বিদায়ী বছর (২০১৫) ছিল মুক্তমনা ব্লগাদের আতঙ্কের বছর। বছরজুড়ে দেশের বিভিন্নাঞ্চলে ৮ ব্লগার ও প্রকাশকের ওপর দুর্বৃত্তদের হামলা চলে। এর মধ্যে ৫ জন ব্লগার ঘটনাস্থলেই মারা যান। নিরাপত্তহীনতার কারণে অর্ধশতাধিক ব্লগার বিদেশে চলে গেছেন। কেউ কেউ লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছেন। অথচ, এ সব ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা বেশকিছু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। বাকিগুলোও গ্রেফতার করে দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন আশ্বাসে আস্থা রাখতে পারছেন না নিহতের স্বজনরা।
গত বছরের ৩১ অক্টোবর শনিবার দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করেন দুর্বৃত্তরা। দীপন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও চিন্তাবিদ আবুল কাসেম ফজলুল হকের ছেলে। একই সময় লালমাটিয়া সি-ব্লকের ৮১৩ নম্বর বাসায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কার্যালয়ে হামলা চালান দুর্বৃত্তরা। হামলায় শুদ্ধস্বরের স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশিদ টুটুল, লেখক ও ব্লগার রণদীপম বসু ও তারেক রহিম গুরুতর আহত হন। ফয়সল আরেফিন দীপন ও আহমেদুর রশিদ টুটুল দুজনই মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক।
শুদ্ধস্বরে হামলার ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি ডিবি তদন্ত করছে। এই মামলায় এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনও অগ্রগতি নেই।
দীপনের হত্যাকাণ্ডের পর একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন তার বাবা আবুল কাশেম ফললুল হক। এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি মামলা করতেই চাইনি। তারপরও বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার আশায় মামলাটি করেছি। গত পরশুদিন ডিবির এক পরিদর্শক আমার সঙ্গে কথা বলেছিল। তবে, মামলার কোনও অগ্রগতি নেই। তিনি বলেন, দীপনের মৃত্যুতে আমাদের পরিবারের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পোষাণোর নয়। দেশের বিচার ব্যবস্থার এমন হলে দেশের ভবিষ্যৎ কী—এনিয়ে আমাদের সবাইকেই ভাবতে হবে।
চলতি বছরেই আরও চার ব্লগারকে একই কায়দায় কুপিয়ে হত্যা করেছেন দুর্বৃত্তরা। এরমধ্যে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের গোড়ানে ৭ আগস্ট খুন হন ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় (নিলয় নীল)। দুপুরে জুমার নামাজের সময় বাসায় ভাড়া নেওয়ার কথা বলে ঢুকে পড়েন দুর্বৃত্তরা। নিলয় নীল নামে বিভিন্ন ব্লগ ও ফেসবুকে তিনি লেখালেখি করতেন। তিনি খিলগাঁও গোড়ানের ১৬৭ নম্বর বাড়ির পঞ্চম তলার বাসায় স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন। তার হত্যাকাণ্ডের পর খিলগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। ডিবি মামলাটি তদন্ত করছে। ডিবি জানিয়েছে, এই ঘটনায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সক্রিয় চার সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আরও তিনজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ফেসবুকে নিলয়কে হুমকিদাতা একজন ও হত্যার দায়স্বীকারকারী ২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মে মাসের ১২ তারিখের সকাল ৯টায় সিলেট নগরীর সুবিদবাজার এলাকায় অনন্ত বিজয় দাস নামে এক ব্লগারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত এ ব্লগার রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা ছিলেন।
৩০ মার্চ রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার বেগুনবাড়ি এলাকায় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার সময় আরেক ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে কুপিয়ে হত্যা করেন দুর্বৃত্তরা। এই ঘটনায় তেজাগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলাটিও ডিবি তদন্ত করছে। হিজড়াদের সহযোগিতায় দুই হত্যাকারীকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া, আরও একজনকে গ্রেফতার করে ডিবি। এই মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। একজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করেন দুর্বৃত্তরা। এ সময় তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাও গুরুতর আহত হন। এই ঘটনায় নিহত অভিজিতের বাবা অজয় রায় শাহবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলাটিও ডিবি তদন্ত করছে। অভিজিৎ ও তার স্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ায় এই ঘটনায় এফবিআই তদন্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করে। এফবিআই ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ বেশকিছু আলামত সে দেশে নিয়ে যায়। যদিও সেই আলামত পরীক্ষার প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত দেয়নি। এই ঘটনায় শাফিউল রহমান ফারাবীসহ মোট আটজন আসামি গ্রেফতার আছে।
তবে মামলার তদন্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিজেতের বাবা অজয় রায়। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রকৃতপক্ষে মামলার কোনও অগ্রগতি নেই। এই মামলা কী হবে, তা আমিও ভেবে পাই না। ডিবি ভালো বলতে পারবে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা ও অপরাধতথ্য বিভাগের (ডিবি) উপ-কমিশনার (পূর্ব) মো. মাহবুব আলম জানান, সব ঘটনার তদন্ত হচ্ছে। বেশকিছু ঘটনার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, অপরাধীরা প্রতিনিয়ত প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করছেন। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও এসব বিষয় মাথায় রেখে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
/এমএনএইচ/








