চুইঝালের চাষ বাড়ছে যশোরে

তৌহিদ জামান, যশোর
১১ নভেম্বর ২০২০, ১৭:০২আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২০, ১৭:৫৪

বছর দশেক আগে যশোর থেকে ভোজনবিলাসী মানুষ আহারের জন্যে দল বেধে যেতেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে। সেখানে আব্বাসের হোটেলে পাওয়া যায় চুইঝাল দিয়ে রান্না খাসির মাংস। কী তার স্বাদ!

চুইঝালের চাষ বাড়ছে যশোরে

খুলনা বিভাগের খুলনা ছাড়াও যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল জেলায় এখন বেশ জনপ্রিয় চুইঝাল। শুধু মাংসই নয়, এখন এ অঞ্চলের মানুষ মাছ, সবজি, ডালের সঙ্গেও চুইঝাল ব্যবহার করে।

চুইঝাল কী?

চুইঝাল মসলা জাতীয় উদ্ভিদ। দেখতে অনেকটা পান গাছের মতো। অন্য গাছকে পেঁচিয়ে এরা বাড়তে থাকে। প্রতি গিরাতে গজানো শেকড় অন্য গাছকে আঁকড়ে ধরে রাখে। তবে চুইঝালের গোড়ার অংশ অনেক মোটা হয়। এটা শুষ্ক ও ছায়া জায়গায় ভালো জন্মে। গাছটি বড় হতে শুরু করলে সেটি শিমুল, সজনে, সুপারি, তাল বা নারিকেল গাছে লতিয়ে দিলে চুইঝাল সেই বড় গাছকে আশ্রয় করে বড় হতে থাকে। পূর্ণাঙ্গ গাছ হতে ৭-৮ বছর সময় লাগে। গাছের কাণ্ড কেটে পানিতে ধুয়ে মাছ, মাংস, সবজি কিংবা নিরামিষ, ডালে চুইঝাল ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে কাণ্ডটিকে ২-৩ ইঞ্চি লম্বা করে কেটে তারপর আবার ছোট ছোট ফালি করে মাংস-তরকারিতে দেওয়া হয়। চুইঝাল (কাঠ অংশ) সকল প্রকার মাংস ও সবজি রান্নায় ব্যবহার করা হয়। এটি দিয়ে রান্না করলে বাড়তি মরিচ না দিলেও হয়। চুইঝালে রান্না মাংস ও সবজি খেতে যেমন সুস্বাদু হয়, তেমনি ঘ্রাণে ও পুষ্টিগুণেও এটি অনন্য।

যশোরের অনেক গ্রামেই চাষ হচ্ছে চুইঝাল

যশোরে চাষ শুরু হয় বছর চারেক আগে

বছর চার বছর আগের কথা। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা বোদখানা গ্রাম থেকে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আইয়ুব হোসেন বারবাকপুর গ্রামের আবু কালামের বাড়ির শিমুল গাছের গোড়ায় একটি চুইঝালের লতা (কাটিং) এনে পুঁতে গিয়েছিলেন। তার পরামর্শে গাছের গোড়া সবসময় শুষ্ক রেখে চুলার ছাই দেওয়া হতো। কয়েকদিন আগে শিমুল গাছটি বিক্রি করার কারণে চুইঝালের গাছটিও বিক্রি করতে হয়েছে। তবে চুইঝালের বাজার দর জানা না থাকায় ৮ হাজার টাকায় গাছটি বিক্রি করেন কালাম। পরে জানতে পারেন সেই চুইঝাল বিক্রি হয়েছে ৩০ হাজার টাকায়! বর্তমানে ঝিকরগাছা বারবাকপুর গ্রামের প্রায় সব বাড়িতে দু’চারটে করে চুইঝালের গাছ রয়েছে।

সরেজমিন কথা হয় এই গ্রামের (দেওয়ানগঞ্জ, শেখপাড়া) প্রবাসী শেখ আব্দুল হালিমের স্ত্রী নাজমা বেগমের সঙ্গে। প্রায় সাড়ে ৯ কাঠা জমির ওপর তার বাড়ি ও বাগান। সেখানে রয়েছে বিভিন্ন গাছ। তিনি বলেন, ‘প্রায় তিন বছর আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার আহ্বানে একটি প্রশিক্ষণে গিয়ে চুইঝালের চাষাবাদ প্রক্রিয়া শিখে আসি। প্রশিক্ষণ শেষে এক-দেড়শ লোককে একটি করে চুইঝালের চারা দেওয়া হয়। এরপর বাড়ি এসে গাছের গোড়ায় লাগিয়ে দিই।’

তিনি জানান, চুইঝালের চাষপদ্ধতি খুবই সহজ। বাড়তি কোনও যত্ন নেওয়া লাগে না। যে গাছটির নিচে লাগানো হয়, সেই গাছটির ছাল নরম হলে ভালো হয়। কেননা চুইঝালের কাণ্ড থেকে যে শিকড় বের হয়, তা ওই গাছকে আঁকড়ে রাখে। মাঝে মধ্যে গাছের গোড়ায় জৈবসার দিলে ভালো হয়। তবে খেয়াল রাখতে হয় যেন গাছের গোড়ায় পানি না জমে।

নাজমা বলেন, ‘মাসতিনেক আগে দুটো গাছ বিক্রি করি। ক্রেতা যখন সেটি ওজন করেন, তা আধামণের বেশি হয়। দাম না জানার কারণে বেশ লস হয়েছে। নিজে চারা তৈরি করে এবার ১০-১৫টি গাছ লাগিয়েছি।’

আশপাশের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে এখন কমপক্ষে তিন থেকে চারটি করে চুইঝালের গাছ রয়েছে।

তেমনই একজন শারমিন বেগম জানান, বছর দেড়েক আগে প্রথম একটি চুইঝালের গাছ রোপণ করা হয়। এখন বড় ছোট মিলিয়ে ১২টি গাছ রয়েছে।

বিক্রি বেড়েছে চুইঝালের

এভাবে ফয়সাল হোসেনের স্ত্রী রেখা খাতুনের বাড়িতে তিনটি, সফিকুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুম বেগমের বাড়িতে ৬টি গাছ রয়েছে।

তারা জানান, বিক্রির পাশাপাশি সারা বছর খেয়েছেন ইচ্ছে মতো। প্রতিটি রান্নায় তারা চুইঝাল ব্যবহার করেন।

এই গ্রামের বাসিন্দা ইউপি মেম্বার (গদখালি ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড) আনোয়ারুল ইসলাম রিফার বলেন, ‘আমাদের ওয়ার্ডে একটি প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৫শ’ পরিবারের কাছে চুইঝালের চারা বিতরণ করা হয়। আমি নিজেও দুটো চারা লাগিয়েছিলাম। সেগুলো অবশ্য বাঁচেনি। তবে অনেকেই এখন চাষ করছে, বিক্রি করে লাভও ভালো পেয়েছে।’

যশোর বড়বাজারের বিক্রেতারা বলছেন, গত ১০ বছর ধরে বড়বাজারে চুইঝাল বিক্রি করছেন সুভাষ দাস। তার পাশেই জয় হালদার বিক্রি করেন প্রায় ১৫ বছর ধরে। তারা জানান, বছর পাঁচ আগেও খুব বেশি বিক্রি হতো না চুইঝাল। এখন ক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে হোটেলগুলোতে চুইঝালের চাহিদা বেড়েছে।

দাম কেমন

যশোরে প্রতি কেজি (মোটা ও সরু হিসেবে) চুইঝাল বিক্রি হচ্ছে ৪০০, ৫০০ এবং ৮০০ টাকা করে।

যশোরের হোটেলগুলোতে চুইঝাল

সম্প্রতি যশোরের বিভিন্ন হোটেলে চুইঝালে মাংস বিক্রি হচ্ছে। পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ও স্বাদের কারণে ভোজনবিলাসীদের একপ্রকার দাবির মুখেই হোটেলগুলোতে এই ব্যবস্থা বলে জানালেন ক্যাফে প্রেসক্লাবের স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলাম।

তিনি জানান, হোটেলে আগে সাধারণ রান্না হতো। কিন্তু চুইঝালের মাংস পাওয়া যায় লেখা বিজ্ঞাপনের কারণে এখন বিক্রিও বেশ সন্তোষজনক।

মাংস দিয়ে চুইঝাল

কৃষি কর্মকর্তারা যা বলছেন

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (ঝিকরগাছা) মো. আইয়ুব হোসেন বলেন, ‘ঝিকরগাছা উপজেলার বোধখানা গ্রামের জাফর আলী নামে এক ভদ্রলোক স্বতন্ত্রভাবে চুইঝালের চাষ করতেন। একদিন তার কাছ থেকে চারা এনে বারবাকপুরের এক কৃষকের দিই। তিনি বছর দেড়েক পর সেই গাছ ৯ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। পরে জানা যায়, সেটি বাজারে বিক্রি হয়েছে ৩৫ হাজার টাকায়।’

তিনি জানান, এরপর ২০১৭ সালে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে বারবাকপুরে পাঁচশ পরিবারের কাছে চুইঝালের চারা বিতরণ করা হয়। কিছু গাছ মরে গেলেও অনেকের গাছ বড় হয়, তারা বিক্রি করে লাভবান হন। সে কারণে এখন আশপাশ থেকে চারা নিয়ে বহুমানুষ এই চুইঝালের চারা লাগাচ্ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর যশোরের সহকারী উপ-পরিচালক দিপঙ্কর দাস বলেন, ‘যশোরের ঝিকরগাছা, মণিরামপুর, সদর উপজেলার ইছালি ইউনিয়নে এবং কেশবপুরের কিছু জায়গায় বাড়িপর্যায়ে চুইঝালের চাষ হচ্ছে। জায়গা লাগে না, খরচ নেই- কিন্তু দুই বছর শেষে একটা ভালো আয়ের কারণে মানুষ বেশ উৎসাহ পাচ্ছে। কৃষিবিভাগও প্রচারণা, প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বর্তমানে ভোক্তা বাড়ছে, পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ, মেডিসিন ভ্যালু থাকায় চুইঝালের ভবিষ্যৎ খুবই ভালো।’

/এনএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম