কল্যাণপুর পোড়াবস্তি

৩৬ বছরের বসতঘর ভাঙল ৩ ঘণ্টায়

আমানুর রহমান রনি
২১ জানুয়ারি ২০১৬, ২৩:৪৮আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০১৬, ০৭:০৫


কল্যাণপুর পোড়াবস্তির ভাঙার দৃশ্য ৭ কল্যাণপুরের নতুনবাজার সংলগ্ন পোড়া বস্তির বয়স এখন তিনযুগ। ৩৬ বছর আগ থেকে পানির ওপর নিম্ন আয়ের মানুষ বাঁশ দিয়ে ছোটছোট ঘর তৈরি করে বসবাস করে আসছেন এখানে। ধীরেধীরে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫ শ ঘরে। এই বস্তির বাসিন্দারা নিজেরাই মাটি ভরাট করে জায়গাটিকে বসত উপযোগী করে গড়ে তুলেছেন। তবে, বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক নেতা ও দখলদারদের নজরে পড়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদফতর এবং হাউজ বিল্ডিং রিচার্জ ইনস্টিটিউটের জায়গায় থাকা ওই বস্তিটি। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার উচ্চআদালতের নির্দেশ থাকার পরও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালায়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বিজয় (২৫) নামে এক লেগুনা চালক ‍গুলিবিদ্ধ হন। বর্তমানে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন প্রায় দেড় হাজার দরিদ্র মানুষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল পৌনে ১০টার দিকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এড়াতে তিনটি বুলডোজার ও দুটি জলকামান বস্তির সামনে রাখা হয়। গৃহায়ন কর্মকর্তারা বস্তিবাসীকে মাত্র দুই ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে ঘর ছাড়ার নির্দেশ দেন। এরইমধ্যে হঠাৎ ১১ টার দিকে বস্তি ভাঙা শুরু করেন তারা। এ সময় গৃহায়নের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুরু আলম উপস্থিত ছিলেন। বিকেল আড়াইটা পর্যন্ত একটানা ভাঙ্গতে থাকে। এরমধ্যে বস্তিবাসীরা কয়েক দফা সংঘর্ষে জড়ান পুলিশের সঙ্গে। এ সময় লেগুনা চালক বিজয় পুলিশের শটগানের গুলিতে আহত হয়। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এছাড়া, আরও ১৫ জন আহত হয়েছে। এক পুলিশ সদস্য বস্তিবাসীদের ইটের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন।

বাসিন্দাদের বস্তিতে প্রবেশের মুখে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়। তবে পুলিশের লাঠিচার্জে তাদের সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকেনি। এর ভেতরে উচ্চআদালতে আইন ও সালিশ কেন্দ্র একটি রিট করেন। আদালত শুনানি শেষে উচ্ছেদের ওপর তিনমাসের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আদেশের কপি হাতে না পাওয়ায় বিকাল পর্যন্ত উচ্ছেদ চালায় গৃহায়ন।

কল্যাণপুর পোড়াবস্তির ভাঙার দৃশ্য ১

এ সময় বস্তির বাসিন্দা নারী ও শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাদের কান্না করতে দেখা যায়। কুলসুম নামে এক নারী জানান, তিনি তার বাবা-মায়ের সঙ্গে ২৫ বছর আগে এই বস্তিতে বসবাস শুরু করেন। তার বাবা মা মারা গেছেন। এখন তার নিজের সংসার। ছেলে-মেয়ে বড় হয়েছে। ছোট একটি ঘরে তারা থাকেন। ঘর ভেঙে দেওয়ায় এখন তারা কোথায় যাবেন, কিছুই জানেন না।

কল্যাণপুর পোড়াবস্তির ভাঙার দৃশ্য ২

নগর বস্তিবাসীর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি আব্দুস সালাম (শাহআলম) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৯৮৬ সালে পোড়া বস্তিটিতে মানুষ বসতি তৈরি করে। বর্তমানে সেখানে ৩ হাজার ৫ শ ছোট ঘর আছে। নিম্ন ও খেটে খাওয়া ২০ হাজার মানুষ সেখানে বসবাস করেন। জায়গাটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং হাউজ বিল্ডিং রিচার্জ অ্যান্ড ইনস্টিটিউটের।’

কল্যাণপুর পোড়াবস্তির ভাঙার দৃশ্য ৩

উচ্ছেদ শুরুর পর বস্তিবাসীর পক্ষে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) আইনজীবী অবন্তী নুরুল  অভিযোগ করে বলেন, উচ্ছেদ করতে আসা ওই ১৮ কাঠা জমির ওপর আদালতের ‘স্টে অর্ডার’ ছিল। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট এ অর্ডার অমান্য করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছেন।
অন্যদিকে, কোনওরকম পূর্ব ঘোষণা বা নোটিশ ছাড়াই উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয় বলে অভিযোগ করেন বস্তিবাসী।

কল্যাণপুর পোড়াবস্তির ভাঙার দৃশ্য ৪

ম্যাজিস্ট্রেট নুর আলম সে সময় বলেছিলেন, বারবার নোটিশ করেছিলাম, তারপরও তারা সরে যাননি। ফলে সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করেই অভিযান চালাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, এখানে ৫০ একর জমির মধ্যে ১৫ একর জমির ওপর ‘স্টে অর্ডার’ ছিল। বাকি জমির অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযান চলছে।

২০০৩ সালে উচ্চ আদালতে একটি মামলা করা হয়, যেন বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ না করা হয়। এ সময় উচ্চআদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উচ্ছেদ না করার জন্য স্থগতি আদেশ দেয়। ২০০৭ সালে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বস্তি উচ্ছেদ না করার জন্য পুনরায় আদেশ দেন আদালত। বর্তমানে মামলাটি চলমান রয়েছে।

কল্যাণপুর পোড়াবস্তির ভাঙার দৃশ্য ৬

সরেজমিনে দেখা গেছে, বস্তির নতুবজার পাশের প্রায় শতাধিক ঘর, দোকান ভেঙে দিয়েছে বুলযোজার দিয়ে। নারী ও শিশুসহ প্রায় দেড়হাজার মানুষ খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। কোনও জনপ্রতিনিধিদের দেখা যায়নি।

ঘটনার পর মিরপুর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার কায়ুমুজ্জামান ঘটনাস্থলে এসে সাংবাদিকদের জানান, গৃহায়নের আদেশ অনুযায়ী পুলিশ এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। কোনও আহত বা হতাহতের খবর তার জানা নেই। কোনও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেনি। 

বস্তির বাসিন্দা স্কান্দার আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই বস্তিতে ৩৬ বছর আগে এসেছি। আমরা এখন কোথায় যাব। কোথায় থাকব। আমাদের কী হবে? বুলডোজার দিয়ে সব পুড়িয়ে দেওয়া হলো।’ তিনি বলেন, ‘এর আগেও বহুবার বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। কয়েকবার আগুন দেওয়া হয়েছে। এরপর এটির নাম হয়েছে পোড়াবস্তি।’

উল্লেখ্য মঙ্গলবার পোড়াবস্তির এক নারীসহ ছয় বয়স্ক বাসিন্দাকে আলোচনার কথা বলে মিরপুর মডেল থানায় নিয়ে ৮ ঘণ্টা হাজতে আটকে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ওই বস্তিতে বাস করেন। বস্তি উচ্ছেদের আগে যেন তারা নিজেরাই সেখান থেকে সরে যান। সে জন্য তাদের থানায় এনে বলে দেওয়া হয়। 

/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম