‘কখনো আমার মাকে’

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ১২:৫৬, মে ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৭, মে ১০, ২০২০

হাজেরা বেগমের গল্পটা নিশ্চয় আপনি জানেন? খুব ছোটবেলায় মা মারা গিয়েছিল তার। সৎ মায়ের অত্যাচার সইতে না পেরে একদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে আসেন। তখন তিনি খুব ছোট। কেউ একজন তাকে পতিতা পল্লীতে বিক্রি করে দেয়। সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছেন মা হয়ে। একলা বের হননি। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন নিষিদ্ধ পল্লীর শিশুদের সঙ্গে নিয়ে। তারপর থেকে সেই শিশুদের মা তিনি। জন্ম না দিয়েও হাজেরা বেগম মা। তুলে নিয়েছেন শত শিশুর দায়িত্ব। স্বপ্ন দেখেন তার সন্তানেরা একদিন জগত বদলে দেবে তার মতো করেই।

এতো গেল এক মায়ের কথা। মা সীমা সরকারের ছেলে হৃদয় সরকারের গল্পটাও নিশ্চয় আপনি জানেন। প্রতিবন্ধী ছেলেকে কোলে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন মা। ভর্তি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। হৃদয় এতদূর এসেছেন শুধু মায়ের কোলে চড়ে। হাঁটতে না পারা হৃদয়ের পাশে শুধুই তার মা ছিলেন, জয় করেছেন সব বাঁধা।

আচ্ছা সেদিনের সেই মায়ের কথা মনে আছে? করোনা সংকটে যখন ভারতেও লকডাউন ঘোষণা হয়েছিল তখন তেলেঙ্গানার এক তরুণ অন্ধ্রপ্রদেশে এক বন্ধুর বাড়িতে আটকা পড়ে গেছেন। ফেরার কোনো উপায় নেই। সেই ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে ১৪০০ কিলোমিটার বাইক চালালেন মা।

এসব মায়েদের গল্প। কেউ জন্ম দিয়ে মা, কেউ কোলে তুলে নিয়ে মা। মা একটি অনন্য অনুভূতির নাম। ঠিক কবে মায়েদের সম্মান জানাতে মা দিবসের অবতারণা হয়েছিল সেই গল্পে যাওয়ার প্রয়োজনই হয়তো নেই। পৃথিবীর তাবত ধর্ম, কিতাব বা বিশ্বাসে মায়ের মর্যাদাই সর্বাগ্রে।

এদিকে মা দিবসের কী করে অবতারণা হলো সেই গল্প খুঁজতে গেলে কেঁচো খুড়তে সাপ নয় ডাইনোসর বের হয়ে আসবে। আসলে মা শব্দের ব্যাপ্তি এতটাই প্রকট যে এখানে তল খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রাচীন রোমে যেসব মাতৃদেবী ছিলেন তাদের উৎসব উৎসর্গ করা হতো। অনেকেই দাবি করেন এখান থেকে মাদার্স ডের যাত্রা। আবার ষোড়শ শতকে ইউরোপে মাদারিং সানডের প্রচলণ হয়। সন্তানকে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও দায়িত্বশীল করতেই এই আয়োজন ছিল চার্চের।

তবে আনুষ্ঠানিক মা দিবসের অবতারণা করেন অ্যানা জারভিস। ১৯০৮ সালে প্রথম এই আমেরিকান নারী শ্রেষ্ঠ মায়েদের সম্মাননা জানাতে আনুষ্ঠানিক একটি দিবসের প্রবর্তন করেন। সব সন্তানের কাছে তার মা শ্রেষ্ঠ তাই সবাই নিজের মাকে বিশেষভাবে সম্মান জানাবে এবং উপহার দেবে- এমন একটি ভাবনা থেকেই মা দিবসের আয়োজন করেছিলেন তিনি। কিন্তু কর্পোরেট সংস্কৃতির চকোলেট, কার্ড আর উপহার যখন মা দিবসের গভীরতায় আঘাত হানলো তখন অ্যানা জারভিস রীতিমতো আইনী লড়াইয়ে নেমেছিলেন। তিনি মা দিবসের বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলায় জড়িয়ে পড়েন। ৪৮ সালে একেবারে নিঃশ্ব ও কপর্দকহীন হয়ে আন্না মারা যান এক স্যানেটেরিয়ামে। মা দিবসের গল্পটাও কত করুণ।

আসলে যেই অনন্য অনুভূতির নাম মা সেই অনুভব আদতেই সবার থেকে আলাদা। জন্ম দেওয়া থেকে লালন পর্যন্ত কিংবা জন্ম না দিয়ে শুধু স্নেহে লালন করার মতো মায়েরা প্রতিনিয়ত সন্তানদের জন্যই নিজের জীবন উৎসর্গ করছেন।

এই করোনা সংকটের লকডাউনে সবাই চেষ্টা করেছেন নিজের বাড়ি ফিরে যেতে সবাই পরিবারের কাছে ফিরেছেন। ছোট্ট এক এতিমখানার ১০ শিশু যেতে পারেনি। তাদের কেউ নেই। তাদের মা নেই। রাজধানীর অনেক ফুটপাতে এই ক্রান্তিকালেও একলা একলা ঘুরে বেড়াচ্ছে একটু খাবারের আশায়, ওদেরও মা-বাবা কারও হদিস নেই। একজন মা তো সন্তানের জন্যই মা হয়ে ওঠেন। তাই প্রতিটি সন্তান মা’কে পাক নিদেন পক্ষে মায়ের স্নেহ বঞ্চিত না হোক। আর পৃথিবীর সব মায়েরা যেন পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা পান।

কখনো আপনার মাকে যে কথাটি বলা হয়নি, যে ভালোবাসার কথা আমরা জানাতে পারিনি সেটি জানিয়ে দিন এই মা দিবসে। মায়ের স্নেহ ও আপনার শ্রদ্ধার সম্মিলন ঘটুক। ভালো থাকুক আমাদের মায়েরা।

কবি শামসুর রাহমানের মতো করে যেন আফসোস না করতে হয়-

কখনো আমার মাকে কোনো গান গাইতে শুনিনি।

সেই কবে শিশু রাতে ঘুম পাড়ানিয়া গান গেয়ে

আমাকে কখনো ঘুম পাড়াতেন কি না আজ মনেই পড়ে না।  

প্রতিমুহূর্ত উদযাপন করুন মায়ের সঙ্গে।

ছবি: ইমেজ বাজার।

 

/এফএএন/

লাইভ

টপ