নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সদস্যরা কারাগারে বসেই তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। যোগাযোগ করছে বাইরে থাকা জঙ্গিদের সঙ্গে। আত্মীয় পরিচয় দিয়ে হর-হামেশা দেখা করে সাংকেতিক ভাষায় নির্দেশনা আদান-প্রদানও করছে। কারাগারে বন্দি থাকা শীর্ষ জঙ্গিদের বিভিন্ন নির্দেশনা ও জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধকরণের বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে অন্যদের। এছাড়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যরা অনলাইন ও বিভিন্ন সুরক্ষিত অ্যাপসের মাধ্যমে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।
শনিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার উপকণ্ঠ আশুলিয়া ও ধামরাই এলাকা থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ৫ সদস্যকে গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য পেয়েছে র্যাব। গ্রেফতারকৃতরা হলো, অলিউল ইসলাম সম্রাট ওরফে আব্দুল্লাহ, মোয়াজ্জিম মিয়া শিহাদ ওরফে আল্লাহর গোলাম, সবুজ হোসেন আব্দুল্লাহ এবাজ উদ্দিন, আরিফুল হক আরিফ ওরফে হৃদয় ও রাশিদা হুমায়রা। র্যাব-৪ এর একটি দল শুক্রবার রাতে তাদের গ্রেফতার করে।
র্যাব-৪ এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, ‘কারাগারে থাকা জঙ্গিদের নির্দেশনা বাইরে আসছে। গ্রেফতারের পর সাধারণত জঙ্গিরা একেকজন একেক সেলে থাকে। সেখানে কারও সঙ্গে দেখা করার সুযোগ কম। কিন্তু যখন আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করে তখন পরোক্ষভাবে বাইরের জঙ্গিরা আত্মীয় পরিচয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করছে। এভাবেই জেলের ভেতরে থাকা শীর্ষ জঙ্গিদের বিভিন্ন বার্তা বাইরে আসছে এবং তা বাইরে থাকা জঙ্গিদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের সঙ্গে স্বজনরা দেখা করার সময় গোয়েন্দা সংস্থার লোকদের থাকা উচিত। এটা হলে জেলখানা থেকে জঙ্গিবাদের যে তথ্য আসছে সেটা বন্ধ হবে।’
গ্রেফতারকৃতদের বরাত দিয়ে র্যাব কর্মকর্তারা জানান, নিষিদ্ধ ঘোষিত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সদস্যরা জেলখানা থেকেই জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। গ্রেফতার হওয়া অলিউল ইসলাম জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, সে এইচএসসি পাস করে কিছুদিন স্থানীয় মসজিদে আরবি শিক্ষা নেয়। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সক্রিয় সদস্য হিসাবে রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসী কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার কারণে গত বছর আশুলিয়া থানায় তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা হয়। ওই মামলায় দুই মাস জেলে ছিল সে। জেলখানায় থাকাকালীন তার সঙ্গে দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের সঙ্গে পরিচয় হয়। শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের কাছ থেকে সে জঙ্গিসংক্রান্ত কার্যক্রমে আরও দিকনির্দেশনা নিয়ে দক্ষতা অর্জন করে।
র্যাব সূত্র জানায়, অলিউল জামিন নিয়ে বাইরে এসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন অ্যাপস-এর মাধ্যমে জঙ্গি কার্যক্রম চালাতে থাকে। একইসঙ্গে সে একটি উগ্রবাদী চ্যানেলের অ্যাডমিন হিসাবে উগ্রবাদী প্রচারণা ও সদস্য সংগ্রহের প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল। বর্তমানে সে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের দক্ষিণ অঞ্চলের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করে আসছিল।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতার হওয়া মোয়াজ্জিম মিয়া ছাত্রজীবন থেকেই জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। বর্তমানে সাভারের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোয়াজ্জিম জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে ফেসবুকে আনাস আদনান নূর নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। আনাসের মাধ্যমে তিনি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। বর্তমানে তিনি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সক্রিয় সদস্য। মেসেঞ্জারে একটি উগ্রবাদী গ্রুপের অ্যাডমিন হিসাবে দায়িত্ব পালন করতেন। আল্লাহর গোলাম নামে একটি ফেসবুক আইডির মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ এবং উগ্রবাদের উদ্দেশ্যে চাঁদা সংগ্রহ করতেন। তার কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের রেজিস্ট্রারও উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া সশস্ত্র জিহাদ করার প্রস্তুতি হিসেবে ফিট থাকার জন্য নিয়মিত অনুশীলন করে আসছিলেন।
র্যাবের একজন কর্মকর্তা জানান, গ্রেফতার হওয়া সবুজ হোসেন ও আরিফুল ইসলাম জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে মোয়াজ্জিমের হাত ধরে। সবুজ ভয়েস অব ইসলাম নামে একটি গ্রুপের অ্যাডমিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিল। এছাড়া গ্রেফতার হওয়া নারী জঙ্গি রাশিদা ওরফে হুমায়রা একটি মাদ্রাসা থেকে ৮ম শ্রেণি পাস করার পর ২০১০ সালে বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের তিন বছরের মাথায় বিচ্ছেদ হয়। এরপর ২০১৪ সালে সে দুবাই চলে যায়। দুবাই থেকে এসে ২০১৭ সালে আবার কাতারে যায়। কাতারে থাকা অবস্থায় ফেসবুকে মোয়াজ্জিমের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। মোয়াজ্জিমের মাধ্যমেই আনসারল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় সে। দুই মাস আগে দেশে ফিরে পুরো উদ্যমে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কার্যক্রমে সক্রিয় হয়। তাকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নারী সদস্য সংগ্রহ ও সংগঠিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অনলাইনে সে ‘ইনশাআল্লাহ আমি মুজাহিদা’ নামক একটি ফেসবুক আইডি পরিচালনা করতো।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছে তারা এখন অনলাইনের মাধ্যমে জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এজন্য ফেসবুক ছাড়াও বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে তারা। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আনসারুল্লাহ বাংলা টিম রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে একাধিক টার্গেটে কিলিং-এর ঘটনা ঘটিয়েছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে থাকলেও তারা অনলাইনের মাধ্যমে নিজেদের আবার সংগঠিত করার চেষ্টা করছে।








