বন্ধুত্ব জীবনের অন্যতম সুন্দর সম্পর্ক। আনন্দের সময় যেমন একজন ভালো বন্ধু পাশে থাকেন, তেমনি কঠিন সময়েও সাহস জোগান। সেই প্রিয় বন্ধুত্বকে উদযাপন এবং পুরোনো দিনের স্মৃতিকে নতুন করে মনে করার একটি বিশেষ উপলক্ষ হলো প্রিয় বন্ধুর দিবস।
যারা কখনও নাগরিক ব্যান্ডের বেতারযন্ত্রে কথোপকথন শুনেছেন কিংবা ১৯৭০-এর দশকের এমন কোনও অনুষ্ঠান দেখেছেন, যেখানে আমেরিকার মহাসড়কে চলাচলকারী ট্রাকচালকদের জীবন তুলে ধরা হতো, তারা সম্ভবত ‘দশ-চার, ভালো বন্ধু’ কথাটির সঙ্গে পরিচিত। মজার হলেও এই কথাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে যোগাযোগ ও বন্ধুত্বের পুরোনো দিনের এক বিশেষ স্মৃতি।
প্রিয় বন্ধুর দিবসের ইতিহাস
প্রিয় বন্ধুর দিবসের পেছনের ইতিহাস শুনলে অনেকেরই অবাক লাগতে পারে। এই দিবসের ধারণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নাগরিক ব্যান্ডের বেতারযন্ত্র এবং একসময়ের জনপ্রিয় যোগাযোগব্যবস্থা। ধারণা করা হয়, দিনটির প্রাথমিক ভাবনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার।
নাগরিক ব্যান্ডের বেতারযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘দশ-চার, ভালো বন্ধু’ কথাটিও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সে সময় ট্রাকচালকসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকেরা নিজেদের গাড়িতে এই বেতারযন্ত্র ব্যবহার করতেন। মুঠোফোন কিংবা গাড়িতে ব্যবহারের উপযোগী ফোনের প্রচলনের আগের সময়ে দূরপথে চলার সময় একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এটি ছিল বেশ কার্যকর একটি মাধ্যম।
এই বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত ও সংক্ষিপ্তভাবে বার্তা আদান-প্রদানের জন্য বিভিন্ন সংখ্যাভিত্তিক সংকেত ব্যবহার করা হতো। যেমন, ‘১০-৯’ বলা হলে শেষ কথাটি আবার বলতে বলা হতো। ‘১০-১০’ দিয়ে বোঝানো হতো বার্তা দেওয়া শেষ, এখন পরবর্তী বার্তার অপেক্ষায় থাকা। ‘১০-২০’ ব্যবহার করে কারও অবস্থান জানতে চাওয়া হতো। আর ‘১০-২০০’ বলা হলে বোঝানো হতো পুলিশের প্রয়োজন রয়েছে।
তবে এসব সংকেতের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হয়ে ওঠে ‘১০-৪’। এর অর্থ ছিল বার্তা পাওয়া গেছে বা কথা বুঝতে পেরেছি। এর সঙ্গে ‘ভালো বন্ধু’ ধরনের স্নেহপূর্ণ সম্বোধন যোগ হওয়ায় ‘১০-৪, ভালো বন্ধু’ কথাটি ধীরে ধীরে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগের একটি পরিচিত অভিব্যক্তিতে পরিণত হয়।
১৯৭৮ সালে আমেরিকার মহাসড়কে চলাচলকারী ট্রাকচালকেরা যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পণ্য পৌঁছে দিতে কাজ করছিলেন, তখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তাদের সম্মান জানাতে ৪ অক্টোবরকে ‘১০-৪ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দিনটি বিভিন্নভাবে পালিত হয়ে আসছে। তবে বর্তমানে এর আনুষ্ঠানিকতা আগের মতো নেই এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকেও দিনটির আর কোনও সরকারি স্বীকৃতি নেই।
সময়ের সঙ্গে যোগাযোগপ্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। মুঠোফোনের মতো সহজ ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা জনপ্রিয় হওয়ায় নাগরিক ব্যান্ডের বেতারযন্ত্রের ব্যবহারও অনেকটাই কমে যায়। তবে ২০০৪ সালে অপ্রত্যাশিতভাবে ‘১০-৪’ কথাটি আবার নতুন করে আলোচনায় আসে।
মৌসুমের শুরুটা একটু ভিন্নভাবে উদযাপন করার একটি মজার উপায় খুঁজছিলেন এক স্নোবোর্ডার। তিনি ‘১০-৪’ কথাটিকে নতুনভাবে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেন এবং দিনটির নাম দেন ‘জাতীয় ভালো বন্ধুর দিবস’। এবার অবশ্য এর সঙ্গে মহাসড়কের ট্রাকচালকদের সম্পর্কের চেয়ে বন্ধুত্ব উদযাপনের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পায়।
নাম থেকেই বোঝা যায়, নতুনভাবে দিনটির মূল উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে সত্যিকারের ভালো বন্ধুদের উদযাপন করা। যারা জীবনের আনন্দ-বেদনা ভাগ করে নেন, বিপদের সময় পাশে দাঁড়ান, প্রয়োজনে সাহস জোগান এবং নিঃস্বার্থভাবে বন্ধুত্বের সম্পর্ককে আগলে রাখেন এই দিনটি মূলত তাদের জন্যই।
কীভাবে উদযাপন করবেন প্রিয় বন্ধুর দিবস
প্রিয় বন্ধুর দিবস হতে পারে পুরোনো দিনের স্মৃতি মনে করে আনন্দ করার এবং প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে আবারও যোগাযোগ তৈরি করার একটি সুন্দর উপলক্ষ। এদিন আয়োজনের মূল বিষয় হতে পারে আন্তরিকতা ও ভালোবাসা উদযাপন।
দীর্ঘদিন কথা হয়নি, এমন কোনও পুরোনো বন্ধুকে ফোন করে খোঁজ নিতে পারেন। মুঠোফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে একটি বার্তা পাঠিয়েও জানাতে পারেন, বন্ধুত্ব এখনও আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। চাইলে মজার ছলে পুরোনো সেই ‘দশ-চার, ভালো বন্ধু’ কথাটিও ব্যবহার করতে পারেন। হয়তো ছোট্ট একটি ফোনকলই পুরোনো বন্ধুত্বের অনেক স্মৃতি ফিরিয়ে আনবে।
পুরোনো যোগাযোগব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ থাকলে নাগরিক ব্যান্ডের বেতারযন্ত্র ব্যবহার করে দেখাও হতে পারে ভিন্নধর্মী একটি অভিজ্ঞতা। বর্তমানে এই যন্ত্রের ব্যবহার অনেক কমে গেলেও কিছু মানুষ এখনও এর পুরোনো দিনের আবহ উপভোগ করেন। বিশেষ করে ট্রাকচালক ও দুর্গম পথে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের মধ্যে এর ব্যবহার এখনও দেখা যায়।
তাই কোনও পুরোনো বন্ধুর কাছে এমন বেতারযন্ত্র থাকলে সুযোগ করে তার সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারেন। এতে শুধু পুরোনো যোগাযোগব্যবস্থার স্বাদই পাওয়া যাবে না, বন্ধুত্বের পুরোনো স্মৃতিও নতুন করে মনে পড়বে।
সবশেষে, প্রিয় বন্ধুর দিবস মূলত মনে করিয়ে দেয়, জীবনে অনেক মানুষ আসা-যাওয়া করলেও সত্যিকারের বন্ধুদের জায়গা আলাদা। তাই এই বিশেষ দিনে প্রিয় বন্ধুটিকে জানিয়ে দিন, তার বন্ধুত্ব আপনার কাছে কতটা মূল্যবান। একটি আন্তরিক ফোনকল, কয়েকটি ভালোবাসার কথা কিংবা পুরোনো কোনও স্মৃতি ভাগ করে নেওয়াই হতে পারে দিনটি বিশেষ করে তোলার সবচেয়ে সুন্দর উপায়।