প্রেম কি সত্যিই সারাজীবন টিকে থাকে?

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
২২ আগস্ট ২০২৬, ২৩:১৭আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৩৯

প্রেমের শুরুটা বেশিরভাগ সময়ই দারুণ রোমাঞ্চকর। একজন মানুষকে দেখলেই ভালো লাগে। তার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে। ফোনের অপেক্ষা, দেখা করার উত্তেজনা, ছোট্ট একটা বার্তায় মন ভালো হয়ে যাওয়া—সবকিছুতেই থাকে নতুনত্ব।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই উত্তেজনা একটু একটু করে কমে আসে। তখনই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—‘আগের মতো অনুভূতি হচ্ছে না, তাহলে কি ভালোবাসাটাও কমে গেছে?

আসলে বিষয়টা এত সরল নয়। প্রেমের শুরুতে যে তীব্র আকর্ষণ থাকে, সময়ের সঙ্গে সেটি বদলানো খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সেই জায়গাতেই তৈরি হতে পারে আরও গভীর এক সম্পর্ক—যেখানে উত্তেজনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বিশ্বাস, বোঝাপড়া, নিরাপত্তা আর একসঙ্গে পথ চলার অভ্যাস।

প্রেমের শুরু আর দীর্ঘদিনের প্রেম এক নয়

নতুন প্রেমে সবকিছুই নতুন। একটা ফোনকলের জন্য অপেক্ষা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা, বারবার দেখা করতে চাওয়া—এসব তখন খুব স্বাভাবিক। কিন্তু কয়েক বছর পর সেই একই মানুষকে প্রতিদিন দেখতে দেখতে তার অনেক কিছুই পরিচিত হয়ে যায়।

কখন তিনি বিরক্ত হন, কোন খাবার পছন্দ করেন, কীভাবে ঘুমান, কোন কথায় মন খারাপ হয়—এসব আর অজানা থাকে না। তখন প্রথম দিকের সেই তীব্র উত্তেজনা কমে যেতেই পারে। কিন্তু এটাকে ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়ার লক্ষণ ভাবার কারণ নেই। বরং অনেক সময় প্রেমের আসল গভীরতা বোঝা যায় উত্তেজনা কমে যাওয়ার পরই।

সবসময় বুক ধড়ফড় করবে—এমন নয়

আমরা প্রেমকে অনেক সময় একটা নির্দিষ্ট অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলি। মনে হয়, ভালোবাসা মানেই সারাক্ষণ সঙ্গীর কথা মনে পড়বে, তাকে দেখলেই বুক ধড়ফড় করবে, প্রতিদিন নতুন করে তাকে নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হবে।

বাস্তবে দীর্ঘ সম্পর্ক এমন হয় না। জীবনে কাজ থাকবে, ক্লান্তি থাকবে, অসুস্থতা থাকবে, মন খারাপ থাকবে। কোনও কোনও দিন সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলার মতো মানসিক শক্তিও থাকবে না। তাই কোনও একদিন আগের মতো উত্তেজনা অনুভব না করলেই সম্পর্কের প্রতি ভালোবাসা শেষ হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার দরকার নেই।

ভালোবাসা সবসময় উত্তেজনা নয়। কখনো কখনো ভালোবাসা মানে পাশে থাকা।

সবসময় আরও ভালো কাউকে খুঁজলে বর্তমান মানুষটাকে চেনা যায় না

আজকের সময়ে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় কাজ করে—বিকল্পের প্রাচুর্য। একজন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক চলছে। কিন্তু একই সঙ্গে মনে হচ্ছে, হয়তো আরও ভালো কাউকে পাওয়া সম্ভব। হয়তো আরও আকর্ষণীয় কেউ আছেন, আরও সফল কেউ আছেন, আরও রোমান্টিক কেউ আছেন, কিংবা আরও ‘মানানসই’ কেউ কোথাও অপেক্ষা করছেন।

এই ভাবনা যদি সবসময় মাথায় থাকে, তাহলে বর্তমান সম্পর্ককে গভীর করার সুযোগ কমে যায়। কারণ আপনি তখন মানুষটিকে নিয়ে কাজ করার বদলে ক্রমাগত তুলনা করতে থাকেন।

সম্পর্কের একটা পর্যায়ে এসে প্রশ্নটা হওয়া দরকার—‘এর চেয়ে ভালো কেউ আছে কি?’ তার চেয়ে বরং ভাবা যেতে পারে—‘আমরা যে সম্পর্কটা পেয়েছি, সেটাকে আরও ভালো করা যায় কীভাবে?’

দীর্ঘ সম্পর্কের সৌন্দর্যটা অন্য জায়গায়

নতুন প্রেমে আপনি সঙ্গীর ভালো দিকগুলোই বেশি দেখেন। সময় গেলে তার দুর্বলতাগুলোও চোখে পড়ে। কে বেশি রাগী, কে বেশি জেদি, কে কথা কম বলে, কে বেশি আবেগপ্রবণ—এসব ধীরে ধীরে জানা হয়ে যায়।

তখনই সম্পর্কের আসল পরীক্ষা। কারণ একজন মানুষকে ভালোবাসা সহজ, যখন তাকে প্রায় নিখুঁত মনে হয়। কিন্তু তার অপূর্ণতাগুলো জানার পরও তাকে গ্রহণ করা অনেক কঠিন। আর সেখানেই গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়।

‘তুমি নিখুঁত’ থেকে ‘তোমার অপূর্ণতাগুলো আমি জানি, তবু তোমাকেই চাই’—এই পথটাই দীর্ঘ সম্পর্কের পথ।

ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে খুব বড় কিছু লাগে না

দীর্ঘ সম্পর্কের জন্য সবসময় বড় আয়োজন দরকার হয় না। একসঙ্গে খাওয়া, দিন শেষে কিছুক্ষণ কথা বলা, সঙ্গী মন খারাপ করলে সেটা বোঝার চেষ্টা করা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া, সঙ্গী কোনো সাফল্য পেলে খুশি হওয়া কিংবা কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানো—এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভিত শক্ত করে।

কারণ ভালোবাসা শুধু বড় বড় কথায় প্রকাশ পায় না। অনেক সময় ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে খুব সাধারণ একটা প্রশ্নে—‘আজ তোমার দিনটা কেমন গেল?’ অথবা, ‘তুমি ক্লান্ত? আমি এটা করে দিচ্ছি।’

ক্ষমা করাও প্রেমের অংশ

দীর্ঘ সম্পর্ক মানেই ভুল হবে না—এমন নয়। বরং দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকলে ভুল বোঝাবুঝি হবেই। কখনো একজন এমন কথা বলবেন, যা অন্যজনকে কষ্ট দেবে। কখনো অভিমান হবে। কখনো দুজনের মত একেবারেই মিলবে না।

 

এখানে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে দরকার শুধু ভালোবাসা নয়, ক্ষমা করার ক্ষমতাও। অবশ্যই সবকিছু মেনে নেওয়া নয়। অন্যায় বা নির্যাতন সহ্য করাও ভালোবাসার প্রমাণ নয়। কিন্তু ছোটখাটো ভুল, অভিমান কিংবা মানুষের স্বাভাবিক অপূর্ণতার জায়গাগুলোকে যদি সম্পর্কের বাইরে ফেলে দিতে হয়, তাহলে কোনও সম্পর্কই দীর্ঘদিন টিকবে না।

প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সম্পর্কটাকেও সময় দিতে হয়

আমরা অনেক সময় ভাবি, ভালোবাসা থাকলেই সম্পর্ক ঠিক থাকবে। আসলে তা নয়। ভালোবাসা থাকতে পারে, কিন্তু সময় না দিলে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। ভালোবাসা থাকতে পারে, কিন্তু কথা না বললে ভুল বোঝাবুঝি জমতে পারে। ভালোবাসা থাকতে পারে, কিন্তু একে অপরের জীবনের প্রতি আগ্রহ না থাকলে সম্পর্কটা একসময় নিছক অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।

তাই দীর্ঘ সম্পর্কের জন্য শুধু ‘ভালোবাসি’ বলাই যথেষ্ট নয়। ভালোবাসার যত্নও নিতে হয়।

সময় প্রেমকে মারে না, প্রেমকে বদলে দেয়

প্রেমের ক্ষেত্রে আমরা সময়কে অনেক সময় শত্রু মনে করি। ভাবি, সময় যত যাবে, সম্পর্ক তত একঘেয়ে হবে। কিন্তু সময় নিজে কোনো সম্পর্ক নষ্ট করে না। সময় শুধু সম্পর্কের চরিত্র বদলে দেয়।

শুরুর প্রেমে থাকে উত্তেজনা। পরে আসে পরিচিতি। তারপর বন্ধুত্ব। তারপর তৈরি হয় গভীর আস্থা। একসময় সঙ্গী শুধু প্রেমের মানুষ থাকেন না—তিনি হয়ে ওঠেন এমন একজন, যার কাছে নিজের দুর্বলতাগুলোও নিরাপদ মনে হয়।

এই জায়গাটা প্রথম প্রেমের উত্তেজনার চেয়ে অনেক শান্ত। কিন্তু অনেক বেশি গভীর।

তাহলে প্রেম কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয়?

এর কোনও জাদুকরী সূত্র নেই। তবে কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—সঙ্গীকে সময় দেওয়া, মন দিয়ে শোনা, ছোট ছোট বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া, অন্যজনের স্বাধীনতাকে সম্মান করা এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকা।

আর সবচেয়ে বড় কথা, সম্পর্কের প্রথম দিকের উত্তেজনা কমে গেলেই ভয় না পাওয়া। কারণ ভালোবাসা সবসময় একই রকম থাকে না।

ভালোবাসা বদলায়। প্রথমে হয়তো আপনি মানুষটির প্রতি আকৃষ্ট হন। তারপর তাকে চিনতে শুরু করেন। এরপর তার ভালো-মন্দ দুটোই দেখতে পান। আর শেষ পর্যন্ত যদি সেই মানুষটির সঙ্গেই জীবন কাটাতে চান, তখন ভালোবাসা শুধু অনুভূতি থাকে না—তা হয়ে ওঠে একটি সচেতন সিদ্ধান্ত।

শেষ কথা

প্রেমের শুরুটা হয়তো ভাগ্যের ব্যাপার। কখন, কোথায়, কার সঙ্গে দেখা হবে—এসব আমরা ঠিক করতে পারি না। কিন্তু সেই মানুষটির সঙ্গে সম্পর্কটা কতটা গভীর হবে, সেখানে আমাদের ভূমিকা আছে।

কারণ দীর্ঘস্থায়ী প্রেম শুধু ‘সঠিক মানুষকে খুঁজে পাওয়া’র গল্প নয়। এটা দুজন মানুষের একসঙ্গে থেকে নিজেদের সম্পর্কটাকে বারবার নতুন করে তৈরি করার গল্প।

তাই কোনও একদিন যদি মনে হয়, আগের মতো আর বুক ধড়ফড় করছে না, সঙ্গে সঙ্গে ভাববেন না—ভালোবাসা শেষ। হয়তো প্রেমটা শুধু বদলে গেছে।

হয়তো উত্তেজনার জায়গা নিয়েছে শান্তি, অস্থিরতার জায়গা নিয়েছে আস্থা। আর ‘তোমাকে হারাব’ ভয়টার জায়গায় এসেছে—‘জীবনের যত পরিবর্তনই আসুক, তোমার পাশেই থাকতে চাই।’

সেটাই হয়তো দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর রূপ।

/এম/  
সম্পর্কিত
এক নারীকে স্ত্রী দাবি করে থানায় দুই ভাইয়ের মারামারি-তুলকালাম, ভিডিও ভাইরাল
সঙ্গীর গোপন ঋণ কিংবা টাকার নিয়ন্ত্রণ, সম্পর্কে ‘আর্থিক নির্যাতন’ বুঝবেন যেভাবে
আগের দিনের ‘সুখী-শান্ত গৃহবধূ’ আসলে কতটা সুখী ছিলেন?
সর্বশেষ খবর
ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় রদবদল: নেপথ্যে কী?
ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় রদবদল: নেপথ্যে কী?
ভাসানটেক-করাইল-সাততলার প্রায় এক হাজার মানুষ পেলেন বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা
ভাসানটেক-করাইল-সাততলার প্রায় এক হাজার মানুষ পেলেন বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা
খিলগাঁওয়ের রয়েল এইড হাসপাতালে আগুন
খিলগাঁওয়ের রয়েল এইড হাসপাতালে আগুন
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে ২৫ এজেন্সি, স্বচ্ছতা চায় এনসিপি
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে ২৫ এজেন্সি, স্বচ্ছতা চায় এনসিপি
সর্বাধিক পঠিত
মধ্যরাতে নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে নিয়ে যা লিখলেন প্রধানমন্ত্রী
মধ্যরাতে নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে নিয়ে যা লিখলেন প্রধানমন্ত্রী
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান কি ছুটিতে যাচ্ছেন?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান কি ছুটিতে যাচ্ছেন?
সুখবর পেলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুলিভান, শাস্তি পেলেন মেসি 
সুখবর পেলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুলিভান, শাস্তি পেলেন মেসি 
মাছ কেটে স্বাবলম্বী তারা 
মাছ কেটে স্বাবলম্বী তারা 
মন্ত্রিসভায় রদবদলের প্রজ্ঞাপন জারি: কে কোন মন্ত্রণালয়ে
মন্ত্রিসভায় রদবদলের প্রজ্ঞাপন জারি: কে কোন মন্ত্রণালয়ে