অপরাধ জগৎ নিয়ে তৈরি টিভি সিরিজ ও ক্রাইম-অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার ঘরানার কিছু কিছু সিনেমা দিন দিন পরিণত হচ্ছে মগজ ধোলাইয়ের কারখানায়। এসব সিনেমা বা সিরিয়ালের প্রধান চরিত্রে থাকা জনপ্রিয় তারকা যদি অপরাধীর ভূমিকায় থাকে, তবে সেই অপরাধে আরও বেশি প্ররোচিত হচ্ছে একশ্রেণির দর্শক। এক্ষেত্রে সিনেমার দৃশ্যগুলো বাস্তবতা বর্জিত হলেও প্রিয় তারকার কাছ থেকে ‘আইডিয়া’ নিতে বাছবিচার করছে না তারা।
এই শ্রেণিতে কিশোরের সংখ্যাই বেশি। সিনেমা দেখে ‘পারফেক্ট মার্ডার’ তথা নিখুঁত হত্যার পরিকল্পনা, ফোন করে চাঁদা আদায়ের অভিনব পন্থা থেকে ব্যাংক ডাকাতির প্রস্তুতিও নিচ্ছে কেউ কেউ। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এখনই নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হয়ে উঠবে এই কিশোররাই। পরিবার থেকেই সচেতন করতে হবে তাদের।
সম্প্রতি ঢাকা ও বগুড়ায় পর পর এমন দুটি দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটিয়েছে ১৬ ও ১৭ বছরের দুই কিশোর। এছাড়াও চাঞ্চল্যকর কয়েকটি হত্যার আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও বেরিয়ে এসেছে এমন তথ্য।
চলতি মাসে (জানুয়ারি) বগুড়ার গাবতলীর একটি ব্যাংক-ডাকাতির দুর্বৃত্তদের খুঁজতে গিয়ে পুলিশ আটক করেছে এক কিশোরকে। যে কিনা বলিউডের ধুম-৩ সিনেমাটি দেখেছে ১৫৪ বার। ওটা দেখেই সে নিজেকে ডাকাতির জন্য ‘প্রস্তুত’ করেছিল।
মুখোশ পরা অবস্থায় দুই নিরাপত্তারক্ষীকে আহত করে রূপালী ব্যাংকের একটি শাখার ভেতর ঢুকে পড়ে ওই এসএসসি পরীক্ষার্থী। প্রথমে দাহ্য পদার্থ ছোড়ে, তারপর ছুরিকাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে দুই আনসার সদস্যকে। পরে ছাদের সিঁড়িঘরের তালা কেটে ভেতরে ঢুকলেও ব্যাংকের ভল্ট ভাঙতে ব্যর্থ হয়।
বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা বলেন, ‘এই বয়সে যে অপরাধের পরিকল্পনা করেছে ছেলেটি, তা চমকে যাওয়ার মতো। একজন পেশাদার অপরাধীর চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল সে। একটি সিনেমা দেখে এবং ডার্ক ওয়েবের জগতে ঘোরাফেরা করেই এমন অপরাধ করার সাহস জুগিয়ে ফেলে ও। প্রায় ২০ দিন চেষ্টার পর আমরা তাকে গ্রেফতার করি।’
ভারতীয় সন্ত্রাসী পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তির গাড়িতে নকল বোমা রেখে ২০ লাখ টাকা চেয়ে হুমকি দেয় মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের এক কিশোর। গ্রেফতারের পর স্বীকার করেছে, সিনেমা দেখে আইডিয়াটা পেয়েছে ও। হিন্দিও শিখেছে সময় নিয়ে। হুমকি দেওয়ার ভাষা রপ্ত করতে সময় নিয়েছে তিন মাস। আর প্রথমেই টার্গেট হিসেবে বেছে নেয় রাজধানীর গুলশানে থাকা বাবার অফিসের বসকে।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) একেএম হাফিজ আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কিশোরটি হিন্দি সিনেমা, সিরিয়াল, ইউটিউব দেখে নকল বোমা বানানো এবং সন্ত্রাসী পরিচয়ে হুমকি-ধমকি দেওয়ার কৌশল শিখেছিল। সম্প্রতি রাজধানীতে বিভিন্ন শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদা দাবি করার মতো ঘটনা ঘটছে। যদিও দেশে শীর্ষ সন্ত্রাসী বলে আলাদা কোনও শ্রেণি নেই। কেউ যদি এমন ঘটনার শিকার হন তাদের উচিত দ্রুত পুলিশকে জানানো।’
মহানগর ডিবি পুলিশের এই প্রধান কর্মকর্তা বলেন, ‘এ ধরনের কিশোরদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রথমে পরিবারকেই এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে তারা হুমকি হয়ে উঠবে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এ ধরনের অ্যাডভেঞ্চার করার সুযোগ পাবে না।’
অন্যদিকে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ভারতীয় টিভি সিরিয়াল ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে নিজের ভাই, ভাবিসহ পরিবারের চার জনকে খুন করেন এক যুবক। কোমল পানীয়র সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অচেতন অবস্থায় চাপাতি দিয়ে তাদের হত্যা করেন তিনি।
খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কিছু টিভি শো খুনকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যাতে মনে হবে ওটা খুব সহজ ও স্বাভাবিক ঘটনা। আর তা দেখেই একশ্রেণির মানুষের ভয় কেটে যাচ্ছে। তারা বুঝতেও পারছেন না কত বড় অপরাধ করে ফেলছেন।
অতিরিক্ত এই ডিআইজি বলেন, ‘আমরা ইদানীং এমন অনেক ঘটনা জানতে পারছি, যার কৌশলের নেপথ্যে রয়েছে সিনেমা বা টিভি শো। এমন অনুষ্ঠান প্রচার প্রকাশ থেকেও বিরত থাকা উচিত। শিশু-কিশোরদের জন্য পারিবারিক সচেতনতা প্রয়োজন। তারা কী দেখবে, কী দেখবে না সেটা ঠিক করে দেওয়া প্রয়োজন।’
কিশোরদের এমন অপরাধের বিষয়ে জানতে চাইলে এভারকেয়ার হাসপাতালের মনস্তত্ত্ববিদ তারানা আনিস বলেন, ‘কিশোর বয়সে মনে নানান অ্যাডভেঞ্চার কাজ করে। এ বয়সে তারা নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। কৌতূহলের বশে নতুন কিছু জানতে চায়, করতে চায়। এমনও হচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা শিক্ষামূলক কোনও কনটেন্ট হয়তো সার্চ করছিল, কিন্তু পাশে নিষিদ্ধ কনটেন্টও চলে আসছে। অপরাধে প্ররোচিত করে এমন ভিডিও, টিভি শো, সিনেমা চলে আসছে। তখন তারা ওটার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করছে তাদের বয়সের কারণে। তাই বয়সভিত্তিক স্টোরি ফিল্টারিং জরুরি। সঙ্গে পরিবারকেও খেয়াল রাখতে হবে।’
এই মনস্তত্ত্ববিদ আরও বলেন, ‘শুধু এসবই নয়; মা-বাবার অযত্ন ও অবহেলা, উদাসীনতা, সুষ্ঠু বিনোদনের সংকট, মাদকসেবন, খারাপ সঙ্গসহ আরও অনেক কারণেই কিশোররা অপরাধী হয়ে উঠছে।’
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহিত কামাল বলেন, ‘ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও নির্ভর করে। যারা মানুষ খুন করা বা বড় অপরাধ করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়, তাদের মধ্যে এক ধরনের হিরোইজম কাজ করে। তারা নিজের শক্তি, সাহস, ক্ষমতা দেখিয়ে অন্যদের মনে ভয় ছড়াতে চায়, নজর কাড়তে চায়। এসব বন্ধে পারিবারিক শিক্ষা প্রয়োজন। প্রয়োজন সুষ্ঠু বিনোদনের।’









