গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ভাটারার সাঈদনগর এলাকায় মোটরসাইকেলে ঘুরতে বেরিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন দুই বন্ধু সুমন ও রবিউল। ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়েন তারা। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক সুমনকে মৃত ঘোষণা করেন। মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন তিনি। দুর্ঘটনায় তার বন্ধু রবিউল (২২) আহত হন। সুমন পেশায় গ্রিলের কাজ করতেন। একই দিন মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা অবস্থায় বাসের ধাক্কায় ইমাম হোসেন নামের আরেকজন নিহত হন।
এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাণ হারান সৌদি আরব প্রবাসী হৃদয় (২৭)। সকালে উপজেলার কুচিয়ামোড়া ব্রিজের ঢালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে সাজ্জাদ (২৪) নামে আরও এক তরুণ গুরুতর আহত হন।
হৃদয় ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ উপজেলার রসুলপুর-আব্দুল্লাহপুর গ্রামের বাসিন্দা। চার মাস আগে সৌদি আরব থেকে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন তিনি। কয়েক দিনের মধ্যেই কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এক কন্যাসন্তানের জনক হৃদয়ের সেই ফেরা আর হলো না। আহত সাজ্জাদ সিরাজদিখান উপজেলার উত্তর ঘোড়ামারা এলাকার বাসিন্দা।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে এভাবেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন তরুণ-যুবকরা। অতিরিক্ত গতিতে চালানো, নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং ভারী যানবাহনের ধাক্কায় ঘটছে এসব দুর্ঘটনা। যাত্রী নিয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়াও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে দেশে ১৬ হাজার ৪০২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৬ হাজার ২৭ জন, আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৫৪৭ জন।
তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। তরুণ-যুবকদের অনেকে মোটরসাইকেল চালানোর সময় নিয়মশৃঙ্খলা মানতে চান না। তাদের অনেকের হেলমেট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকে না। অনেক সময় গাড়ির কাগজপত্র ছাড়াও তারা রাস্তায় বের হন।
তিনি বলেন, রাস্তায় মোটরসাইকেল থামাতে চাইলে অনেকে ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অতিরিক্ত গতিতে চালানোর কারণে একপর্যায়ে তাঁরা মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। তখনই দুর্ঘটনা ঘটে।
রফিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকা শহরে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহনের কারণে আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় বাইকের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। যাত্রী নেওয়ার পর দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার প্রবণতাও চালকদের মধ্যে দেখা যায়। এটিও দুর্ঘটনার একটি কারণ। তবে মহাসড়কে ফাঁকা রাস্তা পেলে গতি বাড়াতে থাকার প্রবণতা বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
ঢাকার ৩০০ ফিট পূর্বাচল সড়কে প্রায়ই দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সড়কটি প্রশস্ত এবং যানজট কম থাকায় চালকেরা বেশি গতিতে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করেন। গাড়ির সংখ্যা বেশি হলেও যানজট কম থাকায় সেখানে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, ক্যান্টনমেন্টের সড়কে দুর্ঘটনা তুলনামূলক কম ঘটে, কারণ সেখানে মানুষ নিয়ম মেনে চলেন। কিন্তু অন্য এলাকায় অনেকেই নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করেন না। সড়কে যেকোনও যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে নিয়ম মানা জরুরি। তা হলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা কমানো সম্ভব।
নিয়ন্ত্রণ হারানো ও ভারী যানবাহনের ধাক্কায় বেশি দুর্ঘটনা
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার মধ্যে ৩ হাজার ৫৪৮টি বা ২২ দশমিক ৮ শতাংশ ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষে। ৫ হাজার ৪৯৭টি বা ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারানো। এ ছাড়া ৬ হাজার ৩১৪টি বা ৩৯ দশমিক ৩০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে ভারী যানবাহনের ধাক্কায়। অন্য কারণে ঘটেছে ৭০৬টি বা ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের হিসাবে, মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী ৫ হাজার ৮৩১টি দুর্ঘটনায়, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। পণ্যবাহী যানবাহন দায়ী ৬ হাজার ৪৮১টি দুর্ঘটনার জন্য, যা ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। বাসের কারণে ঘটেছে ২ হাজার ১৬৪টি বা ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ দুর্ঘটনা।
এ ছাড়া থ্রি-হুইলারের কারণে ৭৩২টি বা ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের কারণে ৪৩৮টি বা ২ দশমিক ৭২ শতাংশ, পথচারীর কারণে ২৯৬টি বা ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং বাইসাইকেল ও রিকশার কারণে ১২৩টি বা শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
সড়কের ধরন অনুযায়ী, জাতীয় মহাসড়কে ৪ হাজার ৭৭৩টি বা ২৯ দশমিক ৭১ শতাংশ, আঞ্চলিক সড়কে ৬ হাজার ৬৮৯টি বা ৪১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, গ্রামীণ সড়কে ১ হাজার ৯৫৭টি বা ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং শহরের সড়কে ২ হাজার ৬৪৬টি বা ১৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। এর বড় অংশ চালান কিশোর ও তরুণ-যুবকরা। তাঁদের মধ্যে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা বাড়ছে। মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপস্থাপনাও অতিরিক্ত গতিতে বাইক চালাতে উৎসাহিত করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল প্রায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। উন্নত ও সহজলভ্য গণপরিবহনের অভাব এবং তীব্র যানজটের কারণে মানুষ মোটরসাইকেল ব্যবহারে বেশি উৎসাহিত হচ্ছেন। এতে দুর্ঘটনাও বাড়ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রাণহানির অন্যতম কারণ মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার না করা। গবেষণা অনুযায়ী, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার করলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
দুর্ঘটনা কমাতে আট দফা সুপারিশ
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না মানা, রাজনীতিতে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর সংস্কৃতি, ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ, সচেতনতামূলক কর্মসূচির অভাব, ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্বল সড়ক অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও নজরদারির ঘাটতি, সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের অভাব এবং অসহনীয় যানজট।
দুর্ঘটনা কমাতে সংস্থাটি আট দফা সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার, মানসম্মত হেলমেট বাধ্যতামূলক করা, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক প্রচার, বিটিআরসির মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রচারণা এবং মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনা। পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন চালুর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিচালক সাইদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মোটরসাইকেলসহ যেকোনও যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি সচেতনতা। সড়ক বা মহাসড়কে নিয়ম না মেনে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালালে দুর্ঘটনা ঘটবেই।
তিনি বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কারণগুলোর মধ্যে রাইড শেয়ারিংও রয়েছে। একজন যাত্রীকে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানো কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।
গণপরিবহনের সংকটও বাড়াচ্ছে মোটরসাইকেলের ব্যবহার
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশের আয়তনের তুলনায় প্রায় ৮০ লাখ মোটরসাইকেল চলছে। দিন দিন এ সংখ্যা বাড়ছে। দেশের সড়ক-মহাসড়কে কত মোটরসাইকেল চলতে পারে, সে বিষয়ে সরকারের কাছে কোনও পরিসংখ্যান নেই।
তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য শহরে গণপরিবহন হিসেবে দ্রুতগামী পরিবহন বা মাস ট্রানজিটের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশে এ ব্যবস্থা কেবল শুরু হয়েছে। তবে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় আরও অন্তত ১০টি এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পরিসংখ্যান খুবই উদ্বেগজনক। দেশে সড়ক কম, মোটরসাইকেল বেশি। এর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলকভাবে গাড়ি চালানো হলে দুর্ঘটনা ঘটবেই।
গণপরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি বাসে ৪০ জনের আসন থাকলেও অনেক সময় ৮০ জন যাত্রী ওঠেন। এ কারণে যাত্রীরা বাসে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। ফলে অনেকে মোটরসাইকেলের দিকে ঝুঁকছেন। এভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ আলাদা আলাদা মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় চলাচল করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, সবাইকে আইনকানুন মেনে চলতে হবে। তা না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে, আর সড়কে মৃত্যুর মিছিল দেখতে হবে।