আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বদলেছে বিএনপির অবস্থান?

মহসীন কবির
০৬ জুলাই ২০২৬, ০০:০০আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০০:০০

জুলাই গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজপথে ছিল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), হেফাজতে ইসলামসহ কয়েকটি দল ও সংগঠন। তখন বিএনপি দল নিষিদ্ধের দাবিতে সরাসরি আন্দোলনে না গিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যে সেই একই আইনি কাঠামো বহাল রেখে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে দলটি। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে আসলে কী চায় বিএনপি?

যেভাবে নিষিদ্ধ হলো আওয়ামী লীগের কার্যক্রম

জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের মুখে ২০২৫ সালের ১১ মে 'সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯' সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। পরদিন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সব রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে দলটিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত ৮ এপ্রিল ওই অধ্যাদেশকে 'সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬' হিসেবে জাতীয় সংসদে পাস করে বিএনপি সরকার। বিলটিতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিধানে কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি।

নির্বাচনের আগে যা বলেছিল বিএনপি

নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে জামায়াত ও এনসিপি আন্দোলন করলেও বিএনপি সে পথে হাঁটেনি। দলটির নেতারা বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের বিচার চাইলেও দল নিষিদ্ধের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেন।

২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি কোনও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ঐক্যের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, আলোচনা বাদ দিয়ে রাজপথে চাপ সৃষ্টি করা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।

এরপরও নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা বলেন, যেসব আওয়ামী লীগ নেতা অপরাধে জড়িত নন, তারা ভবিষ্যতে রাজনীতি করতে পারবেন।

সরকার গঠনের পর অবস্থান পরিবর্তন?

সরকার গঠনের তিন মাসের মাথায় আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপির অবস্থানে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা গেছে।

গত ৪ জুলাই রাজধানীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের স্মরণসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, দেশে আওয়ামী লীগ আর রাজনীতি করতে পারবে না। দলটির রাজনৈতিক পতন হয়েছে, আর 'দাফন হয়েছে দিল্লিতে'। তিনি জানান, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের আলোকে রাজনৈতিক দলের বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধন করা হয়েছে এবং শিগগিরই আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

চিফ প্রসিকিউটরের ব্যাখ্যা

রবিবার (৫ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে দল হিসেবে নানা অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯—দুটি আইনই আওয়ামী লীগের আমলে প্রণীত। সেই আইনেই দলটির বিচার করা সম্ভব।

কেন বদলালো অবস্থান?

নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপির কঠোর অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে।

অনেকে মনে করছেন, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত ও এনসিপিকে বিএনপি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখছে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ যদি আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে। সে কারণেই দলটিকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতির বাইরে রাখতে চাইছে সরকার।

এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। জামায়াত বিরোধী দলে থাকলেও একই মাত্রার রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে—এমনটি বিএনপি মনে করে না। তাই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সরকার আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

'বক্তব্য স্ববিরোধী'

সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে কিছুটা স্ববিরোধিতা রয়েছে। কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে।

তিনি বলেন, রাজনীতিবিদরা নানা বক্তব্য দিতে পারেন। কিন্তু প্রশাসক হিসেবে সরকার শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগ নিজেরাও এখন প্রকাশ্যে রাজনীতিতে ফেরার মতো তৎপরতা দেখাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও তারা দৃশ্যমান কর্মসূচি দেয়নি। বর্তমানে বিরোধী রাজনীতির মূল ভূমিকা পালন করছে জামায়াত ও এনসিপি। সরকার হয়তো সেই বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখছে।

আইনি পথেই নিষিদ্ধ চায় বিএনপি

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান ব্যাখ্যা করে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আওয়ামী লীগ গণহত্যার সঙ্গে জড়িত—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন মহল দলটিকে নিষিদ্ধের দাবি তুলেছে।

তিনি বলেন, কেউ কেউ নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করার কথা বলছেন। কিন্তু বিএনপি চায় বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হোক। এতে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্তটি নিয়ে কোনও আইনি প্রশ্ন বা বিতর্ক থাকবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যেও সেই অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে।

/এম/
সম্পর্কিত
নদী থেকে উদ্ধার লাশ আ.লীগ নেতার বলে প্রচার, পুলিশের সতর্কবার্তা
ব্রাজিলের জয়ে নাচের ভিডিও ভাইরাল, বিএনপি নেতা বহিষ্কার
সেই লিটু যুবদলের কেউ নন, সংবাদ সম্মেলনে বললেন নেতারা
সর্বশেষ খবর
দুই তারকা ছাড়াই নরওয়ের বিপক্ষে শুরু করছে ব্রাজিল
দুই তারকা ছাড়াই নরওয়ের বিপক্ষে শুরু করছে ব্রাজিল
বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করায় ফিফাকে ধন্যবাদ দিলেন ট্রাম্প
বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করায় ফিফাকে ধন্যবাদ দিলেন ট্রাম্প
বিকালে নিখোঁজ, রাতে নালার পানিতে মিললো দুই বোনের লাশ
বিকালে নিখোঁজ, রাতে নালার পানিতে মিললো দুই বোনের লাশ
গুলি করতে করতে চিকিৎসককে অপহরণ, মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেলেন
গুলি করতে করতে চিকিৎসককে অপহরণ, মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেলেন
সর্বাধিক পঠিত
নামিদামি হোটেলের সবজি এত মজার হয় কেন? জানুন বাবুর্চিদের ট্রিকস
নামিদামি হোটেলের সবজি এত মজার হয় কেন? জানুন বাবুর্চিদের ট্রিকস
মেসির ইন্টার মায়ামিতে যাচ্ছেন ভোজিনহা!
মেসির ইন্টার মায়ামিতে যাচ্ছেন ভোজিনহা!
‘ট্রাফিক পুলিশকে অনুরোধ না করতে সব মন্ত্রীকে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী’  
‘ট্রাফিক পুলিশকে অনুরোধ না করতে সব মন্ত্রীকে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী’  
প্রাক্তন দুই স্ত্রীর শুভকামনা সঙ্গে নিয়ে আজ আমিরের বিয়ে
প্রাক্তন দুই স্ত্রীর শুভকামনা সঙ্গে নিয়ে আজ আমিরের বিয়ে
জুলাইয়ে কাদের হাতে স্নাইপার রাইফেল ছিল জানালেন চিফ প্রসিকিউটর
জুলাইয়ে কাদের হাতে স্নাইপার রাইফেল ছিল জানালেন চিফ প্রসিকিউটর