হাজারি গুড়ের হাজার কথা (ভিডিও)

Send
মতিউর রহমান, মানিকগঞ্জ
প্রকাশিত : ২০:০০, জানুয়ারি ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৯, জানুয়ারি ২৭, ২০২০

মানিকগঞ্জের হাজারি গুড় স্বাদ ও সুগন্ধে অতুলনীয়। শত বছরের ঐতিহ্য নিয়ে টিকে থাকা এই গুড় উৎপাদনের সঙ্গে বংশপরম্পরায় যুক্ত রয়েছে হাজারি পরিবার।


এই অঞ্চলের হাজারি গুড়ের পরিচিত, সুনাম ও ঘ্রাণ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়েছে। একদা ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথও এই গুড় খেয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। হাজারি গুড়ের ঐতিহ্যকে স্বীকৃতি দিতে এলাকার নামকরণ করা হয়েছে হাজারিপাড়া।


বর্তমান প্রায় শ’খানেক গাছি হাজারি গুড় তৈরি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও অতিমাত্রায় কুয়াশায় গুড়ের উৎপাদন কম হচ্ছে বলে জানান গাছিরা।  
খাঁটি খেজুরের রসই হাজারি গুড়ের উৎস। গাছির রস নামানো থেকে শুরু করে গুড় তৈরি, সবই হয় একেবারে আদিকালের প্রক্রিয়াতেই। কাল থেকে কালান্তরে অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও হাজারি গুড় তৈরির এই প্রক্রিয়ার কোনও পরিবর্তন নেই বলে জানালেন গাছিরা।
মানিকগঞ্জের গুড়ের বাজারে খেজুরের গুড়ের বিশাল পসরা বসলেও হাজারি গুড় সেখানে অনন্য। তাই এর দাম প্রচলিত পাটালি গুড়ের তুলনায় অনেক বেশি।
মানিকগঞ্জর হরিরামপুর উপজলার ঝিটকা, বাল্লা, গোপিনাথপুরসহ আশপাশের গ্রামে সরেজমিন দেখা যায়, তীব্র শীত উপেক্ষা করে কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হয় সেখানকার গাছিদের কর্মযজ্ঞ। ভোর সাড়ে ৫টায় আজানের আগেই ঘুম ভেঙে গেছে গাছি জয়নুদ্দীনের। ঝিটকা বাজার পেরিয়ে দুই কিলোমিটার যাওয়ার পর দেখা হয় তার সঙ্গে। তীব্র ঠান্ডাকে বশ করার জন্য চাদর জড়িয়ে খেজুর গাছে উঠে পড়েছেন রসের হাঁড়ি নামাতে। একে একে ২০টি গাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামানোর পর মিনিট খানেক বিশ্রাম নিলেন তিনি। এরপর আবারও রসের হাঁড়ি নামানো শুরু। এভাবে একটানা ৫০টির মতো খেজুর গাছে উঠতে হলো জয়নু্দ্দীনকে। এরপর হাঁড়ির রস এক পাত্রে নিয়ে শুরু হলো জ্বাল দেওয়ার প্রস্তুতি।


পরের গন্তব্য আরও ৫ কিলোমিটার পথ। পার্শ্ববর্তী গোপিনাথপুর ইউনিয়নের উত্তর পাড়ায় শুকুর আলী মোল্লার ছেলে মোজাফ্ফর  মোল্লার (মোজাফ্ফর হাজারি) বাড়িতে। তিনি নানার বাড়ির উত্তরাধিকার সূত্রে হাজারি গুড় তৈরির স্বীকৃতি পেয়েছেন। গুড় বানানোর ফাঁকে ফাঁকে তার সঙ্গে চললো গল্প।


জানালেন, তার নানা মকবুল হাজারির কাছে গল্প শুনেছেন, একদা এক দরবেশ ঝিটকা এলাকার রাস্তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় ওই দরবেশ নাকি এক গাছির কাছে খেজুরের রস খেতে চাইলেন। কিন্তু তখন সবে গাছে রসের হাঁড়ি পাতা হয়েছে। কিন্তু দরবেশ ওই গাছিকে বললেন, দেখো তোমার রসের হাঁড়ি ভরে গেছে। এরপর কৌতূহলি ওই গাছি গাছে উঠে দেখেন সত্যিই হাঁড়ি রসে ভরপুর। তারপর তাকে রস খাওয়ানো হলো। তখন দরবেশ তাকে বললেন, দেখবি এই রস জ্বাল করে সুস্বাদু গুড় পাবি। সেই থেকে এই গুড়ের নাম হাজারি গুড়। হাজারি গুড় নিয়ে এমন অনেক লোককথা এ অঞ্চলে প্রচলিত  বলে জানালেন মোজাফ্ফর  হাজারি।


সরেজমিন দেখা গেল গুড় তৈরির নানান কারিশমা। প্রতি এক হাঁড়ি রস আলাদাভাবে জ্বাল করতে হয়। এরপর একটি মাটির পাত্রে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ফুটন্ত রস ছেঁকে ঢেলে দেওয়া হয় একটি খাঁড়া মাটির পাত্রে, যা জালা নামে পরিচিত। জালার দুপাশে দুজন ব্যক্তি বসেন কাঠ  কিংবা তালের লাঠি নিয়ে। এরপর বারবার নাড়তে নাড়তে ধবধবে সাদা বাদামি রঙ তৈরি হয়। তারপর তৈরি হয় সুস্বাদু হাজারি গুড়।
মোজাফ্ফর হাজারি জানালেন, দাদা বেলায়েত মোল্লা হাজারি গুড় তৈরি করতেন। বাবা শুকুর আলী বয়সজনিত কারণে এখন আর এই পেশায় না থাকলেও প্রতিদিন উঠানে বসে তাদের কাজ তদারকি করেন। পরামর্শ দেন যেন কোনও ধরনের ভেজাল না মেশে শত বছরের এই ঐতিহ্যে। মোজাফ্ফর জানালেন, এই গুড় তৈরি পেশায় তিনিসহ ভাই সুকচান মোল্লা ও মান্নান মোল্লা হাজারি নিয়োজিত।
যেভাবে খেজুর গাছ ও রসের হাঁড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়
কথা হলো গাছি আমজাদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এই বাড়ির খেজুরের গাছ কাটছেন দীর্ঘদিন ধরে। গাছ ও রসের হাঁড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয় সতর্কতার সঙ্গে। প্রথমে নিম পাতা দিয়ে পানি গরম করে প্রতিটি রসের হাঁড়ি জীবাণুমুক্ত করতে হয়। পরে হাঁড়িগুলো কড়া রোদে শুকানো হয়। একটানা তিনদিন করে প্রতিটি খেজুর গাছ থেকে রস নামানো হয়। পরে ৫ দিন বিরতি দিয়ে গাছ শুকিয়ে আবারও তিনদিন করে রস বের করা হয়।
প্রতিদিন বিকালে গাছ কেটে হাঁড়ি বেঁধে দেওয়া হয়। পরদিন ভোরে গাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামিয়ে ছেঁকে ময়লা পরিষ্কার করে টিনের তৈরি তাফালে (পাত্র) বাইন (চুলা) জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করতে হয়। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় নাড়া ও কাশপাতা। এ গুড় দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমনি সুস্বাদু।


মোজাফ্ফর মোল্লা জানালেন, তার মা মমতাজ বেগম বাবার ওয়ারিশের ১৩ বিঘা জমির বিনিময়ে হাজারি গুড়ের সিলের উত্তরাধিকারী হয়েছেন। নানার বাড়ি থেকে মায়ের ১৩ বিঘা সম্পত্তির বিনিময়ে ঐতিহ্যবাহী হাজারি গুড়ের সিল পান তারা।
তিনিসহ ভাই মান্নান মোল্লা এবং মামা জাহিদ হাজারি জানালেন, হাজারি গুড়ের সুনাম দেশ থেকে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। তারা মুরুব্বিদের কাছে শুনেছেন, ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথকেও এই গুড় উপহার দেওয়া হয়েছিল। এই গুড় এখনও লন্ডনে যায়। এছাড়া ইতালি, ভারতসহ  বিভিন্ন দেশেও চাহিদা রয়েছে এর।


সুকচান মোল্লা জানালেন, হাজারি গুড়ের চাহিদা এতই বেশি যে তৈরি করার কয়েক মাস আগেই অর্ডার থাকে। তবে আগের মতো এখন আর গুড় তৈরি করা যায় না। কারণ, বর্তমানে খেজুর গাছের সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি রস জ্বাল করার জ্বালানির বড়ই অভাব। শীতের প্রায় তিন মাস গাছ কাটা যায়।

/এনএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ