ধর্ষণ মামলায় 'নারী চরিত্রই' বিচারের মূল উপাত্ত!

উদিসা ইসলাম
১১ নভেম্বর ২০২০, ১৩:০০আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২০, ১৭:৫৩

ধর্ষণ

ধর্ষণের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা গেলেও এখনও সুরক্ষিত নয় ধর্ষণের শিকার নারী। লড়াইয়ের শুরুতেই হেরে যেতে হয় তাকে, যখন আইনি কাঠামোতেই ভিকটিমকে ‘চরিত্রহীন’ কিংবা ‘যৌন সম্পর্কে সক্রিয়’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয় আদালতে। ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। কোনোমতে নারীর ‘চরিত্র ভালো না’ প্রমাণ করা গেলেই জিতে যাচ্ছে ধর্ষক।

অধিকারকর্মীরা বলেছেন, একজন নারী যখন ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন, তখন তার মামলা করা থেকে শুরু করে তদন্ত এবং বিচার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেই নারীকে সন্দেহ বা অবিশ্বাস করা হয়। মেডিক্যাল পরীক্ষার গুরুত্ব ভিকটিমের জানা না থাকা এবং ধর্ষণ প্রমাণে ঘটনা পরম্পরা ও অপরাধের আধেয় বিচারের চেয়ে মেডিক্যাল রিপোর্ট মুখ্য ভূমিকা পালন করায় মামলা ‍দুর্বল করে দেওয়া সহজ হচ্ছে।

ওই ধারা অনুসারে, কোনও ব্যক্তি যখন বলাৎকার বা শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে ফৌজদারিতে সোপর্দ হন, তখন দেখানো যেতে পারে যে অভিযোগকারিণী সাধারণভাবে দুশ্চরিত্রা। যদিও ধর্ষণের অভিযোগে সাধারণত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়। তবে সবার আগে দরকার সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারা বিলোপ।

ঘটনা কীভাবে সাজিয়ে তোলা হয়

গণধর্ষণের শিকার হওয়া চরভদ্রাসনের ১৩ বছর বয়সের মেয়েশিশু মেহেরুন্নেছাকে (ছদ্মনাম) অপহরণের ১ মাস পর বাড়ির কাছের পাটক্ষেত থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তার পিতা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারা মোতাবেক অপহরণ ও গণধর্ষণের মামলা দায়ের করেন। ঘটনার ৪০ দিন পর মেডিক্যাল সনদে চিকিৎসক কিছু তথ্য হাজির করেন যার মধ্যে এমন শারীরিক বর্ণনা দেওয়া হয় যে, ভিকটিমের যৌন সম্পর্কের পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। সনদ এই মর্মে প্রত্যয়ন করেন যে, ভিকটিমের বয়স ১৬ থেকে ১৭ বছর, তার শরীরে কোনও জোরপূর্বক যৌনসঙ্গমের চিহ্ন নেই, ভিকটিম যৌনসঙ্গমে পূর্ব থেকে অভ্যস্ত। এই সনদের হাত ধরে পরবর্তী সময়ে অভিযুক্ত ৭ জনের মধ্যে ৫ অভিযুক্ত ব্যক্তি বেকসুর খালাস পেয়ে যান। তাদের নাম চার্জশিটেই ওঠেনি!

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ফাতেমা শুভ্রা দীর্ঘদিন ধরে এই আইনের ধারা, ধর্ষণ মামলাগুলোর ফাঁকফোকর নিয়ে গবেষণা করছেন। ওপরের কেস স্টাডি বর্ণনা করে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ১৮৭২ সনের ঔপনিবেশিক সময়ে প্রতিষ্ঠিত সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারা মোতাবেক ‘শ্লীলতাহানি বা বলাৎকার কিংবা ধর্ষণের অভিযোগ আনলে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তিনি অভিযোগ আনয়নকারীর বিরুদ্ধে এই মর্মে সাক্ষ্য হাজির করতে পারেন যে নারীটি ‘দুশ্চরিত্রা’। সাক্ষ্য আইনের এই ধারা ধর্ষকপক্ষের আইনজীবীদের হাত ধরেই টিকে আছে।

সমাজে ধর্ষণের শিকার নারী কেমন হবে তার সম্পর্কে একটি মিথ প্রচলিত আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্ষণের ভিকটিম নারী ধর্ষণ মামলায় ‘মন্দ চরিত্রের নারী’ হিসেবে চিহ্নিত হলে কিংবা তার পূর্বের যৌন সম্পর্কের ইতিহাস থেকে থাকলে তাকে অবিশ্বাস করা থেকে শুরু করে সকল যৌনকর্মেই তিনি সম্মত থাকেন প্রমাণ করা সহজ হয়ে যায়। এই ধারার দ্রুত পরিবর্তন হওয়া জরুরি। কেননা কেবল এর কারণেও অনেক সময় বিচার পর্যন্ত যেতে অস্বস্তিতে ভোগে ভিকটিম ও তার পরিবার।

‘দুশ্চরিত্রা’ প্রমাণের ধারা বিলোপের দাবি

সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ (৪) ধারার বিলোপ চেয়ে ২০২০-এর ১১ অক্টোবর বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন। তারা বলছেন, এই ধারা অনুযায়ী মামলার জেরার সময় ধর্ষণের শিকার নারী পুনরায় হেনস্তার শিকার হন, যা বন্ধ করতে হবে। সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারার বিলোপ চেয়ে তারা বলছেন, এই ধারায় জেরা করার সময় যাতে ধর্ষণের শিকার নারীকে চরিত্র, পেশা, পোশাক ইত্যাদি নিয়ে পুলিশ, আইনজীবী ও বিচারকের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে না হয়। প্রয়োজনে এর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীদের মামলা পরিচালনাকালে লিঙ্গ-সংবেদনশীল আচরণ করতে পুলিশ, আইনজীবী, বিচারক ও সমাজকর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এর আগে ২০১৪ সালে ‘বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলায় চারিত্রিক প্রমাণের ব্যবহার: সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-এর ১৫৫(৪) ধারা’ শীর্ষক এক সম্মেলনে বক্তারা এই আইনের সমালোচনা করে বলেন, এ আইন পরিবর্তন করা হয়তো কঠিন হতে পারে। সেক্ষেত্রে রুল আসতে পারে। তারা মনে করছেন, ১৫৫(৪) ধারাটি ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায়।

মামলায় সুবিধা নিতে ধর্ষণের শিকার নারীকে ‘দুশ্চরিত্রা’ প্রমাণের চেষ্টা করেন আইনজীবীরাই। এমনটা জানিয়ে আইনজীবী তানজীম আল ইসলাম বলেন, ‘এটা অনেক সময় করা হয় মেয়েটা স্বেচ্ছায় বা তার সম্মতিতে সম্পর্ক হয়েছে এটা প্রতিষ্ঠা করতে। মেডিক্যাল রিপোর্ট সাক্ষ্যপ্রমাণের একটা দলিল মাত্র। কেবল মেডিক্যাল রিপোর্ট নয়, বিচার হতে হবে ধর্ষণের কনটেক্সট-এর ওপর ভিত্তি করে। এখন সময় বদলেছে। কোনটা ধর্ষণ, সেটা নিয়েও নতুন করে ভাবার আছে।’ 

/এফএ/এমএমজে/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম