জুলাই গণঅভ্যুত্থান, শহীদ ও আহতদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক, টিভি উপস্থাপিকা, অভিনেত্রী, মডেল ও আইনজীবীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্টরা জুলাই আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, শহীদ ও আহতদের নিয়ে কটূক্তি, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো এবং ‘নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলকে পুনর্বাসনের চেষ্টা’ করেছেন।
তবে এসব অভিযোগ এখনও মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি। পুলিশ বলছে, অভিযোগে উল্লেখ করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ভিডিও, লিংক ও বক্তব্য যাচাইয়ের পর আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পুলিশ সূত্র জানায়, অভিযোগে থাকা পোস্ট, ভিডিও, লিংক এবং বক্তব্যগুলো যাচাইয়ের জন্য সাইবার ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা কোনও পোস্ট বাস্তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কিনা, সেটি সম্পাদিত বা বিকৃত কিনা এবং বক্তব্যের পুরো প্রেক্ষাপট কী ছিল— এসব বিষয়ও যাচাইয়ের প্রয়োজন হবে।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, অভিযোগ সাইবার সম্পর্কিত হওয়ায় বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ডিএমপির সাইবার ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। তারা তদন্ত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।
শিল্পী, সাংবাদিক ও আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের ঘটনাকে ঘিরে সামনে এসেছে নানামুখী বিতর্ক। জুলাই নিয়ে করা কোন বক্তব্য রাজনৈতিক সমালোচনা, কোনটি মতামত বা ভিন্ন ব্যাখ্যা, আর কোনটি মিথ্যা তথ্য, বিদ্বেষ, অপমান, হুমকি বা সহিংসতায় উসকানির পর্যায়ে পড়ে এবং আইনগত ব্যবস্থার বিষয় হবে— সেটা নিয়েই এখন আলোচনা চলছে।
‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’ নামের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে সাংবাদিক ও কলামিস্ট আনিস আলমগীর, টিভি উপস্থাপিকা সোমা ইসলাম, আইনজীবী ও মডেল জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া ওরফে পিয়া জান্নাতুল, কলামিস্ট মোমিন মেহেদী, মডেল মারিয়া কিসপট্টা এবং অভিনেত্রী ও মডেল তুষ্টির বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। সংগঠনটির সদস্য মিল্লাত হোসেন অভিযোগটি দায়ের করেন।
এর আগে অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি এবং শান্তা ফারজানার বিরুদ্ধেও জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে উপহাস, স্মৃতিস্তম্ভ অবমাননা এবং বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগকারীদের মতে, অভিযুক্তরা বিভিন্ন সময় ফেসবুক পোস্ট, ভিডিও-বার্তা, টকশো, সাক্ষাৎকার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থান, আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী, শহীদ এবং আহত ব্যক্তিদের নিয়ে আপত্তিকর, তাচ্ছিল্যমূলক ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা এবং আন্দোলনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগও আনা হয়েছে।
অভিযোগে কার বিরুদ্ধে কী বলা হয়েছে
শাহবাগ থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে টিভি উপস্থাপিকা সোমা ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন টকশোতে জুলাই আন্দোলনকে ‘ছোট করে উপস্থাপন’ এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আইনজীবী ও মডেল জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া ওরফে পিয়া জান্নাতুলের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই আন্দোলন ও আহত ব্যক্তিদের নিয়ে তাচ্ছিল্যমূলক বক্তব্য দেওয়া এবং আন্দোলনকারীদের ‘মব’ বলে উল্লেখ করার অভিযোগ করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি আহত জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেছেন।
কলামিস্ট মোমিন মেহেদীর বিরুদ্ধে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে জুতা নিক্ষেপ এবং শহীদ আবু সাঈদকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
সাংবাদিক আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি জেলখানা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সংগঠনগুলোর সঙ্গে মিলে জুলাই আন্দোলনকে নষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য ছড়াচ্ছেন। একইসঙ্গে জুলাই স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছেন এবং যারা জুলাই যুদ্ধে হাত-পা ও চোখ হারিয়েছেন, তাদেরকে অপমান করে এবং অপপ্রচার করছেন।
মডেল মারিয়া কিসপট্টার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি জুলাই আন্দোলনকে সন্ত্রাসী আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন এবং আহত আন্দোলনকারীদের নিয়ে হুমকি ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন।
অভিনেত্রী ও মডেল তুষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে— তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জুলাইকে ‘প্রতারণার মাস’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কেউ শহীদ হননি বলে বক্তব্য দিয়েছেন।
অপরদিকে, মেহের আফরোজ শাওন, মাহিয়া মাহি ও শান্তা ফারজানার বিরুদ্ধে করা সাধারণ ডায়েরিতে অভিযোগ করা হয়, শাওন জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ‘সাজানো নাটক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মাহিয়া মাহি আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। শান্তা ফারজানার বিরুদ্ধে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে জুতা নিক্ষেপের অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগকারীরা এসব বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। অভিযোগের পক্ষে কয়েকটি ফেসবুক পোস্টের লিংকও যুক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ডিএমপির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তরিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শাহবাগ থানা থেকে পাঠানো কাগজপত্র এখনও তাঁদের হাতে এসে পৌঁছেনি। তিনি বলেন, “কাগজপত্র হাতে পেলে আমরা বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখবো। পোস্ট, ভিডিও বা লিংক থাকলে সেগুলো যাচাই করা হবে। এরপর আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বাকস্বাধীনতার সীমারেখা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন পুলিশের তদন্তই নির্ধারণ করবে, অভিযোগে উল্লিখিত বক্তব্যগুলো আইনগত অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কিনা। নাকি তা রাজনৈতিক মতভিন্নতা ও সমালোচনার অংশ। অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য এবং ডিজিটাল প্রমাণের এই পরীক্ষাই ঠিক করবে— ‘জুলাই অবমাননা’র অভিযোগ কোথায় শেষ হবে এবং সংবিধানস্বীকৃত বাকস্বাধীনতার সীমারেখা কোথায় শুরু হবে।
যা বলেছেন আনিস আলমগীর
সাংবাদিক ও কলামিস্ট আনিস আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “খবরে নাম ফাটানোর সস্তা উদ্দেশ্যে সম্প্রতি কিছু ব্যক্তি, আরও কয়েকজনের সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে থানায় যে অভিযোগ করেছে, তা নিছক ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার।”
তিনি বলেন, “আমি কখনোই ‘জুলাই’কে অবজ্ঞা করিনি, জুলাইয়ের শহীদদের প্রতিও অসম্মান দেখাইনি। বরং যারা তাদের আত্মত্যাগকে অপমান করে কদর্য ভাষায় আক্রমণ করে, তাদের বিরুদ্ধেই আমি সরব থেকেছি এবং তার সুস্পষ্ট প্রমাণ রেকর্ডে রয়েছে।”
আনিস আলমগীর আরও বলেন, “আমার সমালোচনা বরাবরই ড. ইউনূসের অপশাসন এবং ‘জুলাই’ নামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তির মববাজি, চাঁদাবাজি, প্রতিহিংসা, অগণতান্ত্রিক ও দুর্বৃত্তসুলভ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে। এখন যদি এসবের সমালোচনাকেই ‘জুলাই অবমাননা’ বলে চালানো হয়, তাহলে সেটা নিছক সত্যকে চেপে যাওয়ার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। চেতনা ব্যবসা।”
তিনি বলেন, “যদি সমালোচনার এই অধিকারটুকুও কেড়ে নিতে চান, তাহলে সরকারের উচিত স্পষ্ট করে আইন করে দেওয়া— জনগণ ‘জুলাই’ নিয়ে কী বলবে, আর কী বলতে পারবে না।”
বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে মানবাধিকার সংগঠন
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মানুষ স্বাভাবিকভাবেই যে বিষয়, ব্যক্তি বা আন্দোলনের সঙ্গে আবেগগতভাবে যুক্ত থাকে, সেটি নিয়ে কেউ সমালোচনা করলে তার খারাপ লাগতেই পারে। বিশেষ করে জুলাইয়ের আন্দোলন, এর স্মৃতি, নিহত ও আহতদের প্রসঙ্গ এখনও বাংলাদেশের মানুষের কাছে খুবই সাম্প্রতিক এবং বেদনাদায়ক।’’
তিনি বলেন, “দুই বছর আগে যে আন্দোলন হয়েছে, সেখানে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন, অনেকে আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। ফলে এ আন্দোলনকে ঘিরে কথা বলার সময় সবাইকে দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। যারা এ নিয়ে মন্তব্য করছেন, তাদেরও খেয়াল রাখা উচিত— তাদের বক্তব্য যেন নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অনুভূতিকে অযথা আঘাত না করে। বিশেষ করে যদি কেউ মিথ্যা তথ্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা আইনভঙ্গের মতো কোনও বক্তব্য দেন, তাহলে অবশ্যই আইনগত প্রক্রিয়ার সুযোগ আছে এবং সংশ্লিষ্টরা আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।”
ইজাজুল ইসলাম বলেন, “একইসঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আমাদের সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার। কোনও বক্তব্য অপছন্দ হলেই তা নিয়ে মামলা, জিডি বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের পথ বেছে নেওয়া উচিত নয়। কারণ এ ধরনের পদক্ষেপ অনেক সময় মানুষের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের জায়গাকে সংকুচিত করতে পারে।”
তিনি বলেন, ‘‘এখানে দুই পক্ষেরই সংযম ও উদারতা দরকার। যারা মন্তব্য করছেন, তাদের আরও সম্মানজনক ও সতর্ক ভাষা ব্যবহার করা উচিত। আবার যারা ক্ষুব্ধ হচ্ছেন, তাদেরও আগে বিবেচনা করা দরকার— বক্তব্যটি সত্যিই আইনভঙ্গ, বিদ্বেষমূলক বা সহিংসতাকে উসকে দেওয়ার মতো কিনা। মত ভিন্নতার জবাব সবসময় মামলা বা জিডি দিয়ে নয়— যুক্তি, আলোচনা, প্রতিবাদ এবং জনমত তৈরির মাধ্যমেও দেওয়া যায়।”
ইজাজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘‘জুলাইয়ের আবেগ ও শহীদদের প্রতি সম্মান বজায় রেখে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে মানুষ দায়িত্বশীলভাবে কথা বলতে পারবে, আবার কারও বক্তব্যে সত্যিই আইন লঙ্ঘনের উপাদান থাকলে ন্যায্য ও স্বচ্ছ আইনগত প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা যাবে।’’








