ধর্মীয় স্থাপনায় জঙ্গি হামলা: পুলিশের অবহেলাও দায়ী

মোহাম্মদ জামিল খান ও কামরুল হাসান
২৭ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৬:৪১আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৮:৩৬

বগুড়ায় শিয়া মসজিদে হামলা

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদসহ অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনায় যেসব জঙ্গি হামলা হয়েছে তার অনেকগুলোর বিষয়েই পুলিশের কাছে আগাম তথ্য ছিল। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশ পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়নি। ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে অবগত করেই ঢিলেঢালাভাবে দায়িত্ব পালন করেছে পুলিশ।

গত তিন মাসে ১২টি জঙ্গি হামলার মধ্যে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে পুলিশের কাছে আগাম তথ্য ছিল। বিশেষ করে শুক্রবার রাজশাহীর বাঘমারায় আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা, বগুড়ায় শিয়া মসজিদে হামলা ও ঢাকার হোসেনী দালানে বোমা বিস্ফোরণের আগেই কর্তৃপক্ষ পুলিশের কাছ থেকে তথ্য পেলেও তারা দায়িত্বে অবহেলা করেছে। বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে এর সত্যতা পাওয়া গেছে।

 

রাজশাহী

রাজশাহী জেলায় চারটি আহমদিয়া মসজিদ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় মসজিদ রাজশাহী শহরের রানিবাজার এলাকায়। ধর্মীয় উগ্রপন্থিরা হামলা করতে পারে- এমন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ এই মসজিদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।

কিন্তু হামলা হয় অপেক্ষাকৃত ছোট একটি মসজিদে। রাজশাহী মহানগর থেকে দূরে বাঘমারা উপজেলায় এটি অবস্থিত।

বাঘমারা আহমদিয়া মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানায়, পুলিশ তাদেরকে সতর্ক করেছিল। বিশেষ করে অপরিচিতদের ব্যাপারে সাবধান হতে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়। কিন্তু পুলিশ ওই মসজিদের নিরাপত্তায় কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। তবে ঠিকই এক অপরিচিত ব্যক্তি মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায়।

  বাগমারার মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা

বগুড়া

অক্টোবরে ঢাকার হোসেনী দালানে শিয়াপন্থীদের ওপর হামলার পরপরই পুলিশ বগুড়ার শিবগঞ্জের শিয়া মসজিদ কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে। পুলিশ নিরাপত্তারও ব্যবস্থা করেছিল, তবে তা ছিল মাত্র এক সপ্তাহের জন্য।

মসজিদ থেকে পুলিশ প্রত্যাহারের সময় পুলিশ মসজিদ কর্তৃপক্ষকে তিনটি পরামর্শ দিয়েছিল। প্রথমত, মসজিদ প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা; দ্বিতীয়ত, নামাজের সময় মসজিদের গেটে অন্তত দুজনকে পাহারায় রাখা এবং তৃতীয়ত, অপরিচিত কেউ মসজিদে আসলে জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্য সংগ্রহ করা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যখন মসজিদে হামলা হয় তখন মাত্র ৬০ ওয়াটের একটি বাল্ব মসজিদ প্রাঙ্গণে জ্বলছিল। কর্তৃপক্ষ কখনোই নামাজের সময় মসজিদের বাইরে পাহারায় কাউকে বসায়নি। যেদিন মসজিদে হামলা হয় সেদিন অপরিচিত কাউকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।

পুলিশ জানায়, হামলার দিন এলাকায় তিনজন অপরিচিত ব্যক্তিকে দেখা গেছে। পরে তারাই গুলিবর্ষণ করে।

মসজিদের সেক্রেটারি মোজাফফর হোসেন বলেন, ‘পুলিশ আমাদের সতর্ক করেছিল, এটা সত্য। কিন্তু আমরা ‌নিরাপত্তার জন্য কোনও ব্যবস্থা নেইনি। কারণ আমাদের মনে হয়েছিল মসজিদে হামলার মতো ঘৃণ্য কাজ কেউ করবে না।’

মোজাফফর আরও বলেন, ‘কিছু সুন্নি মুসল্লি আমাদের মসজিদে নামাজ আদায় করেন। আমরা কখনও তাদের নিষেধ করি না। অনেক সময় অপরিচিতরাও নামাজ আদায় করে। আমরা অপরিচিতদের কোনও প্রশ্ন করি না, কারণ এতে তারা অপমানিত বোধ করতে পারেন।’

 

ঢাকা

ঢাকায় মহররমের আগের রাতে শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলের কিছুদিন আগে নগরের গাবতলী এলাকায় চেকপোস্টে দায়িত্বপালনের সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা খুন হয়েছিলেন। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত একজনকে পুলিশ পরে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি পুলিশকে জানিয়েছিলেন শিয়াদের তাজিয়া মিছিলে হামলার পরিকল্পনার কথা।

প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) তাজিয়া মিছিলের আয়োজকদের সতর্কও করেছিল। রাতে তাজিয়া মিছিল বের না করা পরামর্শ দিয়েছিল।

হামলার রাতে হোসেনী দালান প্রাঙ্গণে প্রবেশ পথে র‌্যাব-পুলিশের নিরাপত্তা চেক পয়েণ্টও বসানো হয়েছিল।

ওই রাতে হোসেনী দালানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তাজিয়া মিছিল প্রাচীন ঐতিহ্যে পরিণত হওয়ায় ওই রাতে হোসনি দালানে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হলে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এতো মানুষ আসতে থাকায় এক পর্যায়ে সবাইকে চেক করে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে আমাদের চেকিং বন্ধ রাখতে হয়।’

হোসেনী ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মীর জুলফিকার আলী বলেন, ‘আমরা বলছি না যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা দেয়নি। কিন্তু আমরা দেখছি, এধরনের হামলা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। লোকজন এখন আতঙ্কে আছে এবং এর ফলে ঠিক সময়ে মুসল্লিদের আসার সংখ্যা কমে গেছে।’

 

তদন্তের অগ্রগতি

গত তিন মাসে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনায় ১২টি হামলা হলেও পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মাত্র দুজন হামলাকারীকে গ্রেফতার করতে পেরেছে। একজনকে দিনাজপুরের ইস্কন মন্দির হামলায় এবং আরেকজনকে পাবনায় খ্রিস্টান যাজকের ওপর হামলায়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসর) এম সাখাওয়ান হোসেন মনে করেন, এ ধরনের হামলা নিয়মিত করে জঙ্গি গ্রুপগুলো তাদের শক্তি দেখানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘তারা দেখিয়ে দিতে চাচ্ছে যে, যে কোনও ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অগ্রাহ্য করার সামর্থ্য তাদের রয়েছে।’

সাবেক এ নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, ‘তবে সব থেকে বড় শঙ্কার বিষয় হচ্ছে আমরা এবং আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও এদের শেকড় সম্পর্কে এখনও অন্ধকারে।’

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, এসব ঘটনার তদন্তে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নজরদারি বাড়াতে ও জঙ্গিদের আস্তানা খুঁজে বের করতে আমরা মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের চিঠি দিয়েছি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল শনিবার বলেছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফলে এসব হামলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘একটি সংঘবদ্ধ চক্র দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে এসব করছে। আমরা এসব চক্রের অনেক সদস্যকে গ্রেফতার করেছি এবং আশা করছি বাকিদেরও শিগগিরই গ্রেফতার করা হবে।’

/এএ/এফএস/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম