নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় সাম্প্রতিক ইউপি নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে হামলায় বিজিবি সদস্য নিহতের ঘটনায় সহিংসতার মূলহোতা ও মামলার প্রধান আসামি মো. মারুফ হোসেন ওরফে অন্তিককে ঢাকার আশুলিয়া থেকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। তিনি জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ভোটে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরে যান তিনি।
মঙ্গলবার (১৪ ডিসেম্বর) সকালে র্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গত ২৮ নভেম্বর সারা দেশব্যাপী ৩য় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার গড়াগ্রাম ইউনিয়নের পশ্চিম দলিরাম মাঝাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্রে সহিংসতার ঘটনায় বিজিবি সদস্য নায়েক রুবেল হোসেন নির্মমভাবে নিহত হন।
গত ৩০ নভেম্বর ৯৫ জন আসামির নাম উল্লেখ করে কিশোরগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন প্রিসাইডিং অফিসার।
মামলাটিতে র্যাব সদর দফতরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-৪ যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে বিজিবি সদস্য হত্যা মামলার প্রধান আসামি মো. মারুফ হোসেন ওরফে অন্তিককে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারকৃত আসামি মো. মারুফ হোসেন ওরফে অন্তিকের বাবা মৃত মোসাদ্দেক হোসেন নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় গড়াগ্রাম ইউনিয়নের ১৯ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন। তার বাবা গত ২০১৭ সালে মৃত্যুবরণ করলে উপ-নির্বাচনে তিনি নির্বাচিত হন।
এবারও তিনি জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। র্যাবের দাবি, গ্রেফতারকৃত মারুফ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তাকে এবার জিততে গড়াগ্রাম ইউনিয়নের পশ্চিম দলিরাম মাঝাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রায় সব ভোট প্রয়োজন ছিল। যে কোনও মূল্যে এই কেন্দ্রের প্রায় সব ভোট সে কেটে নিতে চেয়েছিল। এজন্য দলবল নিয়ে সে পেশীশক্তি ব্যবহার করবে বলে পরিকল্পনা করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৮ নভেম্বর দলিরাম মাঝাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট চলাকালীন আনুমানিক সোয়া ৩টার দিকে ২০ থেকে ৩০ জন সমর্থক নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে জোর করে ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। এসময় ভোট কেন্দ্রে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার তাদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিতে চেষ্টা করলে তারা তাকে গালি-গালাজসহ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। পরবর্তী সময়ে প্রিজাইডিং অফিসার উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে মোবাইলে জানানো হলে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়। বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে ভোট গ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করে দলিরাম মাঝাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোট গণনা শুরু করা হয়। কেন্দ্রে মোট ২ হাজার ৯৭১ ভোটের মধ্যে গ্রেফতারকৃত প্রার্থীর পক্ষে ২ হাজার ৩৩৬ ভোট এবং অন্য প্রতীদ্বন্ধীরা যথাক্রমে; ৭০টি ও ০৬টি ভোট পায়। তবে অন্য আটটি কেন্দ্রের ফলাফলে সে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জোনাব আলী বিজয়ী হন।
র্যাব কর্মকর্তা আল মঈন বলেন, ‘হেরে গিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মারুফ হোসেন। নিজের পক্ষে ফল আনার জন্য সে দলিরাম মাঝাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সম্পূর্ণ ভোট তার পক্ষে প্রদানের জন্য প্রিজাইডিং অফিসারকে আটকে রেখে চাপ দিতে থাকে। প্রিজাইডিং অফিসার অপারগতা প্রকাশ করলে মারুফসহ তার প্রায় শতাধিক সমর্থকসহ বিভিন্ন ধারালো দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রিজাইডিং অফিসার, অন্যান্য নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি ও কেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপর হামলা করে। এতে অনেকেই আহত হয়। এ সময় নির্বাচনের কাজে ব্যবহৃত সরকারী যানবাহন ও নির্বাচন কেন্দ্রে ব্যাপক ভাংচুর চালায়।’
র্যাবের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ওই দিন আনুমানিক রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিজিবি টহল দল সেখানে উপস্থিত হলে গ্রেফতারকৃত আসামি মো. মারুফ হোসেন অন্তিক ও তার সমর্থকরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে বিজিবি সদস্যদের উপর চড়াও হয়। বিজিবি সদস্য রুবেলকে তারা দেশীয় অস্ত্র দিয়ে বেধরক মারধর করে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নায়েক রুবেল ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন এবং আরও অনেকেই গুরুতর আহত হন।’
এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর প্রধান আসামি মো. মারুফ হোসেন নীলফামারী জেলার জলঢাকায় কিছুদিন পলাতক ছিল। এরপর তিনি গত ৩০ নভেম্বর ঢাকায় আসেন। ঢাকার আশুলিয়ায় এতদিন আত্মগোপনে ছিল। সেখান থেকেই তাকে গ্রেফতার করা হলো।









