বৃহত্তর দিনাজপুরে (দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলা) ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত এক বছরে ২৫ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেফতার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, দিনাজপুর ২৫টি দুর্নীতির মামলা দায়ের করেছে। এসব মামলায় গ্রেফতার হয় ৩০ জন, যার মধ্যে ২৫ জনই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। সংস্থাটির দিনাজপুরের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, মামলা, অভিযান ও গ্রেফতারের তথ্য পর্যালোচনা করে এমন তথ্যই মিলেছে।
প্রসঙ্গত, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, দিনাজপুরের আওতায় রয়েছে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলা।
তবে ওই অঞ্চলে এর আগের অভিযান ও গ্রেফতার খুব বেশি আলোচিত হয়নি, যতটা হয়েছে এবার হয়েছে ঘুষের পৌনে ২ কোটি টাকাসহ দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) তাজুল ইসলাম গ্রেফতার হওয়ার পর। বৃহস্পতিবার (৯ জানুয়ারি) গ্রেফতার হন তাজুল।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, দিনাজপুর, ২৫টি দুর্নীতির মামলা দায়ের করেছে। এসব মামলায় গ্রেফতার হয় ৩০ জন। সমন্বিত জেলা কার্যালয়, দিনাজপুরের উপ-পরিচালক আবু হেনা মো. আশিকুর রহমান জানান, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ২৫ জনই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী।
ঘটনা-১
ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের অভিযোগে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তাজুল ইসলামকে বৃহস্পতিবার আটক করে দুদক। পার্বতীপুর উপজেলায় তার অফিস ও বাসা থেকে অভিযান চালিয়ে প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়। পার্বতীপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। দুদকের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘পিআইও তাজুল ইসলাম তার অফিস ও বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া টাকার উৎস জানাতে পারেননি। একজন পিআইও’র পক্ষে ঘুষ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার ছাড়া এই টাকা আয় করা সম্ভব নয়।’
ঘটনা-২
গত বছরের ২৮ জুলাই রাত সাড়ে ৮টার দিকে ৬০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার সময় হাতনাতে গ্রেফতার হন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ দিনাজপুর ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবদুল ওয়াদুদ। দুদক জানায়, রাজধানীর সেগুনবাগিচায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ৬৩তম ভূমি বরাদ্দের সভায় দিনাজপুর উপ-শহরের ই/৬ নম্বর বাড়িটি নাজমাতুন নাহারকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বাড়িটি বুঝিয়ে দিতে দেড় লাখ ঘুষ টাকা দাবি করেন নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী। ঘুষ না দেওয়ায় দেড় বছর ধরে হয়রানি হতে হয় নাজমাতুন নাহারকে। পরে তিনি দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। একপর্যায়ে অভিযান চালানো হয়। নাজমাতুন নাহারের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা নেওয়ার সময় হাতেনাতে গ্রেফতার হন প্রকৌশলী দেলোয়ার ও ওয়াদুদ। এ বিষয়ে একটি মামলা হয় দিনাজপুরের কোতোয়ালী থানায়।
ঘটনা-৩
গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ঘুষের ৩০ হাজার টাকাসহ গ্রেফতার হন দিনাজপুর জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের অডিটর আনোয়ার পাশা ও তুলা উন্নয়ন বোর্ডের ক্যাশিয়ার ফেরদৌস হোসেন। ফরহাদ হোসেন নামে এক ব্যক্তির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে দুদক।
যে কারণে গ্রেফতার অডিটর ও ক্যাশিয়ার: দুদক জানায়, ফরহাদ হোসেনের বাবা খলিলুর রহমান তুলা উন্নয়ন বোর্ডের গো-পালক পদে চাকরি করতেন। ২০১২ সালে অবসরে যান তিনি। মারা যান ২০১৬ সালে। খলিলুর রহমান জীবিত থাকা অবস্থায় তুলা উন্নয়ন বোর্ড ও হিসাবরক্ষণ অফিসের কয়েকজন ঘুষ দাবি করেছিলেন। তিনি তা দেননি। ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল হিসাব দেখিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পেনশন কম দেওয়া হয় তাকে। বলা হয়, ঘুষ দিলে ভুল সংশোধন করা হবে। এ নিয়ে দফায় দফায় দেনদরবার করেও কোনও প্রতিকার হচ্ছিল না। সর্বশেষ গত বছরের আগস্টে ফরহাদ তুলা উন্নয়ন বোর্ডের ক্যাশিয়ার ফেরদৌসের সঙ্গে কথা বলেন। ফেরদৌস ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। বলেন, এই টাকা তিনি ও আনোয়ার পাশা দু’জনে মিলে নেবেন। এ অবস্থায় ফরহাদ ১০ হাজার টাকা ফেরদৌস ও আনোয়ারকে দেন। তখন তাকে বলা হয় বাকি ৪০ হাজার টাকা না দেওয়া পর্যন্ত কাজ হবে না। একপর্যায়ে ফরহাদ ৩০ হাজার টাকা দিতে রাজি হন। পরে বিষয়টি দুদককেও জানান তিনি। দুদকের অভিযানে ঘুষের টাকাসহ গ্রেফতার হন ফেরদৌস ও আনোয়ার।
ঘটনা-৪
গত বছরের ১৩ নভেম্বর পাঁচটি ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে ৬ মেট্রিক টন চাল আত্মসাতের অভিযোগে এক জনপ্রতিনিধি ও পাঁচ সরকারি কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ২১ নম্বর ঢোলারহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়রম্যান সীমান্ত কুমার বর্মণ নির্মল, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) গোলাম কিবরিয়া, ঠাকুরগাঁও সদর খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিপ্লব কুমার সিংহ রায়, ঠাকুরগাঁও জেলার গড়েয়াহাট খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাঈদুল ইসলাম, ঠাকুরগাঁও সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিন আহম্মদ ও ঠাকুরগাঁওয়ের শিবগঞ্জ খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম গোলাম মোস্তফা। গ্রেফতারকৃতরা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ঠাকুরগাঁও জেলার মাহালিয়াহাট বাজার জামে মসজিদ, মাধবপুর উন্নয়ন যুব সংঘ, মাধবপুর ফোরকানিয়া মাদ্রাসা, মাধবপুর রামকৃষ্ণ মন্দির ও ব্যারিস্টার জামে মসজিদের নামে পাঁচটি প্রকল্প দেখিয়ে ৬ মেট্রিক টন চাল আত্মসাৎ করেন।
দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, দিনাজপুর জানায়, সরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ বেশি জমা হয়। এছাড়া অভিযোগ কেন্দ্রেও (হটলাইন-১৬) অভিযোগ করেন অনেকে। সরাসরি ঘুষ নেওয়ার অপরাধে গত বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে ১০ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। মামলা হয় ৭টি। একই সময়ে অন্য ১৮টি মামলা হয়েছে যাচাই-বাছাই ও অনুসন্ধানসহ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। ওই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গ্রেফতার হয়েছেন ২০ জন।








