জাল রেভিনিউ স্টাম্প তৈরি এবং তা দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে একটি চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ইউনিট। বৃহস্পতিবার (২৪ জুন) ও শুক্রবার (২৫ জুন) ঢাকা মহানগর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
শুক্রবার দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার একেএম হাফিজ আক্তার। নজরদারির দুর্বলতায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তিনি জানান, গ্রেফতারকৃতরা হলেন আবু ইউসুফ ওরফে পারভেজ ওরফে রানা, আতিয়ার রহমান সবুজ, নাসির উদ্দিন, নুরুল ইসলাম ওরফে সোহেল। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন মূল্যমানের ২০ কোটি ২ লাখ ২৪ হাজার টাকার পরিমাণ ১৩ লাখ ৪০ হাজারটি জাল রেভিনিউ স্টাম্প, এক লাখ ৯৪ হাজার ৮০০ টাকা মূল্যের ১৯ হাজার ৪৮০টি জালকোর্ট ফি, জাল রেভিনিউ স্টাম্প বিক্রির নগদ তিন কোটি ৬০ লাখ টাকা, ১১৪ গ্রাম স্বর্ণালংকার, আটটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। এছাড়া একটি পেন ড্রাইভ, ডাক বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ১১টি সিল, ডাক বিভাগের রশিদের কপি ৩০০ পাতা, একটি বড় প্রেস মেশিন, কাটিং মেশিন, ডাই কাটিং মেশিন, বিভিন্ন ব্যাংকের সর্বমোট এক কোটি পাঁচ লাখ ৪০ হাজার টাকার ১৮টি চেকের পাতা উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারকৃত আসামি আবু ইউসুফের কাছ থেকে যমুনা ব্যাংক, ডাচ বাংলা ব্যাংকের তিনটি চেক বই উদ্ধার করা হয়।
হাফিজ আক্তার বলেন, ‘নজরদারির দুর্বলতার কারণেই অপরাধীরা এ ধরনের অপরাধ কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। এটি একটি বড় চক্র। এ ধরনের জল স্টাম্পের কারণে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। নিজস্ব ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করে তারা এ ধরনের জাল রেভিনিউ স্টাম্প ছাপাতো। স্টাম্পগুলো এতটাই নিখুঁত ছিল যে, খালি চোখে ধরার কোনও সুযোগ ছিল না। কাগজগুলো হুবহু একই রকম।’
তিনি বলেন, ‘হঠাৎ বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে ২০১৭ সালে সীমিত পরিসরে রেভিনিউ স্টাম্প তৈরির কাজ শুরু করে তারা। ২০১৯ সাল থেকে তারা নিজস্ব ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করে এসব জাল রেভিনিউ স্টাম্প ছাপিয়ে আসছিল।’ সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান হাফিজ আক্তার। গ্রেফতারকৃত চার জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মামলা রয়েছে।
জাল রেভিনিউ স্টাম্প বানানোর সঙ্গে জিপিও পোস্ট অফিসের কেউ জড়িত রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে এখনও তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি আসেনি। তবে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত সে সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত হতে পারবো। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এটি একটি বড় চক্র। বানানোর জন্য কাগজ কোথা থেকে সংগ্রহ করা হতো তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
রেভিনিউ স্টাম্প, কোর্ট ফি—এগুলো ডাকঘর ও ব্যাংক থেকে কেনার পরামর্শ দেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
যেভাবে চলতো স্টাম্প জালিয়াতি
২০১৯ থেকে মাতুয়াইলে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে কারখানা স্থাপন করে চক্রটি। তিন ধাপে চলে তাদের প্রতারণা। প্রথম ধাপে, মুদ্রণের জন্য অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হতো। ছাপার কাজ শেষ হলে দ্বিতীয় ধাপে হোলসেলারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো জল রেভিনিউ স্টাম্প ও কোর্ট ফি। তৃতীয় ধাপে ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছে দিতো চক্রের সদস্যরা।
রেভিনিউ স্টাম্প ও কোর্ট ফি চিনবেন যেভাবে
ইউএভি মেশিনে দেওয়ার পর নকল স্টাম্পে কাল রেখা দৃশ্যমান হয় না। নকল স্টাম্পে জলছাপ জ্বলজ্বল করে না। বিভিন্ন অফিস-আদালতে জাল স্টাম্প ও কোর্ট ফি বিষয়ে প্রতারণার হাত থেকে রেহাই পেতে ইউএভি মেশিন ব্যবহারের পরামর্শ দেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।









