আগামী বছরের ৫ থেকে ৮ জানুয়ারি বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা লিট ফেস্টে অংশগ্রহণ করছেন নোবেলজয়ী লেখক ওরহান পামুক। পামুক তুর্কি ঔপন্যাসিক, চিত্রনাট্য সম্পাদক ও শিক্ষক। বিশ্বের ৬০টিরও অধিক ভাষায় তার ১১ মিলিয়নের বেশি বই বিক্রি হয়েছে। ১৯৫২ সালে ইস্তাম্বুলে জন্ম নেওয়া পামুক ‘দ্য হোয়াইট ক্যাসল’, ‘দ্য ব্ল্যাক বুক’, ‘দ্য নিউ লাইফ’, ‘মাই নেম ইজ রেড’, ‘স্নো’ এবং ‘দ্য মিউজিয়াম অফ ইনোসেন্স’-এর জন্য বিখ্যাত। মহামারিকে কেন্দ্র করে রচিত ‘নাইটস অব প্লেগ’ প্রকাশিত হয় ঠিক করোনাকালীন সময়ে।
অটোমান সাম্রাজ্যের কাল্পনিক এক দ্বীপকে কেন্দ্র করে তুর্কির ঔপন্যাসিক ওরহান পামুক ‘নাইটস অব প্লেগ’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন। যাতে মহামারির উপাখ্যান ও একটি হত্যার রহস্য আবর্তিত হয়েছে।
২০২১ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাস ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ ও জীবনের নানা অনিশ্চয়তা নিয়ে রচিত হলেও এর বিষয়বস্তু কাকতালীয়ভাবে সমসাময়িক।
উপন্যাসে মিনঘেরিয়ার মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বিবদমান জীবন, যা থেকে পৃথিবী এখনও রেহাই পায়নি। একইসঙ্গে আছে নিপীড়ন ও বিপ্লব, ঐতিহ্য ও আধুনিকতা, রোগ ও মানবপ্রকৃতি, জাতীয়তাবাদ ও গুজবের প্রভাব।
৬০০ পৃষ্ঠাব্যাপী দুঃখ-কষ্ট ও দুর্দশা-দ্বন্দ্বের পর যখন উপন্যাসটি ‘Long Live Mingheria, Long live Mingherians, Long live Liberty’ বলে শেষ হয় তখন পৃথিবীর সব প্রান্তের মুক্তিকামী মানুষের মন আনন্দে উদ্বেলিত হয়।
উনিশ শতকের পটভূমিতে রচিত হয়েছে উপন্যাসটি। ক্রিট এবং সাইপ্রাসের মধ্যবর্তী অঞ্চলে রয়েছে মিনঘেরিয়া নামের এক দ্বীপ, যা অটোমান সাম্রাজ্যের ২৯তম রাজ্য। এখানকার অর্ধেক জনসংখ্যা মুসলিম আর বাকি অর্ধেক চিরায়ত খ্রিষ্টান; যাদের মধ্যে অনেক দিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে হঠাৎ করে মহামারি হাজির হয় এই দ্বীপে, যা ইতোমধ্যে এশিয়ার অনেক অঞ্চল আক্রান্ত করে ফেলেছে। কিন্তু এই মহামারি কাদের মাধ্যমে এসেছে? যেসব মুসলিম মক্কা থেকে হজ পালন করে ফিরে এসেছেন, নাকি আলেকজান্দ্রিয়া থেকে ফেরত আসা বণিকদের মাধ্যমে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দ্বীপটি বেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আবার এই মহামারিই একদিন দ্বীপটিকে বিদ্রোহের দিকে ধাবিত করে স্বাধীনতা এনে দেবে।
মহামারি সমাধানে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং দক্ষ মহামারি-বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে সেখানে পাঠান। চিকিৎসক আবার গোঁড়া খ্রিষ্টান। এ কারণে মুসলিমদের একাংশ, যাদের নেতা ছিলেন শেখ হামদুল্লাহ, তারা সব সতর্কতা প্রত্যাখ্যান করে, এবং এর পরপরই দ্বীপে একটি খুন সংঘটিত হয়।
মহামারি দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ায় সুলতান আরেকজন চিকিৎসক পাঠান। এই চিকিৎসক মুসলিম। তিনি আসার পরপরই দ্বীপে কড়া স্বাস্থ্যবিধি ও কোয়ারেন্টাইন ঘোষণা করা হয়। কিন্তু দ্বীপের গভর্নর ও স্থানীয় প্রশাসনের অদক্ষতা ও মানুষের অসতর্কতার কারণে এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় এবং মহামারি আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ে। যা ইস্তাম্বুলসহ পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে আন্তর্জাতিক মহল সুলতানকে দ্বীপটির চারপাশে বিদেশি এবং অটোমান যুদ্ধজাহাজ স্থাপন করে অবরোধ করতে বাধ্য করে।
মিনঘেরিয়ার বাসিন্দাদের কাছ থেকে সব সাহায্য কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাদের নিজেদেরই এখন মহামারি নির্মূল করার রাস্তা খুঁজে বের করতে হবে।
উপন্যাসে দেখানো হয়েছে দুর্নীতি কীভাবে অটোমান সাম্রাজ্যকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে, যা এই সাম্রাজ্যকে পতনের মুখে ঠেলে দেয়।
মিনঘেরিয়া দ্বীপের মানুষদের জীবনযাপনের এক বিশদ চিত্র প্রাণবন্তভাবে দেখিয়েছেন ওরহান পামুক। একইসঙ্গে অটোমান সাম্রাজ্যের অতীত ও বর্তমানের অসংখ্য চরিত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
শুধু এখানেই শেষ নয়, এটি একটি খুনের রহস্যও বটে, যেখানে শার্লক হোমসকে প্রচ্ছন্নভাবে স্মরণ করা হয়। অটোমান সম্রাট দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ শার্লক হোমস ও গোয়েন্দা গল্পের অনেক বড় অনুরাগী।
‘নাইটস অব প্লেগ’ প্রকাশের পরপরই সবাই জানতে চেয়েছেন করোনাকালে উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়া কি কাকতালীয়? পামুক জানিয়েছেন, এই উপন্যাসটি লেখার আগে তিনি পৃথিবীর নানা সময়ের মহামারি নিয়ে রচিত সাহিত্য বিস্তর পড়েছেন। চীন থেকে কীভাবে কলেরা এলো ভারতবর্ষে, যা হজযাত্রীদের মাধ্যমে মক্কা হয়ে তুর্কিকে আক্রান্ত করলো, এই ইতিহাস তাকে বিস্মিত করে।
পামুক দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে উপন্যাসটি রচনার প্রেক্ষাপট লেখেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘মহামারি নিয়ে উপন্যাস লেখার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম আজ থেকে ৩০ বছর আগে। সেই সময় চিন্তার কেন্দ্র ছিল মৃত্যুভয়।’
তিনি দেখেছেন, মহামারির প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হলো একে অস্বীকার করা এবং তা ছড়ানোর জন্য অন্যকে দোষারোপ করা। পাশাপাশি দ্রুত গুজবের পাখা গজানো।









