অপরাধীদের পরিচয় গোপনের দিন শেষ হয়ে গেছে। অপরাধীদের সব ধরনের
প্রতারণা এবার শেষ হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) কর্মকর্তা ও কারা কর্মকর্তারা। জঙ্গিসহ যেসব অপরাধী নানা পরিচয়ে কারাগার ও আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে যায় সেটা আর সম্ভব হবে না এই ডাটাবেজের কারণে। রবিবার দুপুর ১টায় রাজধানীর র্যাব সদর দফতরে এই ডাটাবেজের উদ্বোধনকালে এসব তথ্য জানানো হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে র্যাব কর্মকর্তারা জানান, ডিজিটাল ডাটাবেজে আগে কেবল সাজাপ্রাপ্তদের তথ্য সংরক্ষিত থাকলেও বর্তমান ডাটাবেজে কারাগারে যাওয়া এক দিনের বন্দির তথ্যও থাকবে। সম্পূর্ণ ডিজিটাল ফরম্যাটে প্রস্তুত এই ডাটাবেজ থেকে মুহূর্তেই একজন অপরাধীর বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও কারা কর্তৃপক্ষ।
র্যাব কর্মকর্তার জানান, কোনও অপরাধীকে গ্রেফতারের পর তার পরিচয় শনাক্ত ও অতীত অপরাধ রেকর্ড (পিসিআর) জানতেই অনেকটা সময় চলে যায়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় অপরাধীরা নিজেদের আড়াল করতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকেন। মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে বিলম্বের এটিও অন্যতম একটি কারণ।
র্যাব কর্মকর্তারা আরও জানান, এই ডাটাবেজে এমনভাবে তথ্য সংরক্ষিত থাকবে, যে কারণে অপরাধীর পক্ষে মিথ্যাতথ্য দিয়ে তদন্ত কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হবে না। এই ডাটাবেজে প্রত্যেক অপরাধীর বিষয়ে ২০০ ধরনের তথ্য সন্নিবেশিত করা হয়েছে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধীর আঙুলের ছাপ ও চোখের চিত্র নেওয়া হয়। এর বাইরে ছবি, অতীত অপরাধ সংঘটনের সংখ্যা, অপরাধের ধরন, দণ্ড সংক্রান্ত তথ্যও সন্নিবেশ করা হয়েছে। এসব তথ্যের সঙ্গে অপরাধীর নাম, ঠিকানা, পেশা ইত্যাদি ব্যক্তিগত বিস্তারিত তথ্য রাখা হয়েছে।
সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীরা কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। বেশির ভাগ সময় তারা স্থান ও নাম পরিবর্তন করে ফেলেন। এতে তাদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। র্যাবের পরিচালনায় ও জেল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় বর্তমান ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে এই এই ডাটাবেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ প্রযুক্তির ফলে একই ব্যক্তি বারবার অপরাধ করে নিজের পরিচয় গোপনের কোনও সুযোগ থাকবে না। কারণ, তিনি জানবেন, অপরাধ করে তার পক্ষে পালিয়ে থাকা কিংবা নিজের পরিচয় গোপন রাখা সম্ভব হবে না।
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান জানান, র্যাব সদর দফতরের কমিনিউকেশন্স ও এমআইএস উইং-এর তত্ত্বাবধানে র্যাব সদর দফতরে ডাটাবেজ সার্ভার ও রিকভারি প্রক্সি সার্ভার স্থাপন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৮টি জেলে ওয়ার্কস্টেশন পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হবে। র্যাবের নিজস্ব অপারেটর দিয়ে কারা কর্তৃপক্ষের অপারেটরদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে। তিনি জানান, ডাটা এন্ট্রির কার্যক্রমে প্রথমে অপরাধীর ছবি নেওয়া হয়। এরপর ২০০ ফিল্ডে ডাটা এন্ট্রি করা হবে। অপরাধীর ১০ আঙ্গুলের ছাপ, ও দুই চোখের মনি স্ক্যান করা হবে।
ডাটাবেজে বন্দির যেসব তথ্য থাকবে :
প্রতিদিন প্রতিটি কারাগারে যে পরিমাণ অপরাধী প্রবেশ করে ও জামিন নিয়ে মুক্ত হয়, এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে স্থানান্তর, কারাগার থেকে কোর্টে ও সিভিল হাসপাতালে যারা যাবে, সবাকেই এই ডাটাবেজে সংরক্ষিত করা হবে। আঙুলের ছাপের (১০ আঙুলের ফিংগার প্রিন্ট) মাধ্যমে অন্যান্য জেলে কিংবা একই কারাগারে সে কতবার আটক থেকেছিল সেটা জানা যাবে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী এই ডাটাবেজ থেকে সার্চ করে প্রতি কারাগারে অথবা সব কারাগারের অপরাধীর সংখ্যা সহজেই জানা যাবে।
অপরাধীর কারাগারে ট্রান্সফার, জামিন, হাসপাতাল ভিজিট, বিশেষ কোনও তথ্য জেল থেকে মোবাইলে মেসেজ আকারে তাৎক্ষণিকভাবে কর্তৃপক্ষকে জানানো যাবে। ডাটাবেজে বিভিন্ন লেভেলের ইউজার রয়েছে। এক্ষেত্রে এক জেল প্রয়োজনে অন্য জেলের অপরাধীদের বিশেষ বিশেষ তথ্য পাবে। আইজি প্রিজন অফিস এবং সেন্ট্রাল ডাটাবেজ থেকে সব জেলের সব তথ্য প্রয়োজনে দেখতে পারবেন।
তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে আই জি প্রিজন অফিস ও সেন্ট্রাল ডাটাবেজ থেকে কোনও অপরাধীর পরিচয় দিয়ে সার্চ দিলে, তিনি কোন জেলে আছে, তা সহজে নিরূপণ করা সম্ভব হবে। অপরাধীর জেল ট্রান্সফারের ত্যাগের সময় ও আগমনের সময় দুই জেলেই অপরাধীর তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট হয়ে যাবে। সব জেলের অভ্যন্তরীণ তথ্য আদান-প্রদানও সহজ হবে এই ডাটাবেজের মাধ্যমে।
অপরাধীর জেল ট্রান্সফার বা বিশেষ গমনাগমন কর্তৃপক্ষ চাইলে ডাটাবেজ থেকে মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধীর নিকটাত্মীয়কে জানাতে পারবেন। এই ডাটাবেজ থেকে র্যাবের ক্রিমিনাল ডাটাবেজে তথ্য আদান-প্রদানও সম্ভব হবে।
এছাড়া, এই ডাটাবেজ থেকে অপরাধীর তথ্য জাতীয় পরিচয় পত্রের ডাটাবেজের সঙ্গে ম্যাচিং করানো সম্ভব হবে। জেলখানায় যারাই প্রবেশ করুক, সেই তথ্যও এই ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হবে। কেউ যদি আগে এক বা একাধিকবার কোনও জেলের বন্দি হিসেবে প্রবেশ করেন, তবে তার পূর্ব ইতিহাস প্রোফাইলসহ দেখা যাবে।
চালু করা যাবে একাধিকবার ধরা পড়া আসামির মনিটরিংয়ের জন্য এলার্ট সিস্টেম। গুরুত্বপূর্ণ বন্দিদের জেলখানায় অবস্থান ও অন্যান্য চলাচল মনিটরিং করা যাবে। আসামিদের সঙ্গে যারা দেখা করবেন তাদেরও ইতিহাস জানা যাবে এই ডাটাবেজ থেকে।
কোনও ক্রাইম স্পটে পাওয়া ফিঙ্গার প্রিন্ট অটো বায়োমেট্রিক ফিঙ্গার প্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন পদ্ধতির মাধ্যমে ম্যাচিংয়ের জন্য এই ডাটাবেজ ব্যবহার করা যাবে। র্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া কোনও আসামি জেলে আছে কিনা তা জানা যাবে। হত্যা ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধীর তথ্য পাওয়াও সহজ হবে।
র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ জানান, জঙ্গি ও সন্ত্রাসীরা নিজেদের নাম পরিচয় গোপন করে আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। এই ডাটাবেজের কারণে সেটা আর সম্ভব হবে না। কারণ একদিনের জন্য কারাগারে গেলেও তার বিস্তারিত তথ্য এই ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে। মুহূর্তে জানা যাবে সেসব তথ্য। কারা কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমও অনেক সহজ হয়ে যাবে। দীর্ঘ পাঁচ বছরের পরিশ্রমের ফসল এই ডাটাবেজ। এই ডাটাবেজের কারণে জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত ও সুদৃঢ় হবে। উপকৃত হবে বিচার বিভাগও।
/এমএনএইচ/








