তৈরি পোশাক খাতের মজুরি কাঠামোতে গ্রেড বৈষম্য দূর করার দাবিতে আন্দোলনের নামে কারখানা ভাঙচুরসহ নানা ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টির নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করার দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এবার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এ নিয়ে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানান, 'আন্দোলনের নামে এখানে একশ্রেণির ষড়যন্ত্রকারীর অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। এই অরাজকতা সৃষ্টির পেছনে তাদের মদদ ছিল। তাদের ইন্ধন ছিল। তারা একটি রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকে দেশের রফতানিমুখী প্রধান এই খাতটিকে ধ্বংসের পাঁয়তারা করেছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের শনাক্ত করেছে, তাদের চিহ্নিত করেছে। এবার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পালা।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'কৌশলগত কারণেই মদদদাতাদের বা ইন্ধনদাতাদের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করা যাবে না। শ্রমিক আন্দোলনের নামে এই অরাজকতা যারা করেছে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তাদের চিহ্নিত করেছে। তাদের শনাক্ত করেছে। তাদের গতিবিধি নজরদরিতে রেখেছে সরকারের সংশ্লিষ্টরা।'
জানা গেছে, যারা পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য করেছে তাদের মধ্যে কয়েকজনের শ্রমিকনেতার পরিচয় রয়েছে। একই সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আঞ্চলিক কমিটির নিচের পর্যায়ের বেশ কিছু নেতাকর্মী। যারা বিভিন্ন সময় এ ধরনের আন্দোলনে উসকানি দিয়ে অরাজকতা সৃষ্টির পাশাপাশি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তাদের অনেককে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, ওই আন্দোলনে যেসব সংগঠনের শ্রমিক নেতাদের উসকানি ছিল সেসব সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন বাতিলও হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতিসাধন করা ও জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টির দায়ে অনেক অজ্ঞাত ব্যক্তির নামে স্থানীয় থানায় মামলা রয়েছে। শনাক্ত ব্যক্তিদের ওই মামলায় গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হতে পারে।
এর আগেও বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এবং শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান দুজনেই বলেছেন, এই আন্দোলনে অনুপ্রবেশকারী রয়েছে যারা শ্রমিক নয়। এ অবস্থায় হুঁশিয়ারি দিয়ে শ্রমিকদের কারখানায় ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন তারা। এই দুই মন্ত্রীই মনে করেন, কোনও শ্রমিক ধসংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে না। কারণ, মালিক ও শ্রমিক একই বাইসাইকেলের দুটো চাকার মতো। একটি না থাকলে আরেকটি চলবে না।
বাণিজ্যমন্ত্র ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকারের একাধিক সংস্থা এসব বিষয় নজরে রেখেছে। কারা এসবের সঙ্গে যুক্ত তাদের খুঁজে বের করতে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে কাজ করছে। এসব অরাজকতা রোধে সরকার বসে থাকবে না বলেও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মনশি ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান।
অন্যদিকে এই আন্দোলনের নেপথ্যের কারিগরদের খুঁজতে পুলিশসহ দেশের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ব্যাপক কাজ করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আফরোজা খান জানিয়েছেন, বেতনভাতার দাবিতে এ আন্দোলন হয়েছে, এমনটি মনে করার কোনও কারণ নেই। অন্য কারণ আছে। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, যেসব কারখানায় নিয়মিতভাবে স্ট্যান্ডার্ড বেতনভাতা দেওয়া হয় সেসব কারখানাও ভাঙচুর করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই নতুন গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের বেতনকাঠামো বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে একটি মহল পোশাক খাতে অসন্তোষ সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছে— এমন আশঙ্কা থেকে কঠোর নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছিল তৈরি পোশাক খাতকে। নির্বাচন শেষে বিজয়ী দলের নেতৃত্বে নতুন সরকারের শপথ ও দায়িত্বভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত এ নজরদারি চলে। তৈরি পোশাক কারখানা অধ্যুষিত নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, চট্টগ্রাম ও টঙ্গী এলাকা নজরদারির আওতায় ছিল। একই সঙ্গে কথিত শ্রমিক নেতা নামে পরিচিতদের গতিবিধিও নজরে রেখেছিলেন একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।
সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর থেকেই কার্যকর করা হয়েছিল তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের নতুন বেতনকাঠামো। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী শ্রমিকরা ডিসেম্বরের বেতন পেয়েছিলেন। নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে শুরু থেকেই শ্রমিকদের মধ্যে একধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল। সেটিকে কাজে লাগাতে চেয়েছিল ওই মহল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গার্মেন্টস শ্রমিক নেত্রী নাজমা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ আন্দোলনে কারা মদদ দিয়েছিল তা আমার জানা নাই। তা বের করার দায়িত্ব দেশের গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি মদদ দাতাদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনে, তাহলে তো ভালো কথা। তবে কোনও নিরাপরাধ ব্যক্তি যেন কষ্ট না পান, সেদিকে অধিকতর নজর রাখতে হবে।’
অন্যদিকে, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি বাবুল আখতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এমন এক সময় নির্বাচনি ইশতেহারে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার টাকা ঘোষণা করে যে, বিষয়টি শ্রমিকদের অনেকটাই উত্তেজিত করে তুলেছিল। কারণ, সরকার ন্যূনতম মজুরি দিয়েছে আট হাজার টাকা। কাজেই ওই আন্দোলনে এ বিষয়টি বড় ইন্ধন হিসেবে কাজ করেছে বলে আমার মনে হয়। তবে সব আন্দোলনেই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আন্দোলনে অন্যের ইন্ধন ছিল। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা হচ্ছে। বহিরাগতরা আন্দোলনে জড়িত রয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু ওই আন্দোলন শেষে যে মামলা হয়েছে, সেখানে বহিরাগত কারও নাম নাই। সব মামলার আসামি করা হয়েছে গার্মেন্টস শ্রমিকরদের।’
এক প্রশ্নের জবাবে বাবুল আকতার বলেন, ‘শ্রমিকদের আন্দোলনে যারা অসৎ উদ্দেশ্যে বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মদদ দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে নিরাপরাধ কোনও শ্রমিক যেন এর শিকার না হন, সে দিকটি বিবেচনায় রাখার অনুরোধ করছি।’
উল্লেখ্য, গত ৭ জানুয়ারি নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের দিন থেকে এই শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সরকার মনে করেছে, শেখ হাসিনা যখন চতুর্থবারের মতো সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণের উদ্দেশ্যে শপথ নিতে যাচ্ছেন ঠিক সেই মুহূর্তে এই আন্দোলন সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই, এতে কোনও সন্দেহ নেই। এই আন্দোলনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীরা প্রমাণ করতে চায়, যে মুহূর্তে সরকার জমজমাট অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শপথ নিচ্ছেন ঠিক সেই সময় দেশের শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরির দাবিতে রাস্তায় আন্দোলন করছে। এই বার্তা বহির্বিশ্বে প্রচারিত হলে সরকারের তথা নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।








