শান্তির খোঁজে বিশ্ব, শুরু হোক নিজের ভেতর থেকে

জীবনযাপন ডেস্ক
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:০০আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:০০

‘শান্তি’ ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ এর অর্থ মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে। শান্তি মানেই শুধু যুদ্ধ নেই, এমন একটি পৃথিবী নয়; বরং পরিবারে স্বস্তি, বন্ধুত্বে বিশ্বাস, প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌহার্দ্য, কর্মক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নিজের ভেতরের প্রশান্তিও শান্তিরই অংশ। এই বৃহত্তর অর্থকে সামনে রেখে প্রতি বছর পালিত হয় আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস।

১৯৮২ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে শান্তির ঘণ্টা বাজানোর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যের সূচনা হয়। দিনটি বিশ্বজুড়ে শান্তির মূল্য ও গুরুত্ব স্মরণ করার পাশাপাশি শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেওয়ার একটি বিশেষ উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।

শান্তি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে যুদ্ধ, সংঘাত ও সহিংসতা শান্তির বড় বাধা। তবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এমন অনেক ছোট ছোট দ্বন্দ্ব রয়েছে, যা ব্যক্তিগত শান্তিকে নষ্ট করতে পারে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিরোধ, সহকর্মীর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি কিংবা প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ এসবও মানুষের মনে অশান্তি তৈরি করে।

তাই শান্তির শুরু হতে পারে খুব কাছের মানুষটিকে দিয়ে। কারও সঙ্গে দীর্ঘদিনের অভিমান থাকলে কথা বলা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া, অন্যের মতামত মন দিয়ে শোনা কিংবা নিজের কোনো ভুলের জন্য নিজেকেও ক্ষমা করা এসব ছোট উদ্যোগই হয়ে উঠতে পারে শান্তির চর্চা।

একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে বসা, নিজের কাজ ও আচরণ নিয়ে ভাবা, পুরোনো ক্ষোভ ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোও হতে পারে এই দিনের অর্থবহ উদযাপন।

যেভাবে শুরু হয়েছিল শান্তি দিবস

আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে জাতিসংঘের উদ্যোগ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে দিবসটি প্রতিষ্ঠা করে। এর উদ্দেশ্য ছিল সব দেশ ও জনগণের মধ্যে এবং দেশের অভ্যন্তরে শান্তির আদর্শকে স্মরণ ও শক্তিশালী করা।

১৯৮২ সাল থেকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে শান্তির ঘণ্টা বাজানোর মাধ্যমে দিবসটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের একটি ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে ২০১১ সালে ২১ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। দিনটি সহিংসতা বন্ধ এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে শান্তির আদর্শকে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

প্রতি বছর বদলায় প্রতিপাদ্য

আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের সঙ্গে প্রতিবছর যুক্ত থাকে একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য। এসব প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে শান্তি, সহমর্মিতা, বৈষম্যহীনতা, পরিবেশ রক্ষা এবং সংঘাত নিরসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে।

বিগত বছরগুলোর প্রতিপাদ্যের মধ্যে ছিল, ‘বর্ণবাদ বন্ধ করুন, শান্তি গড়ে তুলুন’, ‘ন্যায়সংগত ও টেকসই বিশ্বের জন্য আরও ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়ানো’, ‘একসঙ্গে শান্তির রূপ দিই’ এবং ‘শান্তির জন্য জলবায়ু কার্যক্রম’।

প্রতিপাদ্য প্রতিবছর পরিবর্তিত হলেও শান্তির একটি সর্বজনীন বার্তা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, ‘পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করুক।’

এই বার্তা বয়স, সংস্কৃতি, ধর্ম কিংবা সামাজিক পরিচয়ের পার্থক্য ভুলে মানুষকে একটি অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার জায়গায় একত্রিত করে। আর সেই আকাঙ্ক্ষা হলো শান্তিপূর্ণ পৃথিবী।

এক মিনিটের নীরবতায় শান্তির বার্তা

আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের অন্যতম প্রতীকী আয়োজন হলো বিশ্বব্যাপী এক মিনিট নীরবতা পালন। প্রতিটি সময় অঞ্চলে স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় যে যেখানে অবস্থান করছেন, সেখান থেকেই এক মিনিট নীরব থেকে শান্তির প্রতি সমর্থন জানাতে পারেন।

যুদ্ধ, সহিংসতা ও সংঘাতের বিপরীতে শান্তির গুরুত্ব স্মরণ করার এই আয়োজন অত্যন্ত সরল হলেও এর তাৎপর্য গভীর। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি ঘণ্টার শুরুতে যখন কোনো না কোনো মানুষ নীরবতায় অংশ নেন, তখন তা যেন এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে শান্তির বার্তা পৌঁছে দেয়।

মাত্র এক মিনিটের নীরবতা মনে করিয়ে দেয়, শান্তির জন্য সবসময় বড় কোনও আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। কখনও নীরবতাই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা।

একই টেবিলে ভিন্ন মানুষ

শান্তি প্রতিষ্ঠার আরেকটি সুন্দর উদ্যোগ হতে পারে বিভিন্ন পটভূমি, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মানুষকে একসঙ্গে বসিয়ে খাবারের আয়োজন করা। একই টেবিলে বসে খাবার ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহাবস্থান, শ্রদ্ধা ও মানুষের মধ্যে মিলের জায়গাগুলো নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

একসঙ্গে খাবার খাওয়ার সহজ আয়োজন অনেক সময় মানুষের দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার মতামত বোঝার চেষ্টা করা এবং সহমর্মিতা দেখানোর মধ্য দিয়ে তৈরি হতে পারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধনের পরিবেশ।

শান্তির শিক্ষা শুরু হোক পরিবার থেকে

শান্তির চর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হতে পারে পরিবার। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ভাগাভাগি করে নেওয়া, একে অন্যকে সহযোগিতা করা এবং মতবিরোধ হলে রাগ বা আক্রমণাত্মক আচরণের পরিবর্তে কথা বলে সমস্যার সমাধান করতে শেখানো যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস উপলক্ষে শিশুদের নিয়ে শান্তি, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা, ছবি আঁকা, কবিতা লেখা কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজন করা যেতে পারে।

তবে শান্তির শিক্ষা শুধু শিশুদের জন্য নয়। বড়দের আচরণও শিশুদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই পরিবারে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, ধৈর্য ও সহনশীলতার চর্চা করাও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শান্তি হোক প্রতিদিনের অভ্যাস

আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস মূলত একটি দিনের উদযাপন হলেও শান্তির প্রয়োজন প্রতিদিন। বাড়িতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, প্রতিবেশী সমাজে কিংবা বৃহত্তর বিশ্বে সব জায়গাতেই শান্তির চর্চা প্রয়োজন।

শান্তি প্রতিষ্ঠা কোনও একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। অন্যের কথা শোনা, মতের পার্থক্যকে সম্মান করা, ক্ষোভের পরিবর্তে আলোচনার পথ বেছে নেওয়া, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া এবং অন্যের প্রতি সহমর্মী হওয়া এসব ছোট ছোট আচরণ থেকেই বড় পরিবর্তনের শুরু হতে পারে।

তাই আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের সবচেয়ে বড় বার্তা হয়তো এটাই শান্তি শুধু উদযাপনের বিষয় নয়, শান্তি একটি চর্চা। আর সেই চর্চা শুরু হতে পারে নিজের ঘর থেকেই, নিজের আচরণ থেকে, আজ থেকেই।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
স্ত্রীর জন্য ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতায় ভরা একটি দিন
আজ পুরোনো বন্ধুকে খুঁজে নেওয়ার দিন
বাঁশ দিবসে বাঁশের কদর বাড়ুক, বাঁশ দেওয়া কমুক!
সর্বশেষ খবর
জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ, দক্ষিণ আফ্রিকাকে পেছনে ফেললো অস্ট্রেলিয়া
জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ, দক্ষিণ আফ্রিকাকে পেছনে ফেললো অস্ট্রেলিয়া
প্রথম স্ত্রীসহ গাজী নজরুলের ৭ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ 
প্রথম স্ত্রীসহ গাজী নজরুলের ৭ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ 
জার্মানির রাজ্য নির্বাচনে ‘বিপর্যয়’, তবু পদ ছাড়ছেন না মের্ৎস
জার্মানির রাজ্য নির্বাচনে ‘বিপর্যয়’, তবু পদ ছাড়ছেন না মের্ৎস
স্পিকারকে জানিয়ে গ্রেফতার দেখানো হলো সংসদ সদস্য গাজী নজরুলকে
স্পিকারকে জানিয়ে গ্রেফতার দেখানো হলো সংসদ সদস্য গাজী নজরুলকে
সর্বাধিক পঠিত
সাড়ে ৫ বছর পর ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হলো টাকা
সাড়ে ৫ বছর পর ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হলো টাকা
অপ্রতিমকে কোথায় কীভাবে ও কেন হত্যা করলো, জানিয়েছে পুলিশ
অপ্রতিমকে কোথায় কীভাবে ও কেন হত্যা করলো, জানিয়েছে পুলিশ
১১ দলের লংমার্চ নিয়ে মেট্রোপলিটন পুলিশের পেজে স্ট্যাটাস, পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যাহার
১১ দলের লংমার্চ নিয়ে মেট্রোপলিটন পুলিশের পেজে স্ট্যাটাস, পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যাহার
নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী, সফরসঙ্গী কারা?
নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী, সফরসঙ্গী কারা?
‘নিজেকে শেষ করার’ আগে চিরকুটে কষ্টের কথা লিখে গেছেন মরিয়ম
‘নিজেকে শেষ করার’ আগে চিরকুটে কষ্টের কথা লিখে গেছেন মরিয়ম