বহুল আলোচিত ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬’-(আইসিটি আইন)-এর ৫৭ ধারা বিলুপ্ত করে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের খসড়া অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উঠছে কাল (সোমবার, ২৯ জানুয়ারি)। এই খসড়ায় চারটি নতুন ধারা অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই খসড়াটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে কাল সকাল ১০টায় তেজগাঁওস্থ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই সভা বসবে।
জানা গেছে, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো নতুন এই আইনের খসড়ায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর ধারা ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭, ও ৬৬ বিলুপ্তির জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি অনুমোদন হলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহল থেকে তোলা দাবিটি পূরণ হবে। তবে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১-এর মতো বিধান রেখে এ সংক্রান্ত অপরাধ ও শাস্তিগুলোর ধরন বিন্যস্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২২ জুলাই মন্ত্রিসভা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়াটি নীতিগতভাবে অনুমোদন করা হয়। খসড়ায় জাতির পিতা, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা, প্রচারণা—এসবে মদদ দেওয়ার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল। কিন্তু যাবজ্জীবনের মতো কঠোর শাস্তির বিধান রাখায় সংশ্লিষ্ট সবাই একমত হতে পারেনি। সেই কঠোর অবস্থান থেকে এবার নমনীয় হয় সরকার। ফৌজদারি কার্যবিধি, দণ্ডবিধি ও কারাবিধি অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের অর্থ হচ্ছে ৩০ বছর কারাদণ্ড। এ অবস্থায় খসড়া আইনে অপরাধের শাস্তি কমিয়ে অনধিক ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত বিষয়গুলো একাধিক ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। চূড়ান্ত খসড়ায় একটিমাত্র ধারায় এগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধগুলো ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের কয়েকটি ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে নীতিগতভাবে অনুমোদিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ার ধারা ১৯-এ মানহানি, মিথ্যা ও অশ্লীল, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং ধারা ২০-এ শত্রুতা সৃষ্টি ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতিসংক্রান্ত বিধান রাখা হয়েছিল। এসব বিষয় একইসঙ্গে দণ্ডবিধির ধারা ৪৯৯ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর ধারা ৫৭-এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের চারটি ধারা ২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১-এ এসংক্রান্ত অপরাধ ও শাস্তিগুলো বিন্যস্ত করা হয়েছে।
২৫ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ইচ্ছাকৃতভাবে আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শনমূলক তথ্য দেন, ব্যক্তিকে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ করতে পারে এমন তথ্য প্রকাশ করেন, মিথ্যা জানা থাকার পর কোনও ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য তথ্য প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, তাহলে এটা অপরাধ হবে। প্রথম দফায় এ অপরাধের শাস্তি হবে তিন বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দান। এসব অপরাধ দ্বিতীয় বার বা বার বার করলে অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
ধারা ২৮-এ বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় অনুভূতি বা মূল্যবোধে আঘাত করার জন্য ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ করে, তাহলে সাত বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বার বার করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড একসঙ্গে দেওয়া হবে।
২৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি ওয়েবসাইটে পেনাল কোডের সেকশন ৪৯৯-এ বর্ণিত অপরাধ করেন, তাহলে তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানির কথা বলা হয়েছে। এ অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধানের প্রস্তাব করা হয়েছে।
৩১ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন যা বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় তাহলে তা অপরাধ হবে। এ অপরাধের জন্য সাত বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। দ্বিতীয়বার বা বারবার এ অপরাধ করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। খসড়া আইনে এ ধারাটিকে অজামিনযোগ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অপরাধের গুরুত্ব ও দণ্ডের মাত্রার ভিত্তিতে ১৭, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪—এই ১৫টি ধারার অপরাধকে অজামিনযোগ্য করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের (আইসিটি আইন) ৫৭ ধারার আওতায় মামলা করে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে হয়রানি করার পরিপ্রেক্ষিতে ৫৭ ধারা বাতিলের জন্য সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহল থেকে দাবি তোলা হয়। এসব দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার নতুন আইন করছে।
আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে অনধিক দশ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।








