“চোখ, চিকো—কখনো মিথ্যা বলে না।” স্কারফেস ছবির টনি মন্টানার এই সংলাপটি বলিউডের চোখের সাজের গল্পের সঙ্গেও বেশ মানিয়ে যায়। কারণ হিন্দি সিনেমায় মেকআপ শুধু সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়, চরিত্রের পরিচয় তুলে ধরারও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
আজকের ‘ক্লিন গার্ল’ সাজ, পেছনে আঁচড়ানো চুল, হালকা মেকআপ ও প্রায় মেকআপহীন চোখ যেমন ভদ্র, পরিপাটি ও সংস্কৃতিমনা নারীর ইঙ্গিত দেয়, তেমনি তার বিপরীত চরিত্র বোঝাতে বলিউডের ভরসা স্মোকি আই। সঙ্গে এলোমেলো চুল, ছোট পোশাক, চামড়ার জ্যাকেট কিংবা নাইটক্লাব আর তৈরি হয়ে যায় ‘ব্যাড গার্ল’-এর চেনা অবয়ব।
স্মোকি আইয়ের শুরু
স্মোকি আইয়ের শিকড় অনেক পুরোনো। প্রাচীন মিশর ও মেসোপটেমিয়ায় চোখ সাজাতে কাজল বা কোহল ব্যবহারের প্রচলন ছিল। পরে নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে চোখকে আরও গাঢ় করে সাজানো হতো, যাতে পর্দায় অভিব্যক্তি স্পষ্ট দেখা যায়। ১৯১৭ সালের ক্লিওপেট্রা ছবিতে থেডা বারার গাঢ় চোখের সাজ রহস্যময় ‘ভ্যাম্প’ চরিত্রের সঙ্গে এই লুকের সম্পর্ক আরও জোরালো করে।
নব্বইয়ের দশকে মেকআপশিল্পী লিন্ডা ক্যান্টেলোর তৈরি ছড়িয়ে দেওয়া, খানিকটা অসম্পূর্ণ চোখের সাজ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শুরুতে যা ‘গুচি লুক’ নামে পরিচিত ছিল, পরে সেটিই পরিচিতি পায় স্মোকি আই হিসেবে।
বলিউডের চোখের ভাষা
ভারতে অবশ্য নাটকীয় চোখের সাজ নতুন কিছু ছিল না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কাজল চোখের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। পুরোনো হিন্দি সিনেমায় ঘন কাজল, গাঢ় পাপড়ির গোড়া, মাসকারা ও কৃত্রিম পাপড়ি মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল বলিউডের চেনা চোখের সাজ।
এই চোখ কখনও নিষ্পাপত্ব, কখনও প্রেম, কষ্ট, আকুলতা কিংবা বিপদের সংকেত হয়ে উঠেছে।
ভ্যাম্প চরিত্রের ক্ষেত্রে সেই সংকেত আরও স্পষ্ট। হেলেন, বিন্দু, অরুণা ইরানি থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ের কোমলিকা তাদের ঝলমলে পোশাক, গাঢ় মেকআপ ও স্মোকি চোখ নায়িকার শালীন, পারিবারিক অবয়বের বিপরীতে দাঁড়াতেন।
‘ব্যাড গার্ল’ থেকে ‘কুল গার্ল’
নব্বই ও দুই হাজারের দশকে নায়িকা ও ভ্যাম্পের সীমারেখা বদলাতে শুরু করলেও স্মোকি আইয়ের পুরোনো সংকেত রয়ে যায়। রঙ্গীলা, মার্ডার, জিসম ২ ও দ্য ডার্টি পিকচার-এর মতো ছবিতে গাঢ় চোখ যুক্ত হয় যৌন আবেদন ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে।
পরে ককটেল-এর ভেরোনিকা কিংবা অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল-এর আলিজেহ দেখিয়ে দিল, স্মোকি আই পরা নারী সবসময় খলনায়িকা নন। তিনি হতে পারেন স্বাধীনচেতা, পার্টিপ্রিয়, আবেগপ্রবণ কিংবা নিজের নিয়মে চলা একজন নারী।
এমনকি হৃদয়ভাঙা নারীর ক্ষেত্রেও বলিউড ব্যবহার করেছে এই লুক। কিয়ারা আদভানির টক্সিক: এ ফেয়ারি টেল ফর গ্রোন-আপস ছবির চরিত্রের গাঢ়, ছড়ানো চোখের সাজে যেমন গ্ল্যামারের পাশাপাশি ভঙ্গুরতার ছাপও রয়েছে।
তাহলে স্মোকি আই কি ‘ব্যাড গার্ল’ মেকআপ?
আজ স্মোকি আই আত্মবিশ্বাস, গ্ল্যামার, বিদ্রোহ, ক্ষমতা কিংবা তীব্র আবেগ—যেকোনো কিছুর প্রতীক হতে পারে। তবু বলিউডের পুরোনো দৃশ্যভাষা পুরোপুরি মুছে যায়নি।
কালো স্মোকি আই, এলোমেলো চুল, চামড়ার জ্যাকেট আর নাইটক্লাব এই চারটি সংকেত একসঙ্গে দেখলেই দর্শক এখনো বুঝে নিতে পারেন, পর্দায় আসা নারীটি গতানুগতিক ‘ভালো মেয়ে’ নন।
অর্থাৎ, বলিউডে স্মোকি আই শুধু চোখের সাজ নয়, এটি এমন এক নারীর দৃশ্যগত পরিচয়, যিনি নিজের মতো করে বাঁচতে চান এবং সমাজের বেঁধে দেওয়া নিয়ম মানতে সবসময় রাজি নন।









