জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এখন বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে আলোচিত হলেও এই অভিযোগ অনেক পুরনো। বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে- শুরুতে ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি এত খারাপ হতো না। জাতিসংঘ ২০০৫ সালের আগে বিষয়টি আমলেই নিতে চায়নি। আর এখন দেখা যাচ্ছে শান্তিরক্ষীরা শুধু যৌন হয়রানি নয়, মানবপাচার, যৌন পল্লীতে বিক্রি করে দেওয়াসহ বিভিন্ন যৌন অপরাধের সঙ্গে জড়িত। আর তারা এসব করছে প্রধানত বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেবার লোভ দেখিয়ে। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে এখনই তার শান্তিরক্ষীদের ব্যাপারে সতর্ক হবার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে- ১২টি শিশুকে যৌন নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত ছয়টি দেশের শান্তিরক্ষীরা। এরমধ্যে বাংলাদেশও আছে। ১২ শিশুর মধ্যে ৬ জন ফ্রান্স, জর্জিয়া এবং অন্য একজন ইউরোপীয় দেশের সেনাদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ করেছে। অন্য ৬ জন অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ, কঙ্গো, নাইজার ও মরক্কোর শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে। যে দুজন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে (কার) কর্মরত ছিলেন।
গত বছরের আগস্টে নিউজউইকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কাজ শুরুর পরই ১৯৯২ সালে থেকেই শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি এবং যৌন সন্ত্রাসের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। তখন মোজাম্বিক, বসনিয়া, গায়েনা, লাইবেরিয়া এবং সিয়েলালিওনে শান্তিরক্ষীরা ওষুধ, স্বাস্থ্যসেবা এবং টাকার বিনিময়ে সেখানকার নারীদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করে। এমনকি তাদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহারের জন্য পাচারেরও অভিযোগ ওঠে।’
জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল ওভারসাইট সার্ভিসের এক কর্মকর্তা জানান, ‘২০০৮ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে ৪৮০টি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ জমা পড়ে। আর যারা যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন তাদের শতকরা ৩৬ ভাগই শিশু।’
১৯৯৬ সালে মোজাম্বিকের সাবেক ফার্স্ট লেডি গার্সা মার্শা ৬টি দেশের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ‘শান্তিরক্ষী বাহিনী কাজ শুরু করার পর ওইসব দেশে শিশুদের ওপর যৌন সন্ত্রাস, পতিতাবৃত্তি এবং নারী ও শিশু পাচার বেড়ে গেছে।’
ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিইটউট অব গ্লোবাল গভর্নেন্স-এর পরিচালক স্টুয়ার্ড এম প্যাট্রিক বলেছেন, ‘২০০৫ সালের আগে জাতিসংঘ এসব অভিযোগ আমলেই নেয়নি, বরং উল্টো বলেছে ওইসব দেশে আগে থেকেই পতিতাবৃত্তি ছিল। যারা অভিযোগ করছে তারা পেশাদার যৌনকর্মী।’
কোডব্লু নামের একটি প্রতিষ্ঠান সর্বপ্রথম জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে যেসব যৌন নিপীড়নের অভিযোগ পাওয়া যায় সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে অ্যাডভোকেসি শুরু করে। এইডস প্রতিরোধে কাজ করা এই সংগঠনটি তাদের কাজ করতে গিয়েই শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পায়।
২০০৩ সাল থেকে এর বিরুদ্ধে জতিসংঘ তৎপর হতে শুরু করে এবং ২০০৫ সালে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে। প্রকাশ করে নীতিমালা। আর গত শনিবার জাতিসংঘ অফিশিয়ালি যৌন নিপীড়নকারী শান্তিরক্ষীদের দেশের নাম প্রকাশ করল।
১৯৯১ সাল থেকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী কাজ শুরু করে। বর্তমানে ১ লাখ চার হাজার ৯২৮ সদস্যের এই শান্তিরক্ষী বাহিনীতে ১২০টি দেশের অংশগ্রহণ আছে। আর বাংলাদেশ ৯ হাজার ৪৪৬ জন ফোর্স নিয়ে শীর্ষে আছে।
আইএসপিআরের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম শাম্মী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের যাদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিষয়ে অভিযোগের তদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ জিরো টলারেন্স দেখাবে।’
আর সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহেদুল আনাম খান(অব.) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে এখন আমাদের অবদান সবচেয়ে বেশি। কোনও ঘটনায় যেন এটা ম্লান না হয়। দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ সংখ্যায় খুব সামান্য মনে হতে পারে কিন্তু অভিযোগ অভিযোগই। আমরা চাই একজনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ না আসুক।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী নিশ্চয়ই এরইমধ্যে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ শুরু করেছে। সামরিক আইন ছাড়াও অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে যেন প্রচলিত আইনেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাতিসংঘেরও উচিৎ হবে কোথাও কোনও সমস্যা থাকলে তা সংস্কার করা। কোনও কিছু গোপন না করা। কারণ শান্তিরক্ষীরা এ ধরনের কাজে জড়িয়ে পড়লে এই মহান মিশনটি প্রশ্নের মুখে পড়ে যেতে পারে।’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুর রশীদ (অব.) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জাতিসংঘ সরাসরি শাস্তি দিতে পারে না। শান্তি মিশনের যেসব সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে তাদের দেশ ব্যবস্থা নেয়। কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে আর আদৌ ব্যবস্থা নেওয়া হয় কিনা তার নজরদারী জতিসংঘের জোরদার করা উচিৎ।’
আর বাংলাদেশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করে।’
/এইচইউআর /এএইচ/








