ভয়ঙ্কর সোর্স এখন পুলিশের আতঙ্ক!

আমানুর রহমান রনি
০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ২১:০৮আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ২১:৩৫

পুলিশ সোর্স চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম ও হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর সোর্সদের এড়িয়ে চলছে পুলিশ। অনেক এলাকার সোর্সরাও গাঢাকা দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, অপরাধী শনাক্ত ও মামলা তদন্তে পুলিশকে যতটা সহযোগিতা করেন সোর্সরা, তারও বেশি  ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করে থাকেন। তাই পুলিশ সদর দফতর  কথিত সোর্সদের বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছে প্রতিটি সদস্যকে। সোর্স যাছাই ও তাদের সাহায্য নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সচেতন হওয়ার কথা বলেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় নাম-পরিচয় গোপন রেখে ওই এলাকার বিভিন্ন বিষয় তথ্য নেওয়ার নিয়ম রয়েছে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর। নিয়মিত তথ্যদাতাদের নিয়মিত সোর্স মানিও দেওয়া হয়। এলাকার দাগী আসামি, মাদকব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের মধ্যেই কেউ-কেউ সোর্স হন। সোর্সরা কোনও বাহিনীর স্বীকৃতি কোনও সদস্য নন। বাহিনীর সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে সোর্স নিয়োগ দিয়ে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, সোর্সরা মাদকস্পটসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। পুলিশের সঙ্গে চলাফেরার কারণে সাধারণ মানুষও সোর্সের নামে আতঙ্কে থাকেন। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কাগজ-পত্রে সোর্স বলে কোনও কথা নেই। এসব সোর্সের বিষয়ে ডিএমপি সদর দফতর থেকে রাজধানীর থানাগুলোয় চিঠি দিয়ে সোর্স নামধারী এসব অপরাধীর বিষয়ে ওসিদের সর্তক হতে বলা হয়েছে।
গত বুধবার রাতে শাহ-আলীতে চাঁদার জন্য পুলিশের সামনেই কয়েক সোর্স চা-দোকানি বাবুল মাতুব্বরকে  পুড়িয়ে হত্যা করে। এই ঘটনায় পুলিশের দায়িত্ব অবহেলা ও সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে বলে বাহিনীটির নিজস্ব তদন্তেই বের হয়ে আসছে। বরখাস্ত করা হয়েছে পাঁচ পুলিশ সদস্যকে। প্রত্যাহার হয়েছে থানাটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। পুলিশের সামনেই সোর্স দেলোয়ার, আয়ুব আলী ও রবিনসহ আরও কয়েকজন এই কাজ করেছে। পুলিশ ওই দোকানিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি।

সোর্স দিয়ে পুলিশের অপরাধ করানোর অভিযোগ এটি নতুন না। বেশ পুরনো। তবে অপরাধের মাত্রা দিনদিন বেড়েই চলছে। সোর্সদের কাছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, হাতকড়া এবং পুলিশের ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জামও দেখা যায়। অনেকেই তাদের পুলিশ মনে করেন। চা দোকানি বাবুল মাতুব্বরের ছেলে রাজু মাতুব্বর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা দেলোয়ারকে পুলিশ হিসেবে জানতাম। তার কাছে হাতকড়া দেখতাম সবসময়।

এরআগে, গত ১৭ জানুয়ারি কাফরুল এলাকায় সাবেক এক সিনিয়র সহকারী সচিবের ছেলের পকেটে হাত দিয়ে ইয়াবা দিয়ে দেন পুলিশের দুই সোর্স। পরবর্তী সময়ে পুলিশ ওই ছেলেকে আটক করে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরায়। একলাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। পরবর্তী সময়ে পুলিশেরে ঊধর্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে  তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ২৪ জানুয়ারি উত্তরায় কথিত সোর্সের মাধ্যমে এক তরুণ ব্যবসায়ীকে আটক করে আড়াই লাখ টাকা দাবি করে পুলিশ। এর সঙ্গেও পুলিশ জড়িত ছিল।

২০১৪ সালে সোর্স খোকন, নাসিম, ফয়সাল ও পলাশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঝুট ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান সুজনকে ধানমণ্ডি থেকে আটক করেন মিরপুর থানার এসআই জাহিদুর রহমান। পুলিশের আতঙ্কে তিনি মিরপুর ছেড়ে ধানমণ্ডিতে পালিয়ে ছিলেন। কিন্তু তার শেষ রক্ষা হয়নি। এসআই জাহিদুর রহমান, এএসআই রাজকুমার ও দুই কনস্টেবল মিলে থানা হাজতে ওই ব্যবসায়ীকে নিষ্ঠুর নির্যাতন করে হত্যা করেন। ওই ঘটনায় এসআই জাহিদুর ও সোর্স নাসিম কারাগারে রয়েছেন।

এছাড়া, আরও অনেকের সোর্সের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। ডাকাতি, ছিনতাই, ফুটপাত থেকে চাঁদা তুলে পুলিশের সঙ্গে ভাগবাটোয়ারা করা।

রাজধানীর প্রতিটি থানা এলাকায় এই সোর্স দৌরাত্ম্য রয়েছে। গোয়েন্দাদের কাছে এই অপরাধী কথিত সোর্সদের তালিকাও রয়েছে। সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন মিরপুরে পুলিশ সোর্স সাইফুল, দেলোয়ার, তারেক, রাজু ও রহমান। কাফরুল এলাকায় সোর্সদের তালিকায় বাবু, সুমন, মোশারফ, শাহীন, খ্রিস্টান বাবু, তামালুপা তামু রাজু, আলমগীর প্রমুখ।  তারা সবাই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। 

পুরান ঢাকায় জামান, লিটন, মনোয়ারা, সেলিম, ইয়াবা ঝিলু, ফেন্সি রমজান, কানাই, সামসু, জাহাঙ্গীর, শাকিল, সুজন, মাসুদ, সাব্বির,বাবলু, সফিক ও মুজিবর পুরো এলাকা দাপিয়ে বেড়ান।

শ্যামপুর, কদমতলী ও গেণ্ডারিয়া এলাকায় সোহাগ, আমির, সোহেল, শিপন, জাহাঙ্গীর, ভাগিনা রবিন, নজরুল, লালু, রহিম, আলী।

যাত্রাবাড়ীর শাহে আলম, আলতাফ, মাসুম, সুমন, শাহিন ও সালাম ও ফর্মা সিরাজ সোর্স হিসেবে এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

ধানমণ্ডি ও কলাবাগান এলাকায় মিন্টু, নাজির, ফাতেমা ও লাল চান, গুলশানের নাদিম, ফর্মা স্বপন  মোহাম্মদপুরের হানিফ ও রাসেল, জয়নাল; ডেমরার বাবু সেলিম।

পল্টন এলাকায় মরিয়ম, শাহাবউদ্দিন, আজমল, খলিল, সবুজবাগের বজলু মিয়া, রমনা এলাকায় হিরোইচি স্বপন, মালেক, খলিল ও আক্তারের নাম রয়েছে।

কামরাঙ্গীরচর থানা এলাকায় মাদক মামলার আসামি সিডি মিন্টু, সোহেল, আরিফ, আশরাফ এবং হাজারীবাগে জসিম, রনি, শাহজাহান ও ওয়াসিমের নাম রয়েছে। 

লালবাগ ও চকবাজার এলাকায় সোর্স হিসেবে কাজ করে বিল্লা, আবদুর রব, আলমগীর, বাসেত, আজমল ও তৌহিদসহ কয়েকজন।

শাহবাগে ফর্মা কাদের ও নিউমার্কেট এলাকা নাদিম ও কাইল্যা বাবু সোর্স হিসেবে কাজ করেন।

বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বনানী থানা পুলিশের সবচেয়ে পুরনো সোর্স শহীদ। তার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্রবহন-ব্যবহার, হুমকি-ধামকি দিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে বনানীতে। ওই এলাকায় নকল-আসল হিজড়াদের মধ্যে বিরোধ আছে। যার সুযোগ নিয়েছেন কথিত সোর্স শহীদ। তিনি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ান। হিজড়াদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গুলশান এলাকার হিজড়াদের ভাষ্য অনুযায়ী, কালেকশনের যে টাকা পাওয়া যায় এর মধ্যে ৫০ ভাগ নেন গুরু খায়রুল, ৩০ ভাগ দেওয়া হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। বাকি ২০ ভাগ পায় হিজড়ারা। আর এর মধ্যস্থতা করে পুলিশ সোর্স।

সোর্সদের অপরাধের বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সোর্স পরিচয় দিয়ে কেউ চাঁদাবাজি করলে, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারও কাছে এমন কোনও তথ্য থাকে সঙ্গে-সঙ্গে পুলিশকে জানালে তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে।

/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম