প্রশ্ন
আমার ছেলের বয়স ১২। সে হঠাৎই পড়ালেখায় ভীষণ অমনোযোগী হয়ে গেছে। স্কুলে যায় নিয়মিত কিন্তু বাসায় পড়তে বসতে চায় না। তার স্ক্রিনটাইম তিনঘণ্টা। এখন সে তারচেয়ে বেশি থাকতে চায় ভিডিও গেমে। নানা কিছু চেষ্টা করেছি। ছবি আঁকার ক্লাসে দিয়েছি, গান পছন্দ করে বলে গানের ক্লাসে দিয়েছি। কিন্তু কোনটাতেই তার মনোযোগ নাই। এখন কীভাবে তাকে পড়ালেখায় মনোযোগী করবো?
উত্তর
১২ বছর বয়সটা বাচ্চাদের জন্য এবং অভিভাবকদের জন্য, উভয়ের জন্যই খুব চ্যালেঞ্জিং একটা সময়। এই বয়সে হরমোনের পরিবর্তন এবং মানসিক বিকাশের কারণে আচরণের এমন পরিবর্তন প্রায়ই দেখা যায়। ছবি আঁকা বা গানের ক্লাসে তার অনাগ্রহ এবং ভিডিও গেমের প্রতি তীব্র আকর্ষণ নির্দেশ করছে যে সে ‘ডোপামিন’ বা তাৎক্ষণিক আনন্দের খোঁজে আছে। পড়াশোনা বা ক্লাসিক্যাল কোনও শখ তাকে সেই ‘কুইক রিওয়ার্ড’ বা তাৎক্ষণিক আনন্দ দিচ্ছে না, যা ভিডিও গেম দিচ্ছে।
তাকে বকাঝকা না করে বা জোর না করে, নিচের মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক পদক্ষেপগুলো ধাপে ধাপে প্রয়োগ করে দেখতে পারেন-
সম্পর্ক পুনঃস্থাপন: পড়াশোনা নিয়ে চাপ দেওয়ার আগে তার সাথে সম্পর্কটা সহজ করুন।
গল্প করুন: দিনের একটা সময় তার সাথে এমন গল্প করুন যেখানে পড়াশোনা বা স্ক্রিন টাইমের কোনও কথা থাকবে না। তার ভিডিও গেমে সে কী করছে, কোন লেভেলে আছে—সেগুলো আগ্রহ নিয়ে শুনুন। এতে সে ভাববে আপনি তার জগতটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সমস্যাটা শুনুন: তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করুন, ‘পড়তে বসলে তোমার ঠিক কী সমস্যা হয়? বোর লাগে? নাকি কঠিন লাগে?’ তার উত্তরটা ধৈর্য নিয়ে শুনুন।
স্ক্রিন টাইম ম্যানেজমেন্ট (কড়াকড়ি নয়, নিয়ম): হুট করে মোবাইল কেড়ে নিলে সে বিদ্রোহী হয়ে উঠবে। তাই স্মার্ট নিয়ম চালু করুন।
নো-স্ক্রিন জোন: পড়ার টেবিল এবং বেডরুমে ঘুমের সময় ফোন বা গ্যাজেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখুন।
পাসওয়ার্ড সিস্টেম: ওয়াইফাই বা ডিভাইসের কন্ট্রোল আপনার কাছে রাখুন। প্রতিদিনের পড়ার টার্গেট পূরণ হলে তবেই সে পাসওয়ার্ড পাবে।
পড়াশোনার পদ্ধতি বদলান: টানা এক-দুই ঘণ্টা পড়তে বসতে বলবেন না। ১২ বছরের চঞ্চল মনের জন্য এটা কঠিন।
পোমোডোরো পদ্ধতি: তাকে বলুন, ‘মাত্র ২৫ মিনিট পড়ো, এরপর ৫ মিনিটের ব্রেক।’ এই ২৫ মিনিট গভীর মনোযোগ দিতে হবে। ব্রেকের পর আবার ২৫ মিনিট। এভাবে ছোট টার্গেট দিলে পড়ার ভীতি কমবে।
পরিবেশ: পড়ার টেবিলটা কি অগোছালো? টেবিলটা পরিষ্কার করুন। পড়ার সময় আশপাশে টিভি বা আড্ডার আওয়াজ যেন না থাকে।
শখের বিষয়ে তার মতামত নিন: আপনি তাকে ছবি আঁকা বা গানে দিয়েছেন, কিন্তু এটা হয়তো তার পছন্দ নয়। ভিডিও গেম আসক্ত বাচ্চারা সাধারণত চ্যালেঞ্জ এবং লজিক পছন্দ করে।
বিকল্প প্রস্তাব: তাকে কোডিং, রোবোটিক্স, দাবা বা গিটার শেখার প্রস্তাব দিতে পারেন। অথবা কোনও আউটডোর স্পোর্টস (ফুটবল/ক্রিকেট/সাঁতার)। শারীরিক পরিশ্রম করলে তার ঘুমের সাইকেল ঠিক হবে এবং গেমের নেশা কমবে।
ঘুমের দিকে নজর দিন: ১২ বছরের বাচ্চার অন্তত ৯-১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। রাত জাগলে মস্তিষ্কের ফোকাস করার ক্ষমতা কমে যায় এবং মেজাজ খিটখিটে হয়। ঘুমের সময়টা ফিক্সড করে দিন।
প্রশ্ন
আমার মেয়ের বয়স ২৪। আমার স্বামীর সাথে একবছর হলো বিচ্ছেদ হয়েছে। সম্প্রতি মেয়ের বাবা আবারও বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়ার পরে আমার মেয়ে আমার সাথে কথা বন্ধ করে দিয়েছে। সে বিশ্ববিদ্যালয়েও ঠিকমতো যায় না। আমি বেশ কয়েকবার তার সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। কীভাবে আমি তাকে স্বাভাবিক হতে সাহায্য করতে পারি?
উত্তর
আপনার মেয়ের বয়স ২৪, অর্থাৎ সে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। কিন্তু বাবার পুনরায় বিয়ের খবরে তার এই প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করছে যে, সে মানসিকভাবে এখনও বিচ্ছেদের ট্রমা বা আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সে আপনার সাথে কথা বলছে না, এর মানে এই নয় যে সে আপনাকে ঘৃণা করে। বরং সে তার রাগ, অভিমান এবং অসহায়ত্ব প্রকাশ করার জন্য আপনাকেই সবচেয়ে ‘নিরাপদ’ মানুষ মনে করছে। সে জানে আপনি তাকে ছেড়ে যাবেন না, তাই নিজের সবটুকু ক্ষোভ আপনার ওপরই ঝাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে তাকে জোর করে কথা বলালে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাকে স্বাভাবিক করতে নিচের কৌশলগুলো ধাপে ধাপে প্রয়োগ করতে পারেন-
কিছুটা স্পেস বা জায়গা দিন: আপনি যতবার তার কাছে গিয়ে কথা বলতে চাইবেন বা ‘কী হয়েছে’ জানতে চাইবেন, সে ততবার নিজেকে গুটিয়ে নেবে। কয়েকটা দিন তাকে তার মতো থাকতে দিন। তাকে বোঝান যে আপনি তার নীরবতাকে সম্মান করছেন। স্বাভাবিক সাংসারিক কাজগুলো (যেমন: খাবার টেবিলে ডাকা, তার পছন্দের কিছু রান্না করা) চালিয়ে যান, কিন্তু কোনও গভীর আলোচনার চেষ্টা করবেন না।
চিঠি বা টেক্সট মেসেজের সাহায্য নিন: সামনাসামনি কথা বললে তর্ক হতে পারে বা সে উঠে চলে যেতে পারে। তাই তাকে একটি চিঠি লিখুন বা হোয়াটসঅ্যাপে বড় একটি মেসেজ দিন। সেখানে কোনও অভিযোগ করবেন না, উপদেশ দেবেন না। শুধু আপনার ফিলিংসটা জানান।
চিঠিতে যা লিখতে পারেন (নমুনা)
‘মা, আমি জানি তুমি খুব কঠিন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছ। তোমার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। আমি তোমাকে ডিস্টার্ব করতে চাই না বা জোর করে কথা বলতে চাই না। শুধু জেনে রেখো, আমি সবসময় তোমার পাশে আছি। তোমার যখন ইচ্ছে হবে, তখন কথা বলো। আমি অপেক্ষা করব। তোমার ক্লাসে যাওয়া বা না যাওয়া নিয়ে আমি এখন কিছু বলব না, কিন্তু তোমার ক্যারিয়ারের ক্ষতি হলে আমার খুব কষ্ট লাগবে। নিজের যত্ন নিও।’
বাবার প্রসঙ্গ বা বিচ্ছেদের বিষয় এড়িয়ে চলুন: এই মুহূর্তে তার বাবার বিয়ের প্রসঙ্গ বা আপনার ডিভোর্স কেন হয়েছিল—এসব নিয়ে কোনও আলোচনা করবেন না। সে যদি বাবাকে দোষারোপ করে বা আপনাকেই দোষ দেয়, তবে তর্কে যাবেন না। শুধু শুনুন। তাকে বলতে দিন। তার এখন প্রয়োজন এমন একজন মানুষ, যে শুধুই তার কথা শুনবে, বিচার করবে না।
তৃতীয় পক্ষের সহায়তা: যেহেতু সে আপনার সাথে কথা বলছে না, তাই এমন কাউকে খুঁজুন যার সাথে তার সম্পর্ক ভালো এবং যাকে সে শ্রদ্ধা করে। অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাদের বলুন মেয়েটির সাথে একটু কথা বলতে বা বাইরে কফিতে নিয়ে যেতে। তারা যেন আপনার হয়ে ওকালতি না করে, বরং তার মনের কথাটা বের করে আনার চেষ্টা করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে কৌশল: সে ক্লাসে যাচ্ছে না—এটি উদ্বেগের বিষয়। তবে এখন জোর করলে সে আরও বিদ্রোহী হবে। তার কোনও ঘনিষ্ঠ সহপাঠীর সাথে যোগাযোগ করে নোটস বা অ্যাসাইনমেন্টের খোঁজ রাখতে পারেন (মেয়েকে না জানিয়ে)। তাকে বলতে পারেন, ‘তোমার যদি এখন ক্লাস করতে ইচ্ছে না করে, কয়েকটা দিন ব্রেক নাও। কিন্তু একেবারে ছেড়ে দিও না।’
প্রফেশনাল কাউন্সিলিং: তার আচরণ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় (খাওয়া বন্ধ করা, সারাদিন ঘরে অন্ধকার করে রাখা, নিজেকে আঘাত করা), তবে বুঝতে হবে সে ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে একজন সাইকোলজিস্ট বা থেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়া জরুরি হতে পারে। শুরুতে সে যেতে না চাইলে, আপনি একা গিয়েও পরামর্শ নিতে পারেন কীভাবে তাকে হ্যান্ডেল করবেন।









