বড়বোন আয়েশা সিদ্দিকা শিমুর হাত ধরে রাস্তা পার হতে গিয়েও বাঁচতে পারেনি ছোটবোন খাদিজা সুলতানা মিতু (১২)। শিশুপার্কে ঘুরে বেড়ানো ছোটবোনের হাসিমাখা মুখ মুহূর্তেই রক্তাক্ত দেখে নির্বাক বড়বোন। ছোটবোনের হাসি দেখার জন্য কুমিল্লা থেকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন বড়বোন, সেই মিতুর লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরে বাবা-মাকে কী জবাব দেবেন তিনি? তা জানা নেই শিমুর।
প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় (পিইসি) জিপিএ-৫ পেয়ে গত ৬ জানুয়ারি রাজধানীর শ্যামপুরের বড়বোন শিমুর বাসায় বেড়াতে আসে মিতু। তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার মনোহরগঞ্জে। দুই বোন ও একভাইয়ের মধ্যে খাদিজা সবার ছোট। তার বাবা বাচ্চু মিয়া আবুধাবীতে প্রবাসী এবং মা রোকেয়া বেগম গৃহিনী।
শনিবার সকালে বড়বোন শিমু, তার স্বামী ওমর ফারুক ও তাদের তিন বছরের ছেলে ইশতিয়াক বিন ওমরের সঙ্গে শাহবাগস্থ জাতীয় শিশুপার্কে বেড়াতে আসে মিতু। পার্কের ভেতরে বেড়ানো শেষ করে বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে তারা বের হয়। তখন শাহবাগ মোড়ে সিগন্যাল দিয়ে রেখেছে ট্রাফিক পুলিশ। মৎস্য ভবনের দিক থেকে আসা সব গাড়ি দাড়ানো। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিল রাস্তা পাড় হয়ে বারডেমের পাশে এসে শ্যামপুরের গাড়িতে উঠবেন। শিমু তার ছোটবোনর মিতুর এবং তিনবছরের দিহানের হাত ধরে তারা রাস্তা পার হচ্ছিল। এরমধ্যে মৎস্যভবন থেকে গাবতলীগামী একটি আট নম্বর বাস আসে। বড়বোনের হাতছেড়ে একটু দৌড় দিয়ে রাস্তার ওই পাশে যাওয়ার চেষ্টা করে মিতু। তখনই সর্বনাশ। মিতুর ডান পাশে চাপা দেয় বাসটি। যাত্রীরা বাসের চালককে জোর করে গাড়ি থামিয়ে দেয়। মিতুকে উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বড়বোন সেই থেকে নির্বাক।
শিমুর স্বামী ওমর ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, খাদিজা লক্ষণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে লক্ষণপুর ফাজিল মাদ্রাসায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। এরপর ৬ জানুয়ারি ঢাকায় আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। আগামী ২৬ জানুয়ারি ওর বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। এজন্য কেনাকাটা করেছি। কিন্তু ভাই কিভাবে কী হলো, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এখন লাশ নিয়ে বাড়িতে যাচ্ছি। ওর বাবা-মাকে আমি কী বলব?
বড় বোন আয়েশা সিদ্দিকা শিমু বিলাপ করতে করতে বলেন, আমার হাত ধরেই ও রাস্তা পার হচ্ছিল। ওকে না নিয়ে আল্লাহ আমাকে নিয়ে গেল না কেন। তিনি জানান, তিনি পরিবার নিয়ে রাজধানীর শ্যামপুরে থাকেন। গ্রামের বাড়ি থেকে ফেরার সময় ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় আসেন। শনিবার সকালে স্বামী ওমর ফারুক, ছেলে ইশতিয়াক বিন ওমর ও ছোট বোন খাদিজাকে নিয়ে শাহবাগের শিশুপার্কে ঘুরতে আসেন। ঘুরতে এসে তার সব আবদার পূরণ করা হয়। শিশুপার্কে ঘোরা শেষ হলে দুপুরের খাবার খেতে শাহবাগের দিকে যেতে রাস্তা পার হওয়ার সময় যাত্রীবাহী বাস এসে খাদিজাকে চাপা দেয়।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক জানান, ঘটনার পর ওই বাস জব্দ ও চালককে আটক করা হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হচ্ছে। নিহতের পরিবার কেউ মামলা করতে চাইলে তাও নেওয়া হবে। লাশের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা লাশ বাড়িতে দাফন করার জন্য নিয়ে গেছে।
/এমএনএইচ/







