নিখোঁজ নিয়ে জিডি, তদন্তে অনীহা কেন পুলিশের?

জামাল উদ্দিন
১০ নভেম্বর ২০২০, ১৫:০০আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২০, ১৯:২০

নিখোঁজ নিয়ে জিডি, তদন্তে অনীহা কেন পুলিশের?

ভুক্তভোগী মানুষ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন কোনও স্বজন নিখোঁজ হলে, কিংবা কোনও কিছু হারিয়ে গেলে। আর থানা পুলিশ তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমেরও জিডি করেন। সাধারণ মানুষের জিডির তদন্তে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশের অনীহা কাজ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, কাজের চাপে হারিয়ে যাওয়া ছোটখাটো কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্ব কম দেওয়া হলেও কোনও ব্যক্তির নিখোঁজের বিষয়ে জিডি হলে সেটি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়। সন্ধানের চেষ্টা করা হয়। সবক্ষেত্রে সাধারণের অভিযোগ সঠিক নয়। অপরদিকে, মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, কোনও ব্যক্তি নিখোঁজের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে তদন্তের ধারা বদলে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলোর দৃশ্যমান কোনও তৎপরতা কিংবা সফলতা দেখতে পাওয়া যায় না।

শেখ মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন তপু। রাজধানীর রামপুরা থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। তপু নিখোঁজ হন ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি রাতে। ওই রাতে বাড্ডার একটি বাসা থেকে কয়েকজন সাধারণ পোশাকধারী ব্যক্তি তাকে তুলে নিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে না পেয়ে ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি ভাটারা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। দু’দিন পর ১ ফেব্রুয়ারি (২০১৬) অপহরণের অভিযোগ এনে একটি মামলা করেন তার মা সালেহা বেগম। ওই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ছেলের সন্ধান চেয়ে তপুর মা ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেদিন তিনি তার ছেলেকে তুলে নেওয়ার বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু গোয়েন্দা পুলিশ কিংবা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউই তাকে তুলে নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেনি। তার সন্ধানও দিতে পারেনি তারা। তপুর নিখোঁজের দীর্ঘ ৫ বছর পার হতে চলেছে। আজও অপেক্ষায় আছেন তার মা ও স্বজনরা।

ছাত্রলীগ নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন তপুর নিখোঁজের বিষয়ে জানতে চাইলে তার মামা ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা ইঞ্জিনিয়ার নূর নবী পাঠান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভাগিনার সন্ধানে সহযোগিতা চাইতে আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অন্তত ৩৫ বার দেখা করেছি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি তিন দফায়। তিনি সংশ্লিষ্টদের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশও দিয়েছেন। কিন্তু তপুর সন্ধান পাইনি আজও। অপেক্ষায় আছি। বর্তমানে তপুর নিখোঁজ ও অপহরণের মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে। তাদের মধ্যেও গাছাড়া ভাব।’

এক সময় বঙ্গবন্ধুর দেহরক্ষী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট (অব.) কাজী আবদুল মতিন। তার ছেলে কাজী রকিবুল হাসান শাওন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। পরে তিনি যুবলীগ করতেন। ২০১৪ সালের ২৯ মার্চ ভোরে কুমিল্লা শহরের মুন্সেফ কোয়ার্টারের বাসা থেকে র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। এরপর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন তিনি। ঘটনার দু’দিন পর ৩১ মার্চ শাওনের স্ত্রী ফারজানা আক্তার কুমিল্লা কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরের মাসে ২৭ এপ্রিল (২০১৪) কুমিল্লার আদালতে শাওনের মা আনোয়ারা বেগম বাদী হয়ে র‌্যাব ১১ এর ১৫ সদস্যের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগে মামলা করেন। শাওনের বাবা কাজী আবদুল মতিন ছেলের সন্ধানে হাইকোর্টেও রিট করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সাবেক রেলমন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ র‌্যাব-পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। কিন্তু ছেলের সন্ধান পাননি এখনও। তিনি বলেন, ‘আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সাবেক সেনা সদস্য। অথচ আজও আমার ছেলের সন্ধান পেলাম না। শাওনের একমাত্র মেয়ের বয়স এখন ১১ বছর। মেয়েটি এখনও বাবার অপেক্ষায় আছে।’

২০১৬ সালের ৪ আগস্ট সাতক্ষীরার কুকড়ালি গ্রাম থেকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক শেখ মোখলেছুর রহমান জনিকে আটক করে পুলিশ। এরপর ৫, ৬ ও ৭ আগস্ট জনিকে থানায় গিয়ে ভাতও খাইয়ে আসেন তার মা এবং স্ত্রী। কিন্তু পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থাতেই ৮ আগস্ট থেকে জনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান। জনির স্ত্রী জেসমিন নাহার থানা থেকে তার স্বামীর নিখোঁজের বিষয়ে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা সদর থানার পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, জনি থানায় নেই। তিনি কোথায় আছেন সেটাও তারা জানেন না। এ ঘটনায় থানা পুলিশের সহায়তা না পেয়ে জনির বাবা শেখ আবদুর রাশেদ হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। হাইকোর্ট বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নির্দেশও দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনও সন্ধান মেলেনি আজও। এ বিষয়ে পুলিশেরও কোনও তৎপরতা নেই।

নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান চেয়ে জিডি বা মামলার তদন্তে পুলিশের অনীহার অভিযোগটি ভিত্তিহীন বলে মনে করেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তারা বলেন, কে কী বললো সেটা বিষয় না। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে কার্যক্রম চালাই। নাটোর জেলার নলডাঙ্গা থানার স্বরকুতিয়া গ্রামের মো. শামীম রেজা ওরফে স্বপন (৩৫) নামের এক এনজিও কর্মী নিখোঁজ হন চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর। তিনি স্থানীয় দ্বীপ শীখা নামের একটি এনজিও থেকে সকাল ৯টায় ঋণের টাকা কালেকশনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে আর ফিরে আসেননি। তার বিষয়ে স্বজনরা গত ১ অক্টোবর নাটোর থানায় জিডি করেন।

নাটোর থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জিডির পর তার সন্ধান চেয়ে দেশের সব থানায় বার্তা পাঠানো হয়েছে।’ সন্ধান দিতে ওসির নম্বর দিয়ে যোগাযোগের অনুরোধ জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘একটা লোক নিখোঁজ হয়েছে। এ বিষয়ে তার স্বজনরা জিডি করেছেন। আমরাও তার সন্ধান চেয়েছি। তদন্তও চলছে। তবে এখনও তার সন্ধান পাইনি।’ হারিয়ে যাওয়া মানুষের জিডির তদন্তে পুলিশের অনীহা আছে এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক নয়। কে কী বললো সেটা বিষয় না। আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি।’

গত ৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে রাজধানীর আজিমপুরের আমতলার বাসা থেকে নিজের মোবাইল ফোনটি স্ত্রীর কাছে রেখে বেরিয়ে যান শাহজাহান (৬৫) নামের এক ব্যক্তি। এরপর তার স্ত্রী লালবাগ থানায় জিডি করেন। এই জিডির তদন্ত করছেন থানার এসআই শাহ আলম। এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে শাহ আলম বলেন, ‘‘পুলিশ জিডির তদন্ত করে না কিংবা হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তির খোঁজ খবর করে না— এটা ঠিক নয়। পুলিশের প্রতি মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। এর কোনও জবাব নাই। কিন্তু আমি আমার কাজ করে যাচ্ছি। নিখোঁজ এই ব্যক্তি তার স্ত্রীকে মোবাইল ফোন দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেছেন। বলে গেছেন যে, ‘কাল থেকে আমাকে আর তোমরা দেখবা না।’ তাকে সন্ধানের জন্য আমি প্রথমে ছবি সংযুক্ত করে পাশের সব থানায় ইনকোয়ারি স্লিপ পাঠিয়েছি। এটার অর্থ হলো— এই ব্যক্তিকে যদি কেউ কোথাও পান তাহলে আমাকে জানাবেন। গণমাধ্যমে পাঠানোর জন্য ডিএমপির মিডিয়া বিভাগে পাঠিয়েছি। পোস্টারিং, মাইকিং করিয়েছি। আমাদের বিট পুলিশকে দিয়েছি। দেশের সব থানায় বেতার বার্তা দিয়েছি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও খোঁজ নিয়েছি। আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি তার সন্ধানে।’’

পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ বিভাগের উপ কমিশনার (ডিসি) ওয়ালিদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে পুলিশের অনীহা আছে এটা ঠিক নয়। কারও মোবাইল ফোন হারিয়ে গেছে বা অন্য কিছু। এমন নানা বিষয়ে অসংখ্য জিডি হয় থানাগুলোতে। হয়তো কাজের চাপে ছোটখাটো কিছু বিষয় তদন্তে অনীহা থাকতে পারে। কিন্তু কোনও ব্যক্তি নিখোঁজ হয়ে গেলে সেই বিষয়ে জিডি বা মামলা হলে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সেগুলো তদন্ত করে।’

নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে করা জিডি বা মামলার তদন্তে পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ নিখোঁজ হচ্ছে। আমি সেই বিষয়গুলোকে একভাবে দেখি। আমি ওই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে চাই, যেই বিষয়গুলোর সঙ্গে সরকার বা সরকারের বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া যায়। পুলিশ বা বিভিন্ন সংস্থার ওয়েবসাইটে গেলে দেখা যায়— অসংখ্য নিখোঁজের সংবাদ আছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে যেখানে অভিযোগ আছে, সেখানে দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ আমরা লক্ষ করছি না। বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক কর্মী বা বিরোধী মতের লোক। গত এক যুগে যারা গুম হয়েছে, তাদের ব্যাপারে কোনও দৃশ্যমান কার্যকরী কোনও পদক্ষেপ নাই। বরং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরা এসব বিষয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যভাবে কথা বলেন।’

তিনি বলেন, ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে বিশ্বাসযোগ্য একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা উচিত। তারা সব বিষয়ের তথ্য উদঘাটন করবে। যাতে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা চিহ্নিত হয় ও বিচারের আওতায় আনা যায়। এই তদন্ত কমিশনের সদস্য হিসেবে বিচারক, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, সংবাদকর্মী ও পরিবারের সদস্যরা থাকবেন।’

 

/এপিএইচ/এমএমজে/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম