বিয়ে প্রেম করে হবে, নাকি পরিবারের পছন্দে—এ নিয়ে মতের শেষ নেই। প্রচলিত ধারণা হলো, নিজের পছন্দে করা বিয়েতে ভালোবাসা বেশি থাকে। আর পরিবার ঠিক করে দেওয়া বিয়েতে নাকি সম্পর্কের শুরুটাই হয় অনেকটা আনুষ্ঠানিকভাবে, সেখানে আবেগ ও ঘনিষ্ঠতা তুলনামূলক কম।
তবে নতুন এক গবেষণা এই ধারণাকে অনেকটাই চ্যালেঞ্জ করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারের পছন্দে হওয়া বিয়েতেও ভালোবাসা, ঘনিষ্ঠতা, আবেগ ও দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের মাত্রা অনেক ক্ষেত্রে প্রেমের বিয়ের কাছাকাছি।
আর্কাইভস অব সেক্সুয়াল বিহেভিয়ার-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ গবেষণার ফল তুলে ধরা হয়েছে। আফ্রিকা, আমাজনিয়া ও হিমালয় অঞ্চলের পাঁচটি সমাজের ৫৯৮ জন বিবাহিত মানুষের ওপর গবেষণাটি করা হয়।
ভালোবাসা মাপা হলো কীভাবে?
গবেষণায় ভালোবাসাকে শুধু আবেগ বা আকর্ষণ হিসেবে দেখা হয়নি। তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—ঘনিষ্ঠতা, আবেগ এবং অঙ্গীকার।
ঘনিষ্ঠতার মধ্যে ছিল পারস্পরিক বিশ্বাস, নিজের কথা খুলে বলা ও বন্ধুত্বের অনুভূতি। আবেগ বলতে বোঝানো হয়েছে আকর্ষণ ও তীব্র অনুভূতি। আর অঙ্গীকারের ক্ষেত্রে দেখা হয়েছে, দম্পতি সম্পর্কটি দীর্ঘদিন ধরে রাখার বিষয়ে কতটা দৃঢ়।
অর্থাৎ, শুধু ‘আমি তাকে ভালোবাসি’ বললেই ভালোবাসা মাপা হয়নি; সম্পর্কের ভেতরে দুজন মানুষ কতটা কাছাকাছি, কতটা আকৃষ্ট এবং একসঙ্গে থাকার ব্যাপারে কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
প্রেমের বিয়ের পক্ষেই কি সবাই?
গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নানা প্রশ্ন করা হয়। তাদের উত্তর বিশ্লেষণ করে ৪২টি আলাদা বিষয় বা শ্রেণি তৈরি করা হয়।
এর মধ্যে ২৩টি ক্ষেত্রে নিজের পছন্দে করা বিয়ের প্রতি কিছুটা বেশি ঝোঁক দেখা যায়। অন্যদিকে ১৯টি ক্ষেত্রে পরিবার-নির্ধারিত বিয়েকে বেশি পছন্দ করা হয়েছে।
অর্থাৎ প্রেমের বিয়ের দিকে সামান্য বেশি ঝোঁক থাকলেও ব্যবধানটা খুব বড় ছিল না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিয়ের ধরন আর ভালোবাসার মাত্রার সম্পর্ক সব সমাজে এক রকম পাওয়া যায়নি।
কোথাও প্রেমের বিয়ে এগিয়ে, কোথাও পারিবারিক বিয়ে
গবেষণায় অংশ নেওয়া পাঁচটি সমাজের ফলাফলও ছিল বেশ ভিন্ন।
নাইজেরিয়ার ইগবো এবং কেনিয়ার কিমেরু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিয়ে কীভাবে হয়েছে—তার ওপর ভালোবাসার মাত্রায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
অপরদিকে তিব্বতের ভোতিয়া ও বলিভিয়ার ত্সিমানে জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে নিজের পছন্দে বিয়ে করা দম্পতিদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তুলনামূলক বেশি ছিল।
আবার কেনিয়ার মেরু জনগোষ্ঠীতে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। সেখানে পরিবার-নির্ধারিত বিয়ের দম্পতিদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ও আবেগের মাত্রা বেশি ছিল।
অর্থাৎ ‘প্রেমের বিয়েতেই ভালোবাসা বেশি’—এমন কোনও সরল সূত্র গবেষণায় পাওয়া যায়নি।
বিয়ের বয়স বাড়লে ভালোবাসা কমে?
প্রেমের বিয়ে নিয়ে আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো—শুরুতে আবেগ বেশি থাকে, সময়ের সঙ্গে তা কমতে থাকে। আর পরিবার ঠিক করা বিয়েতে শুরুতে হয়তো আবেগ কম, কিন্তু সময়ের সঙ্গে ভালোবাসা বাড়ে।
গবেষণায়ও এই ধারণার সত্যতা খোঁজা হয়েছে।
কিন্তু পাঁচটি সমাজের চারটিতে দেখা গেছে, দম্পতি কত বছর ধরে বিবাহিত—তার সঙ্গে ভালোবাসার মাত্রার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক নেই।
শুধু ভোতিয়া জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ১০ বছরের বেশি সময় পর বিয়ের ধরন অনুযায়ী ভালোবাসার কিছু পার্থক্য দেখা যায়। সেখানেও নিজের পছন্দে বিয়ে করা দম্পতিরা সামান্য এগিয়ে ছিলেন।
তাহলে আসল পার্থক্যটা কোথায়?
গবেষকদের মতে, দুই ধরনের বিয়েতে ভালোবাসার অভিজ্ঞতা কিছুটা আলাদা হতে পারে। কিন্তু সেই পার্থক্য তুলনামূলকভাবে ছোট।
অর্থাৎ, বিয়ে প্রেম করে হয়েছে নাকি পরিবার ঠিক করেছে—শুধু এই তথ্য দিয়ে একটি দাম্পত্যে কতটা ভালোবাসা আছে, তা বোঝা যায় না।
পরিবারের পছন্দে বিয়ে হয়েছে বলেই সেখানে ভালোবাসা থাকবে না—এই ধারণারও শক্ত ভিত্তি নেই। গবেষণায় এমন বিয়েতেও ঘনিষ্ঠতা, আবেগ ও দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
ভালোবাসা তাহলে বিয়ের ধরনে নয়?
গবেষণার ফল অন্তত সেই দিকেই ইঙ্গিত করে।
নিজের পছন্দে বিয়ে করা দম্পতিরা শুরু থেকেই একে অপরকে পছন্দ করতে পারেন। আবার পরিবার ঠিক করে দেওয়া বিয়েতেও সময়ের সঙ্গে দুজনের মধ্যে বিশ্বাস, বন্ধুত্ব, আকর্ষণ ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হতে পারে।
ফলে দাম্পত্যে ভালোবাসা কতটা থাকবে, সেটি শুধু বিয়ের ধরন দিয়ে নির্ধারিত হয় না। সম্পর্কের ভেতরে দুজন মানুষ কীভাবে একে অপরের সঙ্গে থাকছেন, সেটিই সম্ভবত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ‘প্রেমের বিয়ে মানেই বেশি ভালোবাসা’ আর ‘পরিবারের পছন্দে বিয়ে মানেই কম ভালোবাসা’—এই দুই ধারণার কোনোটিকেই গবেষণাটি সমর্থন করছে না। বরং ফলাফল বলছে, ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হতে পারে দুই পথেই।









