আগে থেকেই টার্গেট ঠিক করে রাখতো ওরা। সুযোগ বুঝে নকল চাবি দিয়ে দরজা খুলে গাড়ি নিয়ে চম্পট দিতো। সোজা চলে যেতো কাঁচপুর ব্রিজের দিকে। সামনে-পেছনে মোটরসাইকেল নিয়ে এসকর্ট দিতো সিন্ডিকেটের অপর সদস্যরা। কাঁচপুর ব্রিজ এলাকায় গিয়ে গাড়ির চালক পরিবর্তন হতো। তারপর নতুন চালক গাড়ি নিয়ে চলে যেতো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্ত এলাকায়। সেখানে কৌশলে গাড়ির নকল কাগজপত্র তৈরি করে বিক্রি করা দিতো তারা। এরকম একটি গাড়ি চোর সিন্ডিকেটের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগ।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলো—নূরুল হক, আব্দুল আলিম ওরফে ইমন, হৃদয় পাঠান ওরফে উজ্জ্বল পাঠান ও এএইচ রুবেল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জে অভিযান চালিয়ে আটটি চোরাই গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিবি মিরপুরের উপ-কমিশনার মানস কুমার পোদ্দার বলেন, ‘চোরাই গাড়ির এই সিন্ডিকেটে আরও সদস্য রয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের আমরা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে সিন্ডিকেটের অপর সদস্যদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
সম্প্রতি রাজধানীর কাফরুল ও গুলশান থানাসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক গাড়ি চুরির ঘটনা ঘটে। মিরপুর বিআরটিএ অফিসের রাস্তার বিপরীত পাশে থাকা একটি প্রাইভেট কার চুরির ঘটনায় গত ২১ জানুয়ারি কাফরুল থানায় একটি মামলা হয়। ওই মামলা তদন্ত করতে গিয়ে গাড়ি চুরির এই সিন্ডিকেটকে শনাক্ত করে গোয়েন্দা পুলিশ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, কাফরুলের গাড়ি চুরির ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নকল চাবি দিয়ে দরজা খুলে গাড়িটি নিয়ে চলে যায় সিন্ডিকেট সদস্যরা। এ ঘটনায় চুরি হওয়া ওই প্রাইভেটকারসহ নুরুল হককে গত ২৮ জানুয়ারি গ্রেফতার করা হয়। নুরুল হকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ১২ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর থানা এলাকা থেকে একটি চোরাই প্রাইভেটকার ও একটি মাইক্রোবাসসহ আব্দুল আলিম ওরফে ইমনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৬ মার্চ হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর থানা এলাকা থেকে হৃদয় পাঠান ওরফে উজ্জ্বল পাঠান ও এএইচ রুবেলকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে পাঁচটি চোরাই প্রাইভেটকার উদ্ধার করা হয়।
গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, এই চক্রের সদস্যরা বেশ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গাড়ি চুরির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। চক্রের ২-৩ জন সদস্য বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে টার্গেট গাড়ি খুঁজতে থাকে। টার্গেট করা গাড়ি পেলে সময় ও সুযোগ বুঝে কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে নকল চাবি দিয়ে দরজা খুলে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ছুটে যায় নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, পূর্বাচল বা কাঁচপুর ব্রিজের দিকে। সামনে ও পেছনে বাইক বা অন্য কোনও গাড়িতে থাকে এ চক্রের বাকি সদস্যরা। সেখান থেকে তাদেরই একজন চালক গাড়িটি পৌঁছে দেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ বা মৌলভীবাজারের চোরাই গাড়ি বিক্রির সিন্ডিকেটের অপর সদস্যদের কাছে। এরপর অন্য চালক গাড়িটি সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় নিয়ে রাখে। সেখানে বিআরটিএ’র সিল ও স্বাক্ষর জাল করে গাড়ির নকল কাগজপত্র তৈরি করা হয়। অনেক সময় মূল মালিকের নামের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয় গাড়ির কাগজপত্র। কখনও বা নকল দলিল অথবা আদালতের সই সংবলিত নিলামের নকল কাগজপত্র তৈরি করে গাড়িটি বিক্রি করে দেওয়া হয়।
গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, চোরাই গাড়ি দিয়ে অনেক সময় সীমান্ত এলাকা থেকে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজা বহন করা হয়। যাতে গাড়িসহ ধরা পড়লে তাদের আর্থিকভাবে কোনও ক্ষতি না হয়। এই চক্রের আরও কয়েকজন সদস্য বর্তমানে পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেফতার করতে অভিযান চালানো হচ্ছে।









