অনেক প্রশ্ন, তবু একমাত্র আসামি ‘মা’

জামাল উদ্দিন
০৪ মার্চ ২০১৬, ২১:২৩আপডেট : ০৬ মার্চ ২০১৬, ১৯:৪৩

মাহফুজা-মালেক-জেসমিন বনশ্রীতে দুই শিশু নুসরাত আমান অরনী (১২) ও আলভী আমান (৬) হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাঠে নেমেছেন গোয়েন্দারা। র‌্যাবের দাবি অনুযায়ী, শিশু দু’টির মা জেসমিন একাই দুই সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তবে এ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা একমত হতে পারছেন না। কারণ যাই হোক, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে বলে মনে করেন তারা। মা একাই দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন এটা অবিশ্বাস্য। তবে তদন্ত শেষে সব সত্যই বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি নিজ ঘরেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় নুসরাত আমান ও আলভী আমান নামের দুই ভাই-বোন। প্রথমে রেস্টুরেন্টের খাবারের বিষক্রিয়ায় মারা যাওয়ার খবর প্রচারিত হলেও ময়না তদন্তে জানা যায়, তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এরপরই নড়েচড়ে ওঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্তারা। তাৎক্ষণিকভাবে শিশুটির বাবা আমান উল্লাহ আমান ও মা মাহফুজা মালেক জেসমিন ও খালাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে র‌্যাব। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর র‌্যাব জানায়, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন শিশু দু’টির মা জেসমিন। বৃহস্পতিবার রাতে শিশু দু’টির বাবা আমান উল্লাহ আমান বাদী হয়ে রামপুরা থানায় স্ত্রী জেসমিনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

র‌্যাব দাবি করেছে, লেখাপড়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েই দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন বলে স্বীকার করেছেন মা জেসমিন। তবে র‌্যাবের এমন দাবি মেনে নিতে পারছেন না অনেকে। র‌্যাবের এমন দাবির বিষয়ে সংস্থাটির গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মা-বাবার কাছেই সন্তান সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। যে মা এতোদিন লালন-পালন করেছেন, তিনিই তাদের হত্যা করবেন সেটা অবিশ্বাসেরই কথা। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে মা জেসমিন স্বীকার করেন, সন্তানদের পড়ালেখা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণে তিনি নিজেই দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন। তবে তদন্ত শেষে সব সত্যই বেরিয়ে আসবে।’

বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দেন র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান। ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, মানসিক অসুস্থতা ও উদ্বেগ, সামাজিক ও পরিবারিক অবক্ষয়, পরকীয়া ও ধনসম্পদ আত্মসাতের কারণেই এমনটি হতে পারে।’

এ বিষয়ে র‌্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার মুফতি মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসব কারণ তিনি শুধু বনশ্রীর ঘটনার জন্যই উল্লেখ করেননি। দেশে শিশু হত্যায় এসব কারণ থাকতে পারে বলে মনে করেন র‌্যাবের দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা কর্নেল জিয়াউল আহসান।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা বিষয়টির ছায়া তদন্ত করছি। জনমনে যেসব প্রশ্ন রয়েছে, সব প্রশ্ন ও কারণ সামনে রেখেই তদন্ত কাজ চলবে। হত্যাকাণ্ডের আর কোনও কারণ ও কেউ জড়িত কিনা সেটা জানতে আদালত মাকে পুলিশ হেফাজতে দিয়েছেন। থানা কর্তৃপক্ষ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সেসব কারণ বের করার চেষ্টা করবেন।’

মৃত্যুর পর শিশু দু’টির ময়নাতদন্ত করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপক ডাক্তার প্রদীপ বিশ্বাস ও সহযোগী অধ্যাপক চিকিৎসক সোহেল মাহমুদ। মা জেসমিন একাই শিশু দু’টিকে হত্যা করেছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য। কঠিন কাজ। দুই শিশুকেই নাকে-মুখে ও গলায় চাপ দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার আলামত মিলেছে ময়নাতদন্তে। ক’জন মিলে হত্যা করেছেন সেটা দেখবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।’

চিকিৎসক সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘প্রাথমিক মতামত দিয়ে দুই শিশুর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পরীক্ষার জন্য মহাখালীতে পাঠানো হয়েছে। সেই প্রতিবেদন পেলে আমরা এ বিষয়ে চূড়ান্ত মতামত দেব।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গ সূত্র জানায়, মেয়েটির গলায় রক্ত জমাট বাঁধা ছিলো। ঠোঁটে, মুখে ও গলায় আঁচড়েরও দাগ ছিল। মাথার পেছনে রক্ত জমাট বাঁধা ছিলো। ছেলেটির ক্ষেত্রেও শ্বাসরোধের আলামত রয়েছে। তার মুখ চেপে ধরার লক্ষণই বেশি স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।’

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শামীম সরদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই শিশু সন্তানকে মা জেসমিন একাই হত্যা করেছেন কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। হত্যাকাণ্ডের কারণও ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তবে শিশু দু’টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মা জেসমিন জড়িত ছিলেন বলেই আমার মনে হচ্ছে।’

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘যে কোনও অপরাধের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণগত পরিবর্তন দেখা দেয়, যা তার নিজের অজান্তেই হয়। অপরাধের পর সেই আচরণগত পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট ছিলো।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মায়ের জড়িত থাকার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুঁজে বের করবে। কিন্তু এ ঘটনার সঙ্গে তিনি একাই জড়িত এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাছাড়া ঘটনার পরপরই মায়ের বিরুদ্ধে যেভাবে অভিযোগ আরোপ করা হচ্ছে সেটা ঠিক হচ্ছে না। অন্য কারণও থাকতে পারে এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে।’

গত সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনশ্রীর বাসায় দুই শিশু নুসরাত আমান ও আলভী আমানের মৃত্যুর পর রহস্যের সৃষ্টি হয়। নুসরাত ভিকারুননিসা নূন স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে এবং আলভী বাসার পাশে একটি স্কুলে নার্সারিতে পড়তো। বুধবার গ্রামের বাড়ি জামালপুরের বাসা থেকে র‌্যাব শিশু দুটির বাবা আমান উল্লাহ, মা মাহফুজা মালেক ও খালা আফরোজা মালেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকায় নিয়ে আসে। পরদিন বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করে র‌্যাব জানায়, দুই শিশু হত্যাকাণ্ডে মা জেসমিন জড়িত।

এদিকে শুক্রবার আদালতে হাজির করা হয় মা জেসমিনকে। সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘থানায় থাকা অবস্থায় জেসমিনের কাছে বার বার জানতে চাওয়া হয়েছে, শিশু দু’টিকে তিনি হত্যা করেছেন কি না। যতোবারই তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, ততোবারই তিনি নিজে হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছেন। জেসমিন সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন।’

এজে/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম