রাজধানীর শাঁখারীবাজারে দোল পূর্ণিমার আবির উৎসবে কলেজছাত্র রওনক হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীকে শনাক্ত করা গেলেও এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তবে তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। যেকোনও সময় তাকে গ্রেফতার করা হতে পারে।
গত ১ মার্চ দুপুর ১২টার দিকে পুরনো ঢাকার শাঁখারীবাজার এলাকায় হোলি উৎসবে ভিড়ের মধ্যেই দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন কলেজছাত্র রওনক হোসেন রনো (১৭)। এ ঘটনায় গত সোমবার (৫ মার্চ) রাতে রিয়াজ আলম ওরফে ফারহান, ফাহিম আহম্মেদ ওরফে আব্রো, ইয়াসিন আলী, আল আমিন ওরফে ফারাবী খান ও মায়শা আলম ওরফে লিজা আক্তারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি চাকুও উদ্ধার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ বলছে, গ্রেফতার হওয়া আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রওনক হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীর নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অবস্থান নিশ্চিত হলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একটি গ্রুপের নাম সামনে এসেছে। তবে ওই গ্রুপের কাউকে এখনও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। সেই সঙ্গে চলছে গ্রেফতারের চেষ্টাও।।
লালবাগ বিভাগের কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) বদরুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রওনক হত্যার ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত পাঁচ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
তিনি বলেন, ‘গ্রেফতার করা আসামিদের তিন দিনের রিমান্ডে আনা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। হত্যার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে ছিল ২০ থেকে ২৫ জন। এদের অনেকে মোবাইল নম্বর বন্ধ করে রেখেছে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে পুলিশ ও নিহতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিহত রওনকের সঙ্গে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীর দীর্ঘদিন ধরে কিছু বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল। একটি মোবাইল ফোনসেট (দাম ১৬ হাজার টাকা) নিয়ে রওনকের সঙ্গে তার ঝামেলা হয়। এছাড়াও অর্থ সংক্রান্ত বিষয় এবং প্রেম নিয়েও ঝামেলা হয় তাদের। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি তাদের ঝামেলা বড় আকার ধারণ করে। এর ধারাবাহিকতায় ১ মার্চ সকালে আসামি মায়শা আলমের সহায়তায় রওনককে শাঁখারীবাজারে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী মারধর ও ছুরিকাঘাতে রওনককে হত্যা করা হয়।
আরও জানা যায়, মায়শার সঙ্গে রওনকের একসময় প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর অন্য আরেক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে রওনক। ওই মেয়েকে অন্য এক ছেলে পছন্দ করতো। রওনকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠায় মেয়েটির ওপর সেই ছেলে ক্ষুব্ধ হয়। এ নিয়ে রওনক ও ওই ছেলের মধ্যে একাধিকবার কথাকাটাকাটি ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে। তারা একে অন্যকে হত্যার হুমকিও দিয়েছে। তবে এ হত্যার ঘটনায় মেয়েটির কোনও সংশ্লিষ্টতা পায়নি পুলিশ।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তদন্তে অর্থ ও মোবাইল ফোনসেট সংক্রান্ত ঝামেলার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে মূলত প্রেম সম্পর্কিত বিষয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
রওনকের বন্ধুদের সস্পর্কে জানা গেছে, রওনক, মায়শা কিংবা তাদের বন্ধুদের কেউ কোনও এক নির্দিষ্ট এলাকার নয়। তারা বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করে এবং আলাদা আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পড়ে। অনেকে আবার লেখাপড়াও করে না। ফেসবুকের মাধ্যমেই তাদের মধ্যে যোগাযোগ এবং সম্পর্ক তৈরি হয়। মাঝে-মধ্যেই তারা একসঙ্গে ঘোরাফেরা করতো এবং আড্ডা দিতো। আগেও পুরান ঢাকার প্রায় অনুষ্ঠানেই তারা অংশগ্রহণ করতো।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, অভিযুক্ত আসামি প্রত্যেকের ফেসবুক পর্যালোচনা এবং তদন্তে তাদের বিভিন্ন বখাটেপনার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ইব্রাহিম খাঁন বলেন, ‘আসলে এখনকার তরুণরা কী করছে? কোথায় যাচ্ছে? এসব বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে।’ উঠতি বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে তাদের পরিবারকে আরও সচেতন হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।








