কেরানীগঞ্জ থেকে মতিঝিল: বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলোতে যোগসূত্র খুঁজছে পুলিশ 

ইমরান আলী
০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০

গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিং এলাকার একটি বাড়িতে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। ‘উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’ নামে ভাড়া নেওয়া ওই বাড়ি থেকে পরে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক পদার্থ, বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম এবং ৯টি তাজা বোমা উদ্ধারের কথা জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এরপর রাজধানী ও দেশের কয়েকটি স্থানে বিস্ফোরণ এবং বোমা উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত ২৫ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে একটি আইইডি বা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস উদ্ধার করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, মতিঝিলে পাওয়া আইইডির সঙ্গে কেরানীগঞ্জসহ আগের কয়েকটি ঘটনায় উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকের কিছু কারিগরি মিল পাওয়া গেছে। ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনও যোগসূত্র আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

এরপর ১ আগস্ট রাজধানীর ফার্মগেট ও মিরপুর মেট্রোরেল স্টেশনে দুটি পরিত্যক্ত ব্যাগ ঘিরে বোমার সন্দেহ তৈরি হয়। পরীক্ষা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত হয়, ব্যাগ দুটিতে কোনও বিস্ফোরক ছিল না। একই দিন রাতে সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আগস্ট মাসকে ঘিরে নানা ধরনের ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। সে কারণেই নিরাপত্তা জোরদার ও সতর্কতা বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

বিস্ফোরকের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় পুলিশের তল্লাশির সময় হামলার ঘটনা ঘটে। পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফেলে যাওয়া একটি ব্যাগ থেকে কয়েকটি বোমা উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, প্রাথমিক পরীক্ষায় সেগুলোর সঙ্গে কেরানীগঞ্জে পাওয়া বিস্ফোরকের কিছু সাদৃশ্য ধরা পড়ে।

মার্চে রাজধানীর সায়েদাবাদে পুলিশের তল্লাশির সময়ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একই মাসে কুমিল্লা শহরের একটি শিবমন্দিরে বিস্ফোরণ হয়। এসব ঘটনা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত কিনা, তা যাচাই করছেন তদন্তকারীরা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রের ভাষ্য, মতিঝিলে উদ্ধার হওয়া আইইডির সঙ্গে কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী এবং সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় পাওয়া বিস্ফোরকের নির্মাণপদ্ধতি ও উপকরণের কিছু মিল রয়েছে। তবে কারিগরি সাদৃশ্যের ভিত্তিতেই ঘটনাগুলো একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাজ বলে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। ফরেনসিক পরীক্ষা, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল তথ্য এবং গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য মিলিয়ে বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে কেরানীগঞ্জ বিস্ফোরণের পর পলাতক শেখ আল আমিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে নাজমুল হাসান মামুন ও মোহাম্মদ আরিফকে শনাক্ত করা হয়েছে।

কেরানীগঞ্জ বিস্ফোরণের তদন্ত

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বোমা তৈরির সময় অসতর্কতার কারণে কেরানীগঞ্জের বাড়িটিতে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে শেখ আল আমিন, তার স্ত্রী ও সন্তান আহত হন। ঘটনার পর আল আমিন পালিয়ে যান বলে জানায় পুলিশ।

পুলিশের দাবি, শেখ আল আমিন নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যাবে যাচ্ছে না।

ঘটনাস্থল থেকে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, অ্যাসিটোন ও নাইট্রিক অ্যাসিডসহ প্রায় ৪০০ লিটার রাসায়নিক পদার্থ উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ। এ ঘটনায় শেখ আল আমিনসহ ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সিটিটিসির একটি সূত্র জানায়, কেরানীগঞ্জে পাওয়া বিস্ফোরক তৈরিতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, অ্যাসিটোন ও নাইট্রিক অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়েছিল। অন্যদিকে মতিঝিলে উদ্ধার হওয়া আইইডিটি জিআই পাইপের ভেতরে তৈরি করা হয়। এতে সার্কিট ও ব্যাটারি সংযুক্ত ছিল। তদন্তকারীরা এখন উপাদান, নির্মাণকৌশল, সার্কিটের ধরন ও সম্ভাব্য উৎস তুলনা করছেন।

মতিঝিলের ঘটনায় মামলা

মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া আইইডির উৎস এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাটি পরিকল্পিত নাশকতার চেষ্টা ছিল কিনা, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা, ব্যক্তিগত বিরোধ বা অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল কিনা, সেসব সম্ভাবনাও তদন্তের বাইরে রাখা হচ্ছে না।

২৫ জুলাই রাতে মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক মির্জা মোহাম্মদ মুক্তা বাদী হয়ে মামলা করেন। এতে বেআইনিভাবে বিস্ফোরক তৈরি, সংরক্ষণ, বহন ও ব্যবহারের পাশাপাশি নাশকতার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছে মতিঝিল থানা পুলিশ। তদন্তে সহায়তা করছে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, “বোমাটি কে বা কারা সেখানে রেখেছে, তা এখনও শনাক্ত করা যায়নি। এর উৎস এবং জড়িতদের চিহ্নিত করতে তদন্ত চলছে।”

রথযাত্রার সঙ্গে সম্পর্ক যাচাই

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মতিঝিলে আইইডি উদ্ধারের দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টো রথযাত্রা ছিল। ফলে ওই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিস্ফোরকটি রাখা হয়েছিল কিনা, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার হোসেন মোহাম্মদ ফারাবী বলেন, “বোমাটি কে বা কারা, কখন সেখানে রেখেছে—সিসিটিভি ফুটেজে তা স্পষ্টভাবে ধরা পড়েনি। এলাকার কয়েকটি ক্যামেরা অকার্যকর ছিল। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, উল্টো রথযাত্রায় আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই এটি রাখা হয়েছিল।”

পুলিশ জানায়, মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে জেনারেটর কক্ষের পাশে একটি ছাতার ভেতরে বোমাসদৃশ বস্তু দেখতে পান দায়িত্বে থাকা সদস্যরা। পরে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল সেটি নিষ্ক্রিয় করে। এ সময় স্প্লিন্টার চোখে লেগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী মিরাজ হোসেন নামে এক পথচারী আহত হন।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সেদিন ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে উল্টো রথযাত্রার শোভাযাত্রা বের হয়ে মতিঝিলের শাপলা চত্বর হয়ে স্বামীবাগ আশ্রমে যায়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে ট্রাফিক সার্জেন্ট কাওছার হোসেন মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি ছাতার ভেতরে আলো জ্বলতে দেখে ডিএমপি কন্ট্রোল রুমে খবর দেন। পরে পুলিশ এলাকা ঘিরে আইইডিটি নিষ্ক্রিয় করে।

যোগসূত্র এখনও নিশ্চিত নয়

কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণ, রাজধানীর কয়েকটি স্থানে বোমা উদ্ধার এবং কুমিল্লার বিস্ফোরণের মধ্যে কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে এসব ঘটনার পেছনে একই ব্যক্তি, দল বা নেটওয়ার্ক রয়েছে কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয়।

তদন্তে বিস্ফোরকের উপকরণ, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু, অর্থায়ন, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চলাচলের তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আতঙ্ক সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর কোনও উদ্দেশ্য ছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সারাদেশে পুলিশের যানবাহন ও স্থাপনার নিরাপত্তা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের বার্তায় সব মহানগর, রেঞ্জ, জেলা ও ইউনিটকে যানবাহন নজরদারিতে রাখা, নিরাপদ স্থানে পার্কিং এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি বা বস্তু শনাক্তে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ফরেনসিক প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল তথ্য এবং জিজ্ঞাসাবাদের ফল না পাওয়া পর্যন্ত কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।

/এম/জেইউ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সন্ত্রাসের নেটওয়ার্ক নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন ‘ডেভিড ইমন’ 
১৭ লাখ টাকায় পুলিশে চাকরি দেওয়ার চুক্তি, ধরা পড়লেন ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক
দেশজু‌ড়ে সতর্কতা জা‌রি পুলিশ সদর দফত‌রের
সর্বশেষ খবর
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই গবেষণায় যুক্ত হওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই গবেষণায় যুক্ত হওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শিশুকে নিয়ে ভ্রমণ সহজ করতে কাজে লাগবে যে কৌশল
শিশুকে নিয়ে ভ্রমণ সহজ করতে কাজে লাগবে যে কৌশল
ফোন বারবার হ্যাং করছে? মাত্র একটি ভুলেই স্লো হয়ে যাচ্ছে আপনার স্মার্টফোন
ফোন বারবার হ্যাং করছে? মাত্র একটি ভুলেই স্লো হয়ে যাচ্ছে আপনার স্মার্টফোন
যশ ‘সাহসী’, কিয়ারা কেন সমালোচিত
যশ ‘সাহসী’, কিয়ারা কেন সমালোচিত
সর্বাধিক পঠিত
নিজ এলাকাতেই সংশোধন করা যাবে এনআইডি
নিজ এলাকাতেই সংশোধন করা যাবে এনআইডি
কখন বুঝবেন ‘চাকরিটা এবার ছাড়ার সময় হয়েছে’
কখন বুঝবেন ‘চাকরিটা এবার ছাড়ার সময় হয়েছে’
যে ফলের দাম আইফোনের চেয়েও বেশি
যে ফলের দাম আইফোনের চেয়েও বেশি
অভাবের সংসার থেকে বাংলাদেশ টেস্ট দলে, মুশফিকের সংগ্রামের গল্প
অভাবের সংসার থেকে বাংলাদেশ টেস্ট দলে, মুশফিকের সংগ্রামের গল্প
আসিয়ানে যোগ দেওয়া হচ্ছে না বাংলাদেশের, কারণ জানালেন মহাসচিব
আসিয়ানে যোগ দেওয়া হচ্ছে না বাংলাদেশের, কারণ জানালেন মহাসচিব