মিরপুর পল্লবীর তালতলা বস্তির ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই শুধু কম্বল বিছিয়ে প্রায় তিন শতাধিক মানুষ রাত পার করেছেন। থাকার ব্যবস্থা না থাকায় বস্তিবাসী আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরেই একটি কম্বল বিছিয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকতে বাধ্য হন।
বুধবার (২২ ডিসেম্বর) সকালে সরেজমিন দেখা যায়, এক হাত পর পর একটি করে কম্বল বিছানো রয়েছে। এখনও সেখানেই কেউ কেউ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। গরম কাপড় না থাকায় শীতে কাঁপছেন। অনেকে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে শেষ সম্বলটুকু খোঁজার চেষ্টা করছেন। সবার চোখে মুখে অজানা এক ভয়ের ছাপ। ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীর জন্য ঢাকা-১৬ আসনের এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা সকালে খাবার পাঠিয়েছেন। সেই খাবার নাম ধরে ধরে বস্তিবাসীদের দিচ্ছেন এমপির লোকজন।
বরিশালের বাবুল হোসেন ২০ বছর ধরে তালতলা পোড়া বস্তিতে বসবাস করেন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে, স্ত্রী ও মাকে নিয়ে এখানে থাকেন। ঘর আগুনে পুড়ে যাওয়ায় সাত সদস্যের পরিবার কোথাও মাথাগোঁজার ঠাঁই পাননি। পুড়ে যাওয়া শখের আসবাবপত্রের ওপরে সাদা প্লাস্টিকের বস্তাতে একসঙ্গে সবাই রাত পার করেছেন।
বাবুল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার এক বছরের একটি মেয়েও আছে। অনেক চেষ্টা করেছি ওর যেন ঠান্ডা না লাগে। কিন্ত শীত তো আর বিপদ বোঝে না। স্থানীয় নেতাকর্মীরা আমাদের সবাইকে একটি করে কম্বল দিয়েছেন। সেই কম্বল জড়িয়ে ৬ জন রাত পার করলাম। শুধু আমি নই, এখানে আমরা মতো ৩০০ জনের অবস্থা একই। সবাই নিজেদের জায়গায় কম্বল বিছিয়ে রাত পার করেছে। আজকের মধ্যে কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবে থাকা যায় না।’
বাবুল হোসেনের স্ত্রী আমেনা বলেন, ‘গতকাল সন্ধ্যার পর পরই বাচ্চাগুলো খাবারের জন্য কান্নাকাটি শুরু করে। তারা তো বোঝে না আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। রাতে কারা যেন এক প্যাকেট করে খিচুড়ি দিয়ে গেছে। ওই এক প্যাকেট খিচুড়ি ৬ জন মিলে ভাগ করে খেয়েছি। যদি সরকার দিকে মুখ ফিরিয়ে না তাকায় তাহলে আমাদের মাথা গোঁজার আর কোনও জায়গা থাকবে না।’
বস্তির বাসিন্দা মালেক বলেন, ‘আগুনে সবকিছু ছাই হয়ে গেছে। আমরা ঘর থেকে কেউ কিছুই বের করতে পারিনি। কোনোরকমে শুধু নারী ও শিশুদের নিয়ে বের হয়েছি। বস্তির অনেকে হাঁস-মুরগি পালতো, তাও বের করতে পারেননি কেউ। আগুনে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেলাম।’
বস্তির আরেক বাসিন্দা মমিনুল ইসলাম। পেশায় রিকশাচালক। মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বস্তিতে থাকেন। ২০০৮ সালে ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সালের ১ মার্চের দুই দফা আগুন দেখেছেন তারা। মমিনুলের দাবি, কিছু ভূমিদস্যু এই বস্তি উচ্ছেদ করতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে আসছে। এ নিয়ে ৩ বার আগুন লাগানো হয়েছে। থানায় প্রায় ১৭ বার মামলাও হয়েছে।
সোমবার (২১ ডিসেম্বর) দুপুরে তালতলা বস্তিতে আগুন লাগে। পরে ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট একঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তাৎক্ষণিকভাবে আগুন লাগার কারণ জানাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। মাসখানেক আগে এ বস্তির অন্য প্রান্ত কালশী অংশেও আগুনে তিন শতাধিক ঘর পুড়ে ছাই হয়েছিল।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের উপ-পরিচালক (ঢাকা বিভাগ) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, বস্তির আগুনে ৫৫টি ঘর পুড়েছে। আগুন লাগার কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।
পল্লবী থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী জানান, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। রাতে পুলিশ ডিউটিতে ছিল। নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখছি।








