চুলে পাক ধরলে রং করবেন, নাকি স্বাভাবিকভাবেই সাদা চুলকে গ্রহণ করবেন- এই সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয় অনেক নারীকে। সাম্প্রতিক সময়ে হলিউডের বেশ কয়েকজন তারকা অবশ্য সাদা চুলকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড তৈরি করছেন। তবে পর্দার বাইরের নারীদের জন্য বিষয়টি এখনও এতটা সহজ নয়। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে বয়সবাদ ও সৌন্দর্য নিয়ে প্রচলিত ধারণার কারণে অনেক নারী চুলে রং করা ছাড়তে দ্বিধায় থাকেন।
সম্প্রতি সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন অভিনেত্রী অলিভিয়া কোলম্যান। জুরিখ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে তাঁকে দেখা গেছে তাঁর পরিচিত গাঢ় রঙের ছোট পিক্সি কাটের বদলে এক পাশে আঁচড়ানো ধূসর, কোঁকড়ানো চুলে। নতুন এই লুকের জন্য অনলাইনেও প্রশংসা পেয়েছেন তিনি। ‘ভোগ’ তাঁকে ‘সিলভার হেয়ার মিউজ’ হিসাবে অভিহিত করেছে।
৫২ বছর বয়সী কোলম্যানের পাশাপাশি অ্যান্ডি ম্যাকডাওয়েল ও লিসা বনেটও সাদা-কালো মেশানো কিংবা পুরোপুরি রুপালি চুলের লুক বেছে নিয়েছেন। ফলে বয়সের সঙ্গে চুলের স্বাভাবিক পরিবর্তনকে গ্রহণ করার প্রবণতা ফ্যাশন ও বিনোদন দুনিয়ায় ক্রমেই বাড়ছে।
সাদা চুল গ্রহণের পথে বাধা
হলিউডের তারকারা যেখানে সাদা চুলকে নতুন স্টাইল হিসাবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন, সেখানে কর্মজীবী অনেক নারীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন। সাবেক ফ্যাশন সম্পাদক স্টেসি ডুগুইডের মতে, “নিজের সাদা চুলকে গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারাটা এক ধরনের সুবিধা।”
৫২ বছর বয়সে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি খুঁজে পাওয়ার সংগ্রামের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন ডুগুইড। তিনি জানান, তাঁকে নিজের বাড়ি ছোট করতে হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি ‘ইউনিভার্সাল ক্রেডিট’-এর ওপর নির্ভর করছেন। তাঁর অভিজ্ঞতার পর অসংখ্য মধ্যবয়সী নারীও নিজেদের চাকরি খোঁজার সমস্যার কথা জানিয়ে যোগাযোগ করেন।
ডুগুইডের ভাষায়, কর্মক্ষেত্রে ফেরার চেষ্টা করা নারীদের মধ্যে সাদা চুল গ্রহণ করার ক্ষেত্রে এক ধরনের অনীহা থাকে। তাঁর মতে, সাদা চুল নিয়ে স্বচ্ছন্দে থাকার সুযোগ সাধারণত তখনই আসে, যখন কেউ ইতোমধ্যে কর্মক্ষেত্রে একটি জ্যেষ্ঠ অবস্থানে পৌঁছে গেছেন। কিন্তু বেকার ও আর্থিক সংকটে থাকা একক মা হিসেবে তাঁর ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটা সহজ ছিল না।
কখন থেকে চুল পাকতে শুরু করে?
গড়ে শ্বেতাঙ্গ ও এশীয়দের চুলে ৩০-এর মাঝামাঝি বয়সে পাকা চুল দেখা দিতে শুরু করে। কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষেত্রে সাধারণত ৪০-এর মাঝামাঝি বয়সে এই পরিবর্তন দেখা যায়।
সাবেক সম্পাদক ও থেরাপিস্ট খোঁজার প্ল্যাটফর্ম ওয়েলডুইং-এর প্রতিষ্ঠাতা লুইস চুনও নিজের চুল নিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। যুক্তরাজ্যের ‘ইনস্টাইল’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক হওয়ার সময় প্রথম চুলে রং করা বন্ধ করেছিলেন তিনি।
চুন বলেন, তখন তাঁর সাদা চুল নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কী ভাববেন, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন না। কারণ সম্পাদকের চাকরির প্রস্তাবটি এসেছিল নিউইয়র্ক থেকে। সেখানে পরিপাটি ও কিছুটা পরিশীলিত দেখানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবে ৫০-এর দশকে আবার চুলে রং করা শুরু করেন চুন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, সাদা চুল তাঁকে বয়সের তুলনায় বেশি বয়স্ক দেখাতে পারে। পরে ৬০-এর দশকে গিয়ে আবার চুলে রং করা ছেড়ে দেন তিনি।
সাদা চুলের লুকও এখন তৈরি হচ্ছে পরিকল্পনা করে
অলিভিয়া কোলম্যানের নতুন লুকটি কিন্তু পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে চুল পেকে যাওয়ার ফল নয়। লন্ডনভিত্তিক হেয়ার স্পেশালিস্ট ইনাঙ্ক এমির এক্সটেনশনের সাহায্যে তাঁর এই লুক তৈরি করেছেন। কোলম্যানের স্বাভাবিক চুলের রং অনুসরণ করে চারটি ভিন্ন ধূসর শেড ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি চুলে যোগ করা হয়েছে বাড়তি দৈর্ঘ্য ও ভলিউম।
স্টেসি ডুগুইড কোলম্যানের চুলকে ‘দারুণ আকর্ষণীয়’ বলে বর্ণনা করলেও তাঁর মতে, এই লুকের মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা সাধারণত অনেক কম বয়সী নারীদের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর ভাষায়, এটি অনেকটা সাদা চুলের একটি ‘ফেটিশাইজড’ বা অতিরঞ্জিত সংস্করণ।
সাদা চুলে যেতে সময় লাগে
লন্ডনের ল্যারি কিং স্যালনের গ্রে-ব্লেন্ডিং ও হেয়ার কালার বিশেষজ্ঞ সারাহ বাওয়ার বলেন, সাদা চুল গ্রহণ করতে চাওয়া ক্লায়েন্টদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, তাঁদের যেন বয়সের তুলনায় বেশি বয়স্ক না দেখায়।
তাঁর মতে, চুলে পাক ধরলে শুধু একদিনে হেয়ার ডাই ব্যবহার বন্ধ করলেই বিষয়টি শেষ হয় না। স্বাভাবিক চুলের রং ও আগে রং করা চুলের মধ্যকার দৃশ্যমান পার্থক্য বা ‘ডিমারকেশন লাইন’ ধীরে ধীরে মিলিয়ে দিতে হয়। লক্ষ্য থাকে এমনভাবে চুলের রং ও শেড ঠিক করা, যাতে স্বাভাবিক চুলের সঙ্গে আগের রং করা অংশের পার্থক্য কম চোখে পড়ে। পুরোপুরি সাদা চুল স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে প্রায় তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলেও জানান তিনি।
বয়সবাদ কি নারীদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে?
চুলের রং নিয়ে এই দ্বিধার পেছনে কর্মক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক বৈষম্যের বড় ভূমিকা থাকতে পারে। যুক্তরাজ্যের অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে প্রায় ৩ শতাংশ বেকার। আর ‘সেন্টার ফর এজিং বেটার’-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, চাকরির আবেদনকারীরা গড়ে ৫৫ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর নিয়োগদাতাদের কাছে তাঁদের আকর্ষণীয়তা কমতে শুরু করে।
লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ইয়ান বার্নের গবেষণাতেও উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক চিত্র। যুক্তরাজ্যে নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের বয়সভিত্তিক বৈষম্য পুরুষদের তুলনায় অন্তত ১০ বছর আগেই শুরু হয়। ৪০ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর থেকেই নারীদের চাকরির সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকার সম্ভাবনা কমতে শুরু করে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই পতন শুরু হয় ৫০-এর দশকে।
ফলে সাদা চুল সৌন্দর্য বা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়ে না থেকে অনেক নারীর জন্য এটি কর্মক্ষেত্রে বয়স ও চেহারা নিয়ে তৈরি সামাজিক ধারণার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
ফ্যাশন মঞ্চে বদলাচ্ছে ধারণা
তবে ফ্যাশন দুনিয়ায় বয়সের বৈচিত্র্য এখন আগের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫০ বছর বয়সী মডেল স্টেফানি কাভালি, যাঁর চুলে পাকার ছাপ রয়েছে, শ্যানেলের কুতুর শো উদ্বোধন করেন।
৫৯ বছর বয়সী এভলিন এফ্রিম-বোচেও সাদা-কালো মেশানো চুল নিয়ে আবার মডেলিংয়ে ফিরেছেন। ২০-এর শেষ দিকে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় মডেলিং ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। পরে ফিরে এসে নিজের ধূসর চুলের রেখাকেই লুকের অংশ হিসাবে তুলে ধরেছেন।
ফ্যাশন মঞ্চে এই পরিবর্তন দেখাচ্ছে, বয়সের সঙ্গে চেহারার স্বাভাবিক পরিবর্তনকে সৌন্দর্যের বাইরে রাখার ধারণা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। তবে সেই পরিবর্তন কর্মক্ষেত্রেও কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।