নাখালপাড়ায় গৃহকর্ত্রী খুন: বাসা ভাড়া নিতে ঘরে ঢুকে হত্যাকারী

শেখ জাহাঙ্গীর আলম
০৯ মার্চ ২০১৮, ০২:০০আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৮, ১০:০০

নিহত আমেনা বেগম তেজগাঁওয়ে পশ্চিম নাখালপাড়ায় ২৮৮ নম্বর বাড়ি ‘রসুল ভিলা’। পাঁচতলা ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় বসবাস করেন বাড়ির মালিক। ভবনের  নিচতলা ও চতুর্থ তলায় দুটি ফ্ল্যাট খালি। এজন্য বাড়ির সামনে টু-লেট সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। 

বৃহস্পতিবার (৮ মার্চ) দুপুরে ওই বাসায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে এসে গৃহকর্ত্রী আমেনা বেগমকে (৬৫) কুপিয়ে হত্যা করে এক দুর্বৃত্ত। হত্যার পর ওই গৃহকর্ত্রীর গলার চেন ও হাতে থাকা স্বর্ণের চুড়ি খুলে নিয়ে যায় ভাড়াটিয়াবেশী খুনি।

এ ঘটনার সঙ্গে ২০১৬ সালে রাজধানীর দক্ষিণখানে তিন গৃহকর্ত্রী খুন ও দুজনের আহত হওয়ার ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। মাত্র তিন মাসের মধ্যে বাসা ভাড়া নিতে আসা যুবকের হাতে সিরিয়াল কিলিংয়ের ওই ঘটনাগুলো ঘটেছিল। যার কূল কিনারা এখনও করতে পারেনি পুলিশ। খুনিও অধরাই রয়ে গেছে।

নিহত আমেনা বেগমের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দুপুরে এক যুবক বাসার কলিংবেল চাপলে গৃহকর্ত্রী আমেনা বেগম দরজা খুলেন। ওই যুবক বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা জানালে তাকে তিনি নিচতলায় ফ্ল্যাট দেখাতে নিয়ে যান। সেখানে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায় ওই যুবক।  

পুলিশ বলছে, ভবনের নিচতলায় খালি ফ্ল্যাটটির রান্নাঘরের ভেতর ধারালো অস্ত্র দিয়ে আমেনা বেগমের মাথার পেছনে আঘাত করা হয়েছে। এতে তার মাথা অনেকখানি থেঁতলে যায়।

পুলিশের তেজগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপ- কমিশনার (এডিসি) সাত্যকি কবিরাজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনার তদন্ত একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ করছি। কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এখনই তা বলা যাচ্ছে না।’ 

বাসাটির সামনে ঝুলানো টু-লেট নিহতের ছোট ছেলের স্ত্রী বর্ষা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুপুর ২টার পরপর কলিংবেলের শব্দ শুনে আমার শাশুড়ি ঘরের দরজা খোলেন। এক যুবক বাসা ভাড়া নিতে আসে, কোন তলায় ভাড়া হবে জানতে চায়। শাশুড়ি জানান, নিচতলা ও চার তলায় ভাড়া হবে। ছেলেটি শাশুড়িকে নিচ তলা দেখাতে বলে। তখন আমি আর আমার শাশুড়ি ঘরে ছিলাম। তিনি ওই ছেলের সঙ্গে নিচতলায় যান। ২০ মিনিটের বেশি সময় পরেও তিনি আসছেন না দেখে আমি নিচে যাই। নিচতলার ডান পাশের খালি ফ্ল্যাটের দরজা খোলা ছিল। ভেতরে গিয়ে দেখি রান্নাঘরে রক্তাক্ত অবস্থায় আমার শাশুড়ি পড়ে আছেন; মেঝেতে রক্ত ছিটকে পড়ে আছে। ওই ছেলেকে পাইনি। পরে তাকে স্থানীয় মেট্রোপলিটন হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখান থেকে সরকারি হাসপাতালে নিতে বলা হয়। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার মৃত্যু হয়।’

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিটের পরিদর্শক মোর্তাজা কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু আলামত জব্দ করা হয়েছে। নিহতের মাথার খুলির টুকরো পেয়েছি। ঘটনাস্থল থেকে চুল পাওয়া গেছে, তবে এটি নিহতের নাকি হত্যাকারীর, সেটি ল্যাবে পরীক্ষা করলে জানা যাবে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘নিহতের মাথায় দুটি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ধারণা করছি, হত্যাকারী ধারালো ও ভারি কোনেও অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এছাড়া, শরীরের কোথাও আঘাতের চিহ্ন যাওয়া যায়নি।’ 

রসুল ভিলার নিচতলার অন্য ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া মনি বেগম বলেন, ‘দুপুরে চিৎকার শুনে আমি দরজা খুলে ঘটনার খবর জানতে পারি। একটা ছেলে নাকি ঘর ভাড়া নিতে এসেছিল।’ 

তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা দায়ের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’ 

নিহত গৃহকর্ত্রী আমেনা বেগমের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। বড় ছেলে হান্নান বাড়ি দেখাশুনা করেন; মেঝ ছেলে নাসির উদ্দিন ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান; ছোট ছেলে বাবু আহমেদ দেশের বাইরে থাকেন। একমাস আগে তিনি ছুটি নিয়ে দেশে ফিরেছেন। বাড়ির মালিক রসুল মিয়া তিব্বতে চাকরি করতেন। ২০০১ সালে তিনি মারা যান। এরপর থেকে আমেনা বেগম ছোট ছেলের সঙ্গে ভবনের দ্বিতীয় তলায় থাকতেন। বড় ছেলে তার পরিবার নিয়ে তৃতীয় তলায় থাকেন। এছাড়া, নিচতলা, চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় দুটি করে মোট ছয়টি ফ্ল্যাটে ভাড়াটিয়ারা থাকেন। গত মাসে নিচতলা ও চতুর্থ তলায় দুটি ফ্ল্যাট খালি হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বছর দুয়েক আগে রাজধানীর দক্ষিণখান এলাকায় ঘটে যাওয়া কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ধরনের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের অনেক মিল রয়েছে। হতে পারে এটিও সিরিয়াল কিলিংয়ের একটি। 

২০১৬ সালের ২৪ জুলাই দক্ষিণখানের উত্তর গাওয়াইরে বাসা ভাড়া নিতে এসে গৃহকর্ত্রী শাহিদা বেগমকে (৫০) নৃশংসভাবে খুন করে ভাড়াটিয়াবেশী দুর্বৃত্ত। পরদিনই দক্ষিণখানের আশকোনা মেডিক্যাল রোডে গৃহকর্ত্রী মাহিরা বেগমকে (৫০) কুপিয়ে আহত করা হয়। এর এক মাস পর ২১ আগস্ট দক্ষিণখানের তেঁতুলতলা ইয়াছিন রোডে গৃহকর্ত্রী সুমাইয়া বেগমকে (৫২) একইভাবে কুপিয়ে খুন করা হয়। এর ১০ দিন পর ৩১ আগস্ট দক্ষিণখানের মুন্সি মার্কেট এলাকায় জেবুন্নেছা চৌধুরীকে (৫৬) কুপিয়ে আহত করে অজ্ঞাত দুর্বৃত্ত। এরপর ৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণখানের উত্তর গাওয়াইরে ওয়াহিদা আক্তার সীমাকে (৪৮) একই কুপিয়ে খুন করা হয়।

 

 

 

/এএম/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম