মামলার এজাহারে যা উল্লেখ করেছেন অরিত্রীর বাবা

আমানুর রহমান রনি
০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:৫৮আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:১০

অরিত্রী অধিকারী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীকে (১৪) আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করে মামলা দায়ের করেছেন তার বাবা দিলীপ অধিকারী। পল্টন থানায় ৪ ডিসেম্বর তিনি মামলাটি দায়ের করেন। এ মামলার নম্বর ১০। ইতোমধ্যে পল্টন থানা পুলিশ মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। 

মামলার এজাহারে দিলীপ অধিকারী অভিযোগ করেছেন, ‘আমার মেয়ে অরিত্রী অধিকারী ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাতী শাখার শিক্ষার্থী। তার রোল নম্বর ১২, শাখা ক। অরিত্রী চলমান বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য গত ২ ডিসেম্বর স্কুলে যাওয়ার সময় বাসায় ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। পরীক্ষা চলাকালে সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকা আফসানা তার মোবাইল ফোনটি নিয়ে নেন এবং অভিভাবক হিসেবে আমাদেরকে পরের দিন স্কুলে যাওয়ার জন্য অরিত্রীকে জানিয়ে দেন। আমার মেয়ে পরীক্ষা শেষে বাসায় এসে বিস্তারিত আমাদের জানায়।

‘পরের দিন ৩ ডিসেম্বর আনুমানিক সকাল ১১টায় আমার স্ত্রী বিউটি অধিকারী ও মেয়ে অরিত্রী অধিকারীকে নিয়ে আমি স্কুলে যাই। সেখানে গিয়ে আমরা প্রথমে ক্লাস টিচার হাসনে হেনার কাছে যাই। তিনি আমাদের অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখেন এবং পরে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রভাতী শাখা প্রধান জিনাত আক্তারের কাছে নিয়ে যান। তিনি আমাদের দেখেই উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং আমাদেরকে বলেন, “আপনার মেয়েকে টিসি দিয়ে দেব।” তিনি রাগান্বিত অবস্থায় আছেন বুঝতে পেরে আমি তার কাছে ক্ষমা চাই। কিন্তু তিনি বলেন, “আমার কিছু করার নেই।” তখন আমরা অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) নাজনীন ফেরদৌসের সঙ্গে দেখা করতে যাই। আমার মেয়ে তার কাছে গিয়ে পা ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং মেয়ের ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা চিন্তা করে আমরাও করজোড় ক্ষমা চাই। তারপর আমরা একত্রে কেঁদে ফেলি। আমাদের ও অরিত্রীর ক্ষমাপ্রার্থনা কোনওটিই অধ্যক্ষের হৃদয় গলাতে পারেনি।

‘এরই মধ্যে আমাদের একটু পরে খেয়াল হলো অরিত্রী রুমে নেই। সে বাইরে থাকতে পারে ভেবে আমরা তাকে খোঁজাখুঁজি করি। কিন্তু তাকে কোথাও না পেয়ে বাসায় চলে আসি। বাসায় এসে দেখি সে রুমে আছে। আমরা আমাদের রুমে চলে যাই। আমি কিছুক্ষণ পর কাজে বাইরে চলে যাই। এর কিছুক্ষণ পর আমার স্ত্রী বিউটি অধিকারী আমার মোবাইলে ফোন করেন এবং বলেন, “অরিত্রীর রুম বন্ধ। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।” তিনি কী করবেন তা আমার কাছে জানতে চায়। আমি তখন বাসার কেয়ারটেকারের সঙ্গে তাকে যোগাযোগ করতে বলি। পরে আমার স্ত্রী ফোনের মাধ্যমে আমার বাসার কেয়ারটেকার সুখদেবকে ডেকে আনেন। তারপর রুমের সামনে বাথরুমের ভেন্টিলেটার দিয়ে তাকে রুমের ভেতরে ঢোকানো হয়। সে ভিতরে গিয়ে অরিত্রীকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায়।

‘পরে সে দরজা খুলে দেয়। তখন উপস্থিত ছিলেন আমার স্ত্রীর বান্ধবী মেরিনা মণ্ডল ও নীলিমা বিশ্বাস। তাদেরকে নিয়ে আমার স্ত্রী রুমে প্রবেশ করে। আমার স্ত্রী ও উপস্থিত ব্যক্তিরা সকলে অরিত্রীকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেন। তারা সকলে ধরাধরি করে নিচে নামিয়ে আনুমানিক বেলা ৩টার দিকে কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে অরিত্রীকে নিয়ে যায়। কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রওনা হয়ে যাই। সেখানে যাওয়ার পর সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক বিকাল ৪টা ৭ মিনিটে অরিত্রীকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে আমরা তার সুরতহাল রিপোর্ট পাই এবং ওইদিন ময়নাতদন্ত করাই। ময়নাতদন্ত নম্বর ১৮২১/২০১৮।

‘উপরোক্ত ঘটনায় সুস্পষ্ট যে, শিক্ষকদের নির্মম আচরণে মর্মাহত হয়ে আমার মেয়ে অরিত্রী অধিকারী আত্মহত্যায় বাধ্য হয়েছে। আসামিদের নির্মম ব্যবহার ও অশিক্ষকসুলভ আচরণ আমার মেয়েকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছে। আমি আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি ও আমার স্ত্রী উভয়েই অসুস্থ হওয়ায় মামলা দায়েরে বিলম্ব হয়েছে।’

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুবুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা মামলাটি আজকে (৫ ডিসেম্বর) পেয়েছি। ইতোমধ্যে মামলাটি পর্যালোচনা শুরু করেছি। এরপর প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখনও এ মামলায় কেউ গ্রেফতার হয়নি। তবে যখন যা প্রয়োজন আমরা করব।’

এদিকে অরিত্রী নিহতের পর টানা দুই দিন ধরে তার সহপাঠীরা বেইলি রোডে ছয় দফা দাবিতে পরীক্ষা বর্জন করে দিনব্যাপী বিক্ষোভ করেছে। তাদের ছয় দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে বলে জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা।

 

 

 

/এমএএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম