একই জায়গায় পাশাপাশি বসে আছেন কয়েকজন। অথচ কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, একজনের হাত-পায়ে একের পর এক মশার কামড়ের দাগ, অন্যজনের তেমন কিছুই হয়নি। এমন অভিজ্ঞতা কমবেশি অনেকেরই আছে। প্রশ্ন হল, মশা কি সত্যিই কিছু মানুষকে অন্যদের তুলনায় বেশি পছন্দ করে?
এর পেছনে মানুষের শরীরের কিছু স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ভূমিকা রাখতে পারে। মশা মানুষকে খুঁজে পেতে শুধু চোখের ওপর নির্ভর করে না। নিঃশ্বাস থেকে বেরোনো কার্বন ডাই-অক্সাইড, শরীরের গন্ধ, তাপমাত্রা এবং ত্বকের রাসায়নিক সংকেতের মতো বিভিন্ন বিষয় শনাক্ত করার ক্ষমতা রয়েছে তাদের।
বিশেষ করে ডেঙ্গু ছড়ায় যে এডিস মশা, তারা মানুষের শরীরের নির্দিষ্ট সংকেত অনুসরণ করে রক্তের উৎস খুঁজে নেয়। ফলে একই পরিবেশে থেকেও কারও শরীর মশার কাছে তুলনামূলক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরোনো কার্বন ডাই-অক্সাইড
মশা মানুষের নিঃশ্বাস থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড শনাক্ত করতে পারে। দূর থেকেই এই সংকেত তাদের মানুষের উপস্থিতির দিকে টেনে আনতে পারে। তাই দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো বা ব্যায়ামের মতো শারীরিক পরিশ্রমের পর যখন শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বেড়ে যায়, তখন মশার কাছে মানুষকে খুঁজে পাওয়া সহজ হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্যায়াম করলেই ডেঙ্গির মশা নিশ্চিতভাবে বেশি কামড়াবে। মশা মানুষকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে একাধিক সংকেত একসঙ্গে ব্যবহার করে।
শরীরের ঘামেও রয়েছে মশার আকর্ষণের কারণ
ঘাম শুধু শরীর ঠান্ডা রাখে না, এর সঙ্গে ত্বক থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানও বের হয়। ল্যাকটিক অ্যাসিডসহ কিছু রাসায়নিক গন্ধ মশার আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। শারীরিক পরিশ্রমের পর ঘাম বেশি হলে শরীরের গন্ধেও পরিবর্তন আসে। সেই গন্ধ মশাকে মানুষের কাছাকাছি আসতে সাহায্য করতে পারে।
তবে ঘামের পরিমাণই একমাত্র বিষয় নয়। প্রত্যেক মানুষের ত্বক ও শরীরের রাসায়নিক গঠন আলাদা হওয়ায় মশার আকর্ষণও ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে।
ত্বকের অণুজীবও কি দায়ী?
আমাদের ত্বকে বিপুল সংখ্যক অণুজীব বাস করে। এই অণুজীবগুলো ত্বকের ঘাম ও অন্যান্য নিঃসরণের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে বিভিন্ন ধরনের গন্ধ তৈরি করতে পারে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ত্বকের মাইক্রোবায়োমের পার্থক্য মানুষের শরীরের গন্ধে প্রভাব ফেলতে পারে এবং এর ফলে মশার আকর্ষণেও পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ, আপনার ত্বকে থাকা অণুজীবের ধরনও অজান্তেই মশাকে আপনার দিকে টেনে আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
শরীরের উষ্ণতাও নজরে রাখে মশা
মশা মানুষের শরীরের তাপ শনাক্ত করতে পারে। তাই শরীরের কাছাকাছি উষ্ণতার পরিবর্তন তাদের মানুষের অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে। শারীরিক পরিশ্রমের পর শরীর গরম হয়ে গেলে বা শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে মশার কাছে সেই উষ্ণতা একটি অতিরিক্ত সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে।
গর্ভাবস্থার সময় শরীরের কিছু শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের কারণে মশার আকর্ষণ বাড়তে পারে বলেও গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে জ্বর হলে মশা বেশি কামড়াবেই এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়।
রক্তের গ্রুপেরও কি ভূমিকা রয়েছে?
মশা রক্ত খায়, তাই রক্তের গ্রুপ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু এডিস মশার ক্ষেত্রে ‘ও’ রক্তের গ্রুপের মানুষের প্রতি তুলনামূলক বেশি আকর্ষণ দেখা যেতে পারে। তবে রক্তের গ্রুপ একাই মশার কামড়ের সিদ্ধান্ত নেয় না।
একজন মানুষকে মশা কতটা আকর্ষণীয় মনে করবে, তা নির্ভর করে শরীরের গন্ধ, নিঃশ্বাস, তাপমাত্রা, ত্বকের রাসায়নিক সংকেত এবং পরিবেশসহ একাধিক বিষয়ের ওপর।
অ্যালকোহল খেলে মশার আকর্ষণ বাড়ে?
কিছু গবেষণায় অ্যালকোহল গ্রহণের পর মশার আকর্ষণ বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অ্যালকোহল শরীরে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটাতে পারে এবং ত্বকের তাপমাত্রা ও গন্ধেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে মশার কাছে মানুষের শরীরের সংকেত কিছুটা বদলে যেতে পারে।
তবে এটিকে মশার কামড়ের নিশ্চিত কারণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। একইভাবে শুধু অ্যালকোহল পান করলেই ডেঙ্গির মশা বেশি কামড়াবে এমন দাবিও করা ঠিক হবে না।
মশা থেকে বাঁচতে কী করবেন?
আপনার শরীর মশার কাছে যতই আকর্ষণীয় হোক, ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মশার সংস্পর্শ এড়ানো। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা, দিনের বেলাতেও প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা, শরীর যতটা সম্ভব ঢাকা পোশাক পরা এবং ঘরে মশা ঢোকার সুযোগ কমানো জরুরি।
কারণ মশা কাকে বেশি পছন্দ করে, তা নিয়ে কৌতূহল থাকতেই পারে। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে আসল বিষয় হলো, মশা আপনাকে বেশি পছন্দ করে কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মশাকে আপনার কাছেই আসতে না দেওয়া।









