ধর্ষণের মতো অপরাধ রুখতে কঠোর অবস্থানে দেশের বিচার বিভাগ। তাই সময়ে সময়ে ধর্ষণ মামলায় বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। এ অপরাধ রুখতে সোচ্চার আইনজীবীরাও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে বেশ কিছু মামলা শুরু করেছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা সেসব মামলার শুনানি দ্রুত শেষ করতে পারলে ধর্ষণের মতো ঘটনা রোধ ও অপরাধীদের বিচারে গতি আসবে।
২০১৯ সালের ৬ মে রাত ৮টার পরের ঘটনা। কটিয়াদী পার হওয়ার পর একজন বৃদ্ধ যাত্রী নামার পর শাহিনুর আক্তার তানিয়া বাসটিতে একা হয়ে যান। বাসটি বাজিতপুর উপজেলার বিলপাড় জামতলা নির্জন স্থানে একটি কলাবাগানের কাছে এলে জানালা লাগিয়ে দিয়ে নুর নামে একজন প্রথমে তানিয়াকে ধর্ষণ করে। পরে হেলপার লালন মিয়া এবং বাসচালক নুরের খালাতো ভাই ও বাসের অপর হেলপার বোরহান মিলে ধর্ষণ করে। পরে নৃশংস এ ঘটনাটিকে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দিতে তানিয়াকে বাস থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়। পরে তানিয়া মারা যান।
২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় অপহৃত হন রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার স্কুলছাত্রী সুমাইয়া আক্তার বর্ষা। অভিযোগ ওঠে, সহপাঠীর সহায়তায় অপহরণের পর বর্ষাকে ধর্ষণ করে প্রতিবেশী মুকুল হোসেন। এ নিয়ে থানায় অভিযোগ করতে গিয়ে অপমানিত হন বর্ষার বাবা। থানায় আইনি সহায়তা না পাওয়ার পর থেকে বর্ষাকে নিয়ে বিভিন্ন লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শুরু হয়। সমাজের মানুষের নেতিবাচক মন্তব্য আর একপাক্ষিকভাবে ভুক্তভোগী ছাত্রীকে দায়ী করায় বিষিয়ে ওঠে বর্ষার মন। যা সইতে না পেরে ১৬ মে চিরকুট লিখে নিজ ঘরে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে বর্ষা।
এরপর বর্ষার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া নির্দেশনা মানবাধিকার সংগঠন চিলড্রেন চ্যারিটি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। রিটকারী ব্যারিস্টার আব্দুল হালিম জানান, রিটের শুনানি নিয়ে ২০১৯ সালের ১১ জুন ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুদের পুনর্বাসনের জন্য ক্ষতিপূরণ স্কিম তৈরি করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে তানিয়াকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা এবং বর্ষার পরিবারকে কেন ৫০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চেয়েছিলেন আদালত। বর্তমানে এই রুলটি শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে।
২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের শাস্তি সংক্রান্ত ৯(১), ৯ (১)(ক) এবং ১১(ক) ধারা তিনটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী শিশির মনিরসহ আরও ১০ আইনজীবী। ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর রিটটির শুনানি নিয়ে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের শাস্তি সংক্রান্ত ৯(১), ৯ (১)(ক) এবং ১১ (ক) ধারা তিনটি কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। বর্তমানে এ মামলাটিও রুল শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের ব্যারিস্টার রাবেয়া ভূঁইয়া ধর্ষণ রোধে পৃথক পৃথক নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। সে রিটের শুনানি নিয়ে ১৯ জানুয়ারি সারাদেশে ধর্ষণ প্রতিরোধে একটি কমিশন গঠন এবং ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীর জন্য সাক্ষী সুরক্ষা আইন কেন প্রণয়ন করা হবে না, ধর্ষকদের ডিএনএ সংরক্ষণের জন্য কেন ডিএনএ ডাটাবেজ করা হবে না, প্রতিটি জেলায় ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মাধ্যমে ভিকটিমদের সুরক্ষায় কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট।
পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের ছবি গণমাধ্যমে প্রচারের ক্ষেত্রে কেন সতর্কতা অবলম্বন করা হবে না, সব ধরনের ধর্ষণের অপরাধের জন্য কেন পৃথক একটি আদালত গঠন করা হবে না এবং সে আদালতে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করার ক্ষেত্রে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চেয়েছিলেন হাইকোর্ট। তবে এরপর আর এ মামলার রুল শুনানি হয়নি।
এছাড়াও ধর্ষণ রোধে অ্যান্টিরেপ ডিভাইস সরবরাহ, বৈবাহিক ধর্ষণ অপরাধ বলে গণ্য করা, ধর্ষণের অপরাধে সালিশ করা অবৈধ ঘোষণাসহ বেশ কিছু রুল হাইকোর্টে শুনানির জন্য ঝুলে আছে।
ধর্ষণ রোধে এ সংক্রান্ত বিশেষ মামলাগুলো দ্রুত শুনানি করতে হাইকোর্টে পৃথক বেঞ্চ গঠন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির বিধান করেও ধর্ষণের অপরাধ দমন সম্ভব হচ্ছে না। উচ্চ আদালতে ধর্ষণের বিচার সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু মামলায় রুল হয়েছে। সেসব রুল শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ। রুল শুনানি শেষ হলেই রায় পাওয়া সম্ভব হবে। রায়ে পর্যবেক্ষণমূলক নির্দেশনা উঠে এলে ধর্ষণ রোধ বা এর বিচার নিশ্চিত করা আরও দৃশ্যমান করা সম্ভব হবে।’








