উচ্চ ও নিম্ন আদালতসহ যারাই আদালতের রায় বা আদেশ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত, তাদের খুঁজে বের করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট।
মঙ্গলবার (১৬ মার্চ) বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন।
এর আগে জামিন জালিয়াতি করে বগুড়ায় ৩০ আসামির জামিন নেওয়ার ঘটনা তদন্ত ও তাদের গ্রেফতার করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বগুড়ার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে (সিজিএম) নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
কিন্তু সেই নির্দেশ প্রতিপালন না করায় মামলাটি হাইকোর্টের শুনানিতে ওঠে। এই শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।
শুনানিতে রেজিস্ট্রার জেনারেলকে উদ্দেশ করে হাইকোর্ট বলেন, ‘রুল জারির পাশাপাশি আমরা নির্দেশ দিয়েছিলাম। সেই নির্দেশ অনুযায়ী আপনারা আমাদের অবগত করেননি। আপনারা কি কোনও তথ্য পাননি? নাকি আমাদের নির্দেশনা পর্যন্তই শেষ হয়ে যাবে?’
জবাবে রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আলী আকবর বলেন, ‘এই নির্দেশনার বিষয়টি আমাদের নজরে সেভাবে আসেনি। আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। একটু সময় দিন, আমরা আদেশ প্রতিপালন করবো।’
তখন আদালত বলেন, ‘একটি ভুয়া আদেশ নিয়ে তারা জামিন নিলো। সিজিএমকে নির্দেশ দিয়েছিলাম বিষয়টি নিশ্চিত করতে। তিনি আমাদের নিশ্চিত করেননি। তিনি কেন জানাননি তাকে আমরা শোকজ করবো। আপনারা (রেজিস্ট্রার জেনারেল) জেনে আগামী ১৮ মার্চ আমাদেরকে জানাবেন। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আদেশ দেবো।’
আদালত আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে যে ডকুমেন্ট আছে তাতে দেখা যায়, গত ১ মার্চ আপনাদের কাছে তারা সার্ভ (সরবরাহ) করেছেন। আপনাদের উচিত ছিল সাত দিনের মধ্যে দেওয়া। সিআইডি থেকে রিপোর্ট এসেছে। সুদুর বগুরা থেকে এসেছে। আর আপনারা কাছাকাছি থেকেও সেটি করছেন না। মামলাটি অনেক জটিল। এ ধরনের আজকেও একটি মামলা বের করেছি। যেখানে বার বার আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে। আমরা আউট অব লিস্ট করেছি। আবার নিয়ে এসেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, ওইদিক দিয়ে আসামি বের হয়ে চলে গেছে। অনেক জটিল মামলা। লিষ্টে আসে শুনানি করে না। পরবর্তীতে দেখা যায়, ওইদিকে জামিন হয়ে বেরিয়ে যায়। এ রকম যে অহরহ চলছে তা প্রতিরোধ করতে আমাদের সকলের প্রচেষ্টা দরকার।’
আদালত বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশ জাল হচ্ছে, নিম্ন আদালতের স্বাক্ষর জাল হচ্ছে। নিম্ন আদালতের আদেশ টেম্পারিং করে আমাদের কাছে আনছে। আপিল বিভাগে এখনও হয়েছে কিনা আমাদের জানা নেই। এ ধরনের কাজে যারা যুক্ত, তাদের খুঁজে বের করা জরুরি প্রয়োজন। যাতে পরবর্তীতে আর এরকম ঘটনা না ঘটে।’
এ সময় আসামিদের আইনজীবী মিনহাদুজ্জামান লিটন আদালতকে বলেন, ‘এ মামলায় যারা আসামি, তারা আদেশ পাওয়ার পর পরই আত্মসমর্পণ করেছেন। ৩ মার্চ ১৪ জন এবং বাকি ১৬ জন ৪ মার্চ আত্মসমর্পণ করেছেন। আদেশ জালিয়াতি করা আইনজীবীর বিরুদ্ধে আসামিরা বার কাউন্সিলেও একটি আবেদন করেছেন।’
পরে আদালত জামিন জালিয়াতি করে বগুড়ায় ৩০ আসামি জামিন নেওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদন না দেওয়ায় বগুড়ার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে (সিজিএম) শোকজ করেন। একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে আগামী ১৮ মার্চের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেন আদালত।
প্রসঙ্গত, জামিন জালিয়াতি করে বগুড়ার ৩০ আসামির জামিনের বিষয়টি ধরা পড়লে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তাদের গ্রেফতার করতে নির্দেশসহ প্রতিবেদন দিতে বলেন হাইকোর্ট। ৭ দিনের মধ্যে তাদের গ্রেফতার করতে বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া বিষয়টি তদন্ত করতে বগুড়ার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকেও নির্দেশ দেওয়া হয়।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ৯ ফেব্রুয়ারি বগুড়ায় মোটর মালিক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ১০ ফেব্রুয়ারি প্রায় পাঁচ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি পাল্টাপাল্টি মামলা হয়। তার মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহনের ছোট ভাই মশিউল আলম দীপন বাদী হয়ে আমিনুর ইসলামকে প্রধান আসামি করে ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। এ মামলায় জামিন জালিয়াতির ঘটনা ঘটে।









