কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যেকোনও মাদকের রেসপন্স পেলে সেটা নিয়ে কাজ করি। এখানে আলাদা কোনও মাদকদ্রব্য নিয়ে কাজ করা হয় না। তবে কখনও কখনও গ্যাপ সৃষ্টি হতে পারে। সেটা আমরা সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করি।’
দেশের ভেতরে মাদক পাচার প্রতিরোধে হাইওয়ে পুলিশ বড় ভূমিকা পালন করছে বলে দাবি করেছেন হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি আতিকুল ইসলামের। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এ বছর মাদক জব্দের পরিমাণ বেড়েছে। গত বছর ৬ কোটি টাকা মূল্যের মাদক জব্দ করা হয়। এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ কোটি টাকায়।’
ইয়াবার ঠেকাতে গিয়ে ফেনসিডিল প্রবেশ বেড়েছে কিনা এমন প্রশ্নে এই ডিআইজি বলেন, ‘দু’টি মাদক দ্রব্যে রুট আলাদা আলাদা। দুইটি দুই অঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করে। একটা বাদ দিয়ে অন্যটাতে জোর দেওয়া হচ্ছে, এমনটা বলা যাবে না। আমি দায়িত্বে আসার পর থেকে জঙ্গি ও মাদক নির্মূলে কাজ করে যাচ্ছি। যার সাফল্য পাচ্ছি। প্রচুর মাদকদ্রব্যসহ জড়িতদের আটক, গ্রেফতার করা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ছাড়া বাড়ছে, না কমছে সেটা বলা যাবে না।







