অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৪৮আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৪৮

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশতিয়াক শাহরিয়ার অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২০ ঘণ্টা পর তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে চাইল্ড রাইটস অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর ছবি তুলতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর অপ্রতিম নিখোঁজ হয়। প্রায় ২০ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন লালমাই পাহাড় এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ তদন্ত করছে এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

কোয়ালিশন মনে করে, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুটিকে জীবিত ও নিরাপদে উদ্ধারের জন্য দ্রুত অনুসন্ধান, তথ্য সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত শিশু নিখোঁজের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের বিষয়ে জিডি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে গেছে; তবে ২ হাজার ৩৮ শিশুর এখনও সন্ধান মেলেনি।

একই সময়ে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পর্যবেক্ষণেও শিশুদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ঘটনা উঠে এসেছে। আসক এর জানুয়ারি-আগস্ট সময়ের পরিসংখ্যানে শিশুদের বিরুদ্ধে ৭০৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনা। এসব তথ্য শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে।

চাইল্ড রাইটস অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক মনে করে, অপ্রতিমের ঘটনাকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি শিশুর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু পরিবারকে যেমন অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ফেলে, তেমনি শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।

অপ্রতিম হত্যাকান্ডের বিচার এবং শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে চাইল্ড রাইটস অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন বাংলাদেশ (CRAC,B)-এর দাবিগুলো হলো— 

দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে; অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার সময় থেকে মরদেহ উদ্ধারের পুরো ঘটনাপ্রবাহ তদন্তের আওতায় আনতে হবে; সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য, ফরেনসিক আলামতসহ সব প্রাসঙ্গিক তথ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে; প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে; তদন্তে যার বা যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হবে, তাদের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি করতে হবে; একই সঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা যাবে না; নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সাড়া নিশ্চিত করতে হবে; অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করতে হবে; পরিবার, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিশু সুরক্ষায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দ্রুত ও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে; শিশুদের চলাচলের স্থান ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো নিরাপদ করতে হবে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্যাম্পাস, পার্ক, পাহাড়ি এলাকা, বিনোদনকেন্দ্র ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সিসিটিভি, নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা এবং জরুরি সহায়তার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে; শিশুবান্ধব পুলিশি সেবা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

এছাড়া শিশু নিখোঁজ, অপহরণ, নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং শিশু আইন ২০১৩সহ প্রযোজ্য আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে শিশু সুরক্ষায় সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবিও জানায় সংগঠনটি। 

সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে শিশুদের নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষায় সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নিখোঁজ শিশুদের অনুসন্ধান, উদ্ধার ও পরবর্তী সুরক্ষার জন্য কার্যকর সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় হেল্প লাইন (১০৯ ও ১০৯৮) সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা জরুরি বলে মনে করে সংগঠনটি। 

নেটওয়ার্ক মনে করে, শিশুর নিরাপত্তা কোনও অনুগ্রহ নয়-এটি শিশুর অধিকার। প্রতিটি শিশুর নিরাপদে বেঁচে থাকা, চলাফেরা করা, শিক্ষা গ্রহণ করা এবং সহিংসতা ও শোষণ থেকে সুরক্ষিত থাকার অধিকার রয়েছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের অংশীদার রাষ্ট্র হিসাবে এই অধিকার নিশ্চিত করা বাংলাদেশের দায়িত্ব।

চাইল্ড রাইটস অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক অপ্রতিমের মৃত্যুর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন, আইন অনুযায়ী জবাবদিহি এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান জানায়। 

/আইএ/এসটি/ 
সম্পর্কিত
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে এক শিশুর মৃত্যু
শিশুকে ‘আছড়ে হত্যা’ : বাবাকে রিমান্ডে চায় পুলিশ
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হামে প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে শিশু, থামবে কবে
সর্বশেষ খবর
পেপারলেস হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় 
পেপারলেস হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় 
ঋতুপর্ণাদের খেলায় মুগ্ধ বাংলাদেশ কোচ
ঋতুপর্ণাদের খেলায় মুগ্ধ বাংলাদেশ কোচ
পাকিস্তান-চীন নতুন সীমান্ত চুক্তি নিয়ে অস্বস্তি কেন ভারতের
পাকিস্তান-চীন নতুন সীমান্ত চুক্তি নিয়ে অস্বস্তি কেন ভারতের
নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে নজরদারি জোরদারের ঘোষণা বাণিজ্যমন্ত্রীর
নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে নজরদারি জোরদারের ঘোষণা বাণিজ্যমন্ত্রীর
সর্বাধিক পঠিত
নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী, সফরসঙ্গী কারা?
নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী, সফরসঙ্গী কারা?
‘নিজেকে শেষ করার’ আগে চিরকুটে কষ্টের কথা লিখে গেছেন মরিয়ম
‘নিজেকে শেষ করার’ আগে চিরকুটে কষ্টের কথা লিখে গেছেন মরিয়ম
এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী পুলিশি হেফাজতে
এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী পুলিশি হেফাজতে
সরকারি চাকরিজীবীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্ত্রী বা স্বামী, তবে....
সরকারি চাকরিজীবীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্ত্রী বা স্বামী, তবে....
অপ্রতিম হত্যা: আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়ে যা জানিয়েছে তিন আসামি 
অপ্রতিম হত্যা: আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়ে যা জানিয়েছে তিন আসামি