একসময় ভ্যানিটি বা সাজের টেবিল ছিল শুধু সৌন্দর্যচর্চার আসবাব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা এমনকি রাজনীতির গল্পও। প্রায় তিন শতাব্দী আগে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে মাদাম দ্য পম্পাদুরের সাজের টেবিল ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও রাষ্ট্রদূতদের ভিড় তারই প্রমাণ।
সময়টা ১৭৪৮ সাল। ভয়াবহ এক মহাদেশীয় যুদ্ধের পর ইউরোপ তখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্রাজ্যের ভাগ-বাঁটোয়ারা, সীমান্ত পুনর্নির্ধারণ সব মিলিয়ে অস্থির সময়। সেই ডিসেম্বরের এক দিনে ভার্সাই প্রাসাদের ভেতরে দেখা গেল দীর্ঘ এক সারি মানুষের অপেক্ষা।
সেই ভিড় ছিল না রাজার কক্ষের সামনে, এমনকি তার মন্ত্রীদের কক্ষের সামনেও নয়। সভাসদ, রাষ্ট্রদূত, অর্থলগ্নিকারী ও অভিজাতরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিলেন এমন এক নারীর কক্ষের সামনে, যার কোনও আনুষ্ঠানিক সরকারি পদ ছিল না। কারও হাতে ছিল আবেদনপত্র, কেউ আবার আগে থেকেই নিজের বক্তব্য বা যুক্তি সাজিয়ে নিচ্ছিলেন।
সবুজ রেশম ও ড্যামাস্ক কাপড়ে সাজানো সেই কক্ষে বসে ছিলেন মাদাম দ্য পম্পাদুর। রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের ঘনিষ্ঠ এই নারী তখন রাজদরবারে ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। তিনি বসেছিলেন তার তোয়ালেত—অর্থাৎ সাজের টেবিলে। পরিচারিকারা তার মুখে পাউডার ও রুজ লাগাচ্ছিলেন, পাশাপাশি যত্ন নিচ্ছিলেন তার চুলের।
১৭৪৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর ফ্রান্সের সাবেক এক রাষ্ট্রসচিব ডায়েরিতে লিখেছিলেন, তার প্রস্তুতি শুরু হওয়ার অপেক্ষায় একবার ভিড় সিঁড়ির একেবারে নিচ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। মাদাম দ্য পম্পাদুর-বিষয়ক গবেষক ও নিউ হ্যাম্পশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক সুসান ওয়াগারের সংগৃহীত তথ্যেও এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।
ওই অভিজাত ব্যক্তি আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, “এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি বিষয়ই তার হাত হয়ে এগিয়ে যায়।” এমনকি রাষ্ট্রদূতদেরও আগের মতো পরিষদের কক্ষে গ্রহণ না করে সরাসরি তার সাজের টেবিলের সামনে নিয়ে যাওয়া হতো।
অর্থাৎ, এক নারীর ব্যক্তিগত সাজের জায়গাটিই তখন হয়ে উঠেছিল রাজনীতি, ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের এক গুরুত্বপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্র।
এর ২৭৮ বছর পর দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন জায়গায় শোবার ঘর থেকে প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পর ড্রেসিং টেবিল বা ভ্যানিটি আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
তবে এবার এর জন্য রাজার কোনও উপপত্নী আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বরং মাত্র পাঁচ-ছয় বছর বয়সী শিশুরাও ভ্যানিটি চাইছে।
এরই একটি উদাহরণ নিউ জার্সির ছোট্ট জোহানা মোয়া। পাঁচ বছর বয়স থেকেই সে বাবা-মায়ের কাছে বারবার একটি ভ্যানিটি চাওয়া শুরু করে। নিজের হাতখরচের টাকা জমিয়ে সে সেই ভ্যানিটি কেনার প্রস্তুতি নেয়। খেলনা গুছিয়ে রাখা, গাছে পানি দেওয়া কিংবা একটি বই পড়ে শেষ করার বিনিময়ে পাওয়া টাকা জমাত সে।
শেষ পর্যন্ত ষষ্ঠ জন্মদিনের আগেই তার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়। জোহানা পায় উজ্জ্বল গোলাপি রঙের একটি ভ্যানিটি, যার সঙ্গে ছিল আলাদা আলাদা জিনিস রাখার জায়গা এবং চারপাশে আলো লাগানো ডিম্বাকৃতির আয়না।
তবে ভ্যানিটিটি শুধু সাজগোজের জন্য নয়। সেখানে বসে জোহানা বাড়ির কাজ করে, ডায়েরি লেখে, চুল আঁচড়ায় এবং ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করে। সবচেয়ে বেশি উপভোগ করে ‘গেট রেডি উইথ মি’ ধরনের খেলা।
জোহানার ভাষায়, “আমার ভ্যানিটি বিশেষ, কারণ মাঝে মাঝে আমি আয়নায় তাকাই আর আয়নাটাও জ্বলে ওঠে। কখনও কখনও আয়নার দিকে তাকিয়ে এমন ভান করি, যেন ভিডিও ধারণ করছি।”
অবশ্য জোহানার ভ্যানিটির সঙ্গে ভার্সাই প্রাসাদের বিলাসবহুল ভ্যানিটির পার্থক্য আকাশ-পাতাল। একসময়কার অভিজাত ভ্যানিটি তৈরি হতো দামি কাঠ ও ব্রোঞ্জের কারুকাজে। জোহানারটি তৈরি হয়েছে কারখানায় তৈরি কাঠ দিয়ে, স্ক্রু ও ডাওয়েল দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে এবং কার্ডবোর্ডের বাক্সে করে পৌঁছেছে ওয়েফেয়ার থেকে। দাম ছিল ১২৯ দশমিক ৯৯ ডলার।
বর্তমানে ওয়ালমার্ট, আইকিয়া, টার্গেট, ওয়েস্ট এলম, আরবান আউটফিটার্সসহ বিভিন্ন বিক্রেতার কাছে একই ধরনের অসংখ্য ভ্যানিটি পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ একসময় রাজপ্রাসাদের বিলাসিতার প্রতীক থাকা এই আসবাব এখন সাধারণ পরিবারের ঘরেও জায়গা করে নিচ্ছে।
পিন্টারেস্টের তথ্যও ভ্যানিটির নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত এক বছরে ‘আধুনিক শোবার ঘরের ভ্যানিটি’ খোঁজার হার বেড়েছে ৭৪১ শতাংশ। ‘সর্বশেষ ড্রেসিং টেবিল’ খোঁজার হার বেড়েছে ৬৬২ শতাংশ এবং ‘শোবার ঘরের ভ্যানিটি টেবিল’ খোঁজার হার বেড়েছে ২৯৮ শতাংশ।
তবে এর পেছনে শুধু আসবাব কেনার আগ্রহই কাজ করছে না। জোহানার মতো অনেকের কাছে ভ্যানিটি হলো অনলাইনে দেখা ‘গেট রেডি উইথ মি’ সংস্কৃতিকে নিজের মতো করে উপভোগ করার একটি জায়গা।
আর সাজগোজ করে নিজেকে প্রস্তুত করার এই রীতি আসলে ভ্যানিটির চেয়েও অনেক পুরোনো।
ভ্যানিটির ইতিহাসের শুরু হয়েছিল টেবিল দিয়ে নয়, একটি বাক্স দিয়ে। প্রাচীন মিশরে নারীরা প্রসাধনী রাখার জন্য কাঠের বাক্স ব্যবহার করতেন।
পরে ফরাসিরা এই আসবাবের পাশাপাশি সাজগোজের পুরো প্রক্রিয়ারও একটি নাম দেয় তোয়ালেত। শব্দটির উৎপত্তি তোয়াল থেকে। নারীর ব্রাশ, চিরুনি ও প্রসাধনী সাজানোর আগে টেবিলের ওপর যে কাপড় বিছানো হতো, সেটিকেই বলা হতো তোয়াল।
সময়ের সঙ্গে তোয়ালেত শুধু একটি আসবাব নয়, নিজেকে সাজিয়ে তোলার পুরো প্রক্রিয়ার নাম হয়ে ওঠে।
মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টের ২০১৩ সালের ভ্যানিটি বিষয়ক প্রদর্শনীর কিউরেটর জেন অ্যাডলিনের ভাষায়, “এটি একটি বস্তু থেকে ধীরে ধীরে একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।”
১৮শ’ শতকে মাদাম দ্য পম্পাদুরের হাত ধরে সাজগোজের এই রীতি ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হলেও শিল্পবিপ্লবের পর ভ্যানিটি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসে। ১৯৫০-এর দশকে এটি আইকিয়ার ক্যাটালগেও নিয়মিত দেখা যেত।
কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে এসে পরিস্থিতি বদলে যায়। আইকিয়াসহ বিভিন্ন বিক্রেতার কাছ থেকে ভ্যানিটি প্রায় হারিয়ে যায়।
ডিজাইন ইতিহাসবিদ ড্যানিয়েলা ওহাদের মতে, “এটি যেন বিলুপ্তই হয়ে গিয়েছিল।” ছোট আকারের বাড়িতে বসবাসের প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা আসবাব রাখার ধারণাও কমতে থাকে। ফলে ভ্যানিটির প্রয়োজনীয়তাও কমে যায়।
তবে ভ্যানিটি হারিয়ে গেলেও সাজগোজ করে নিজেকে প্রস্তুত করার অভ্যাস হারায়নি। বরং ২০০৭ সালের পর প্রযুক্তি সেই ব্যক্তিগত রীতিকে আবার প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
ফ্লোরিডার ২০ বছর বয়সী শিল্পকলার শিক্ষার্থী মিশেল ফান একটি জেভিসি ক্যামকর্ডার দিয়ে নিজের মেকআপ করার ভিডিও ধারণ করে ইউটিউবে পোস্ট করতে শুরু করেন। তিনিই প্রথম সৌন্দর্যবিষয়ক ভিডিও নির্মাতা ছিলেন না। কিন্তু তার ভিডিও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং তিনি ইউটিউবের অন্যতম পরিচিত বিউটি গুরুতে পরিণত হন।
এরপর আরও অনেকে তার পথ অনুসরণ করেন। ইউটিউব হয়ে ওঠে নতুন ধরনের এক ব্যক্তিগত অথচ প্রকাশ্য মঞ্চ—যেখানে কিশোরী ও তরুণীরা অপরিচিত দর্শকদের সামনে নিজেদের সাজগোজ করে প্রস্তুত হওয়ার মুহূর্ত তুলে ধরতে শুরু করেন।
ফলে যে রীতি একসময় ছিল একান্ত ব্যক্তিগত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাত ধরে সেটিই হয়ে ওঠে দর্শনীয় এক অভিজ্ঞতা। আর সেই পরিবর্তনের হাত ধরেই হয়তো ভ্যানিটি আবার ফিরছে—এবার রাজদরবারে নয়, বরং আধুনিক শোবার ঘর, শিশুদের কক্ষ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংস্কৃতিতে।
সূত্র: দ্যা নিউইয়র্ক টাইম








