ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছেন সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর। তার বাবা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সেনানী, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং স্বাধীন দেশে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকাণ্ডের শিকার চার নেতার একজন তিনি। সেদিন আওয়ামী লীগের চার জাতীয় নেতা—উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে বন্দি অবস্থায় কারাগারের ভেতরে হত্যা করে বিপথগামী সেনা সদস্যরা। কিশোরগঞ্জ-১ আসনের উপনির্বাচনে একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন সৈয়দা জাকিয়া নূর।
২ নভেম্বর (বুধবার) সকালে জাকিয়া নূরের গুলশানের বাসায় তার সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের কথা হয়। তিনি কথা বলেছেন সংসদ সদস্য হিসেবে তার ব্যস্ততা নিয়ে। আলাপে উঠে আসে তার জীবনবোধ আর সংগ্রামের কথা। বিয়ের পর সংসার সামলে কীভাবে নিজের লক্ষ্যে অটুট থেকেছেন, সেই গল্পও বলেছেন পাঠকদের।
প্রশ্ন: সংসদ সদস্য হিসেবে এলাকার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে পদচারণা আপনার। এর মাঝে অবসর সময় পেলে কীভাবে কাটান?
সৈয়দা জাকিয়া নূর: ব্যক্তিগত জীবনে আমি একজন চিকিৎসক। আমি সাইকিয়াস্ট্রিক। যখনই সময় পাই, আমাকে এই জিনিসটা নিয়ে কাজ করতে হয়। একজন রোগীকে যতটুকু সময় অন্য চিকিৎসকরা দেন, তার তুলনায় সাইকিয়াস্ট্রিকদের বেশি সময় দিতে হয়। যেহেতু আমি চিকিৎসক সেহেতু চেষ্টা করি আমার এলাকায় চিকিৎসা ক্ষেত্রে আরেকটু ভালো করা। সাধারণ মানুষের সেবা করা।
প্রশ্ন: অবসরে এছাড়া আর কী করেন?
সৈয়দা জাকিয়া নূর: যেটা আগে বলেছিলাম, আব্বা ছোটবেলা থেকে আমাদের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। বড় ভাইয়েরও বই পড়ার অভ্যাস ছিল। আমাদের সব ভাইবোনের মধ্যে এটা ছিল। আমার ভাই কিন্তু কখনও একটা বই পড়তেন না। তিন-চারটা বই একসঙ্গে পড়তেন। আমাদেরও ওই অভ্যাসটা আছে। যখনই সময় পাই অনেক বেশি পড়াশোনা করি। এখনও আমি চারটা বই একসঙ্গে পড়ছি, সময় বের করে। যেহেতু আমি চিকিৎসক, সবসময় আপটুডেট থাকতে হয়। নতুন কী আসছে। নতুনভাবে কী চিকিৎসা দেওয়া যায়। এভাবেই সময় কাটে আরকি।
প্রশ্ন: নিজ এলাকায় কি আলাদাভাবে চিকিৎসা দেন?
সৈয়দা জাকিয়া নূর: ঢাকায় একটু প্র্যাকটিস করি। এলাকার মানুষ যেহেতু জানে আমি চিকিৎসক, ওটা তো থাকবেই।
প্রশ্ন: এখন তো আপনার গ্রাম ও শহর মিলিয়ে জীবনযাত্রা। গ্রামে গেলে কীভাবে সময় কাটান?
সৈয়দা জাকিয়া নূর: আমি কোনোদিন গ্রামে বেড়ে উঠিনি। গ্রামে খুব কম গিয়েছি। আমার জন্ম ময়মনসিংহ শহরে। তারপর তো আমরা ঢাকায় চলে আসি। এখানে পড়াশোনা করেছি। জিয়াউর রহমানের সময় সবকিছু অন্য রকম ছিল। তারপর যখন বড় ভাই এমপি হলেন, মন্ত্রী হলেন, তিনিও আমাদের ব্যাপারে প্রোটেক্টিভ ছিলেন। তিনিও চাইতেন—আমরা যেন কোনোভাবে নিরাপত্তাহীনতায় না ভুগি। যখন থেকে আমি নমিনেশন পেলাম, এমপি হলাম, তখন তো গ্রামেই আমার সময় বেশি কাটে। আমি ২০ বছর লন্ডনে কাটিয়েছি। আমার জন্য ঢাকা শহর যা, কিশোরগঞ্জও একই। আমার পরিবারের মানুষ আমার সঙ্গে নেই। এলাকার মানুষই এখন আমার পরিবার। তাদের সঙ্গে আমার সময়টা বেশি কাটে।
প্রশ্ন: একজন নারী হিসেবে বেড়ে ওঠায় কোনও প্রতিবন্ধকতা ছিল কিনা। এখন কী ধরনের কাজ করছেন, আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।
সৈয়দা জাকিয়া নূর: নারী হিসেবে প্রতিবন্ধকতা তো ছিলই। আমি কিন্তু অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিলাম। মেডিক্যালে যখন সবেমাত্র ভর্তি হয়েছি, আম্মা আমাদের নিয়ে নিরাপদবোধ করতেন না। ৭৫-এর ১৫ আগস্ট বা ৩ নভেম্বরের ঘটনার পর স্বৈরাচার সরকার দেশ শাসন করছে। নিরাপদবোধ করার কোনও কারণও ছিল না। যখন তখন আমাদের ময়মনসিংহের বাড়িতে এসে আর্মিরা হামলা করেছে। আমি মাত্রই যখন ফার্স্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছি, আমার আম্মা আমাকে বিয়ে দিয়ে দিলেন। কিন্তু যা কিছু হয়েছে, সেটা পরিবার থেকে সহযোগিতা পেয়েছি। আমার মনে হয়, সব মেয়েদেরই এই সহযোগিতা পাওয়া উচিত। মেয়েদের পড়াশোনাটা চালিয়ে যাওয়া খুবই জরুরি। আমি যদি তখন মনে করতাম যে বিয়ে হয়ে গেছে, পড়াশোনা করার কী দরকার, তাহলে হয়তো এখন যে আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় আমার মধ্যে গড়ে উঠেছে, এটা নাও হতে পারতো। সমাজের জন্য এখন যেটা দিতে পারি, তখন হয়তো তা দিতে পারতাম না। সব মেয়ের উদ্দেশে বলছি, প্রতিবন্ধকতা থাকবেই, তবে প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে নিজেকে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। এটার জন্য পরিবার ও আশপাশের মানুষের সহযোগিতা খুবই দরকার।
প্রশ্ন: বইয়ের কথা বলছিলেন। কার বই, মানে কোন লেখকদের বই বেশি পড়া হয়?
সৈয়দা জাকিয়া নূর: এটা তো আসলে বয়সের ওপর নির্ভর করে। কোনও একসময় ছিল হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া চিন্তাই করতে পারতাম না। আমি অনেক বেশি জীবনীভিত্তিক বই পড়ি। যেমন ধরুন, ইন্দিরা গান্ধীর কথাই, ওনার জীবনটা কেমন ছিল। মাদার তেরেসা বা ইংল্যান্ডের যে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লৌহ মানবী। তিনি কীভাবে একটা সাধারণ জায়গা থেকে এভাবে উঠে এসেছেন। ইংল্যান্ডের মতো দেশে এত ক্ষমতাধর একটা জায়গায় এসেছেন। আর বাংলাদেশের তো আছেই। এখন আমার টেবিলে আছে ‘আমার দেখা নয়া চীন’, আরেকটা আছে ‘মুক্তিযুদ্ধের নদী’। বইয়ের পছন্দটা আসলে বয়সের সঙ্গে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন হয়।
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন









