যাপিত জীবন

এক দ্বীপে এক পরিবার!

রশিদ আল রুহানী
১৪ এপ্রিল ২০১৬, ১৮:৩০আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০১৬, ১৮:৩০

হোটেল মৌসুমি এর সাইনবোর্ড

 

সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে আরও একটি দ্বীপ রয়েছে। দেশ-বিদেশের ভ্রমণপ্রেমী থেকে শুরু করে টেকনাফের সেন্টমার্টিনের স্থানীয়রা এই দ্বীপটির সঙ্গে খুব ভালোভাবেই পরিচিত। দ্বীপটির নাম ছেঁড়া দ্বীপ। ৩ কিলোমিটার আয়তনের একটি দ্বীপে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছে একটি মাত্র পরিবার। এক নামে চেনে সবাই এই পরিবারের নাম। পরিবারটির নাম, হোসেন আলীর পরিবার। প্রখর রোদ, ঝড়, বৃষ্টি উপেক্ষা করেও বসবাস করে পরিবারটি নির্জন এই ছেঁড়া দ্বীপে।

জানা গেছে, ২০০০ সালের শেষের দিকে এই দ্বীপটির সন্ধান পাওয়া যায়। ঠিক তার পর থেকেই এই দ্বীপে বসবাস করে আসছে পরিবারটি। সেন্টমার্টিনের লোকালয় ছেড়ে নির্জন এই দ্বীপে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে হোসেন আলীর ৭ সদস্যের এই পরিবারটি। দীর্ঘ ১৬ বছরে এই পরিবারের সদস্য সংখ্যা কখনও কমেছে কখনও বা বেড়েছে।

দ্বীপ ভ্রমনে গিয়ে হোসেন আলীর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হোসেন আলীর চার ছেলে ও দুই মেয়ে। হোসেন আলী মারা গিয়েছে ২০১৩ সালে। হোসেন আলী তার পরিবারকে নিয়ে এই দ্বীপেই বসবাস করতে শুরু করেন ২০০০ সাল থেকেই। তিনি মারা যাবার পরও তার স্ত্রী চার ছেলেকে ও দুই মেয়েকে নিয়ে এই দ্বীপেই থাকেন। পরে মেজো ছেলে গিয়াস বিয়ের পর স্ত্রীসহ সেন্টমার্টিন থাকেন। অন্য দিকে বড় মেয়ে মৌসুমিকে বিয়ে দিয়েছে সেন্টমার্টিনেই। বর্তমানে বড় ছেলে সাদ্দাম, সজো ছেলে রিয়াজ, ছোট ছেলে জানে আলাম, বড় ছেলের বউ, এক মেয়ে কহিনুর এবং এক নাতী নিয়ে এই বাড়িতেই থাকেন।

হোসেন আলীর স্ত্রী ও নাতী

৭ সদস্যের এই পরিবারটির জন্য রয়েছে একটি মাত্র ঘর। ঘরটি আয়তনও খুব কম, বড়জোর ৩ গজ থেকে সাড়ে ৩ গজ লম্বা এবং ২ থেকে আড়াই গজ প্রস্থ। কেয়াগাছের পাতা দিয়ে ঘরটি ছাওয়া হয়েছে। চারদিকে চটের বস্তা দিয়ে ঘেরা। ঘরটির চার কোনায় চারটি বাঁশ দিয়ে শক্ত করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। একটি মাত্র ঘরেই থাকেন এরা সবাই। রাতে ঘুমানোর আগে ঘরটির মাঝ বরাবর একটি কাপড়ের পর্দা দিয়ে ভাগ করে এক পাশে ঘুমায় বড় ছেলে ও তার বউ। অন্য পাশে হোসেন আলীর অন্য দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ঘুমান তার স্ত্রী।

সেজো ছেলে রিয়াজ ও তার বড় ভাই সাদ্দামের এখানে একটি দোকান আছে। দোকানে বসে থাকতে দেখা গেলো রিয়াজকে। কথা হয় তার সঙ্গে। দোকানটিতে খুবই প্রাথমিক জিনিসপত্র পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় নারকেল, ডাব এবং পানি। এছাড়া সাবান, সিগারেট, ম্যাচ, চানাচুর-বিস্কুট ইত্যাদি।

দোকানটির আরও একটি বিশেষত্ব রয়েছে। এই দোকানকে শুধু দোকান বললে ভুল হবে। মুলত এটি একটি হোটেল। এর নাম হোটেল মৌসুমি। হোসেন আলী জীবিত থাকা অবস্থায় পর্যটকদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে গিয়ে তার মেয়ের নামে এই হোটেলটি চালু করেছিলেন। হোসেন আলী নেই অথচ তার বড় ছেলে এই হোটেলকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। হোটেলটির বিজ্ঞাপন হিসেবে একট ছোট সাইনবোর্ডও রয়েছে দোকানের সামনে। সেখানে লেখা আছে হোটেল মৌসুমি।

পরিবারটির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই হোটেলে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবারের ব্যবস্থা করতে পারেনা তারা। তবে সাগরের বিভিন্ন মাছের তরকারি, ভাত, ডাল রাখেন হোটেলটিতে।

হোটেল মৌসুমিতে হোসেন আলীর দুই ছেলে

এই নির্জন দ্বীপে বসবাস করতে কোনও সমস্যা হয় কিনা হোসেন আলীর স্ত্রী কাছে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, আছি তো অনেক দিনই। সমস্যা হলেও এখন কিছু মনে হয় না। তবে সমস্যা হয় ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে। যখন ঝড়-বৃষ্টি হয় তখন আমাদেরকে চলে যেতে হয় ছেঁড়া দ্বীপ ছেড়ে। এছাড়া এর আগে বড় ধরনের ঘুর্ণিঝড়, সিডর, নার্গিস যখন হয়েছে তখন আমাদের ঘর উড়ে সাগরে চলে গিয়েছিল। পরে আবার ঘর তৈরি করেছি। এছাড়া এখানে তো আমাদের খাবারের সমস্যা হয়। অনেক সময় পানির অভাবে বাধ্য হয়ে সাগরের লোনা পানি খেতে হয়।

খাবার কিভাবে সংগ্রহ করেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের খাবার সেন্টমার্টিন থেকে আনতে হয়। কিন্তু খুবই কষ্ট হয়। কারণ এখান থেকে সেন্টমার্টির প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে, তাও ট্রলার অথবা নৌকায় চড়ে সাগর পাড়ি দিয়ে সেন্টমার্টিনে যেতে হয়। সবসময় যাওয়া-আসা করাও কঠিন।

মৃত হোসেন আলীর একটি মাত্র ঘর

ছেড়াদ্বীপটি সেন্টমার্টিন ইউয়নিয়নের মধ্যে পড়ে। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গরিব এই পরিবারটিকে কোনও ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করে না বলে জানান হোসেন আলীর স্ত্রী।

হোসেন আলীর সেজো ছেলে রিয়াজ পড়াশোনা করেছে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। অন্যদিকে বড় ও মেজো ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। বর্তমানে ছোট ছেলে পড়ে চতুর্থ শ্রেণিতে। কিন্তু ৫ কিলোমিটার দুরে সেন্টমার্টিনের স্কুলে গিয়ে পড়তে হয় বলে নিয়মিত স্কুলে যাওয়াও হয়না তার।

/এফএএন/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম