[বার্মার কাথা অঞ্চলে পুলিশ কর্মকতা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হন জর্জ অরওয়েল। একটু সুস্থ হলেও দুর্বল শরীরে তিনি দায়িত্ব থেকে ছুটি নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যান। ১৯২৭ সালের সেপ্টেম্বরে ইংল্যান্ডে ফেরার পর নিজ পরিবারের সঙ্গে থাকার সময় অরওয়েল তার জীবনকে পুনর্মূল্যায়ন করেন। তিনি বার্মায় আর ফিরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শৈশব থেকে অরওয়েল একজন লেখক হতে চেয়েছেন। লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার লক্ষ্যেই ১৯২৮ সালের ১২ মার্চ তিনি ইম্পেরিয়াল পুলিশ বাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি অনুধাবন করেন যে, বর্মিরা নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের দ্বারা শাসিত হচ্ছে। তখন তিনি ঔপনিবেশিক পুলিশ অফিসার হিসাবে তাঁর ভূমিকার জন্য উত্তরোত্তর লজ্জা বোধ করেন। পরে তিনি 'শুটিং অ্যান এলিফ্যান্ট' এবং 'আ হ্যাঙ্গিং' শিরোনামে দুটি ধ্রুপদী ব্যাখ্যামূলক রচনা লেখেন। এই দুটি উজ্জ্বল আত্মজীবনীমূলক ক্ষুদ্র রচনায় এবং বার্মিজ ডেজ উপন্যাসে অরওয়েল তাঁর অভিজ্ঞতা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতি তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। লেখাটি ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের শরত্কালে নিউ রাইটিংয়ে প্রকাশিত।]
বার্মার নিম্নাঞ্চল মৌলমেইনে আমি ছিলাম প্রচুর মানুষের ঘৃণার পাত্র। আমার পুরো জীবনে একমাত্র সেই সময় এ কারণে আমি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলাম। আমি ছিলাম মহকুমা শহরের পুলিশ কর্মকর্তা। এখানকার অনর্থক ও নগণ্য স্বভাবের মানুষদের ইউরোপ-বিরোধী চেতনা ছিল খুবই অপ্রীতিকর। দাঙ্গা বাঁধানোর মতো সাহস কারো ছিল না, তবে কোনো ইউরোপীয় নারী একা একা বাজারের মধ্য দিয়ে গেলে কেউ হয়তো তার পোশাকে পানের পিক ছিটিয়ে দিতে চাইত। একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে আমি ছিলাম তাদের সুস্পষ্ট লক্ষ্য এবং নিরাপদ সুযোগ পেলে তারা আমাকে উত্যক্ত করতে ছাড়ত না।
ফুটবল খেলার মাঠে চতুর কোনো বার্মিজ আমাকে ল্যাং মারলেও রেফারি (অন্য একজন বার্মিজ) দেখেও না দেখার ভান করত। উপস্থিত দর্শকেরা ভয়ঙ্কর হাসিতে চিৎকার করে উঠত। একাধিকবার এ রকম ঘটনা ঘটেছে। সবখানে অবজ্ঞা ও বিদ্রুপকারী হলদে-মুখো যুবকদের সাথে দেখা হয়ে যেত। নিরাপদ দূরত্বে থেকে তারা আড়ালে-আবডালে ঠাট্টা করত। অবশেষে এসব বিষয় আমার স্নায়ু পীড়ার কারণ হত। এদের মধ্যে তরুণ বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ছিল সবচেয়ে খারাপ। শহরে তাদের সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ইউরোপীয়দের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা ছাড়া তাদের কারোর আর কোনও কাজ ছিল বলে মনে হয়নি।
পুরো ব্যাপারটিই ছিল বিভ্রান্তিকর এবং বিরক্তিকর। সাম্রাজ্যবাদ একটি মন্দ বিষয়- ইতোমধ্যেই আমি মনস্থির করে নিয়েছিলাম যে, যত তাড়াতাড়ি এই চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে আমি বেরিয়ে আসতে পারব ততই মঙ্গল। অবশ্যই, তাত্ত্বিকভাবে এবং গোপনে আমি ছিলাম বার্মিজদের পক্ষে এবং তাদের সবাই উত্পীড়ক ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। যে চাকুরিটা আমি করতাম, সেটিকে কতখানি ঘৃণা করতাম তা বলে বোঝানো হয়তো সম্ভব নয়। সেরকম চাকুরিতে সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের অপকীর্তি খুব কাছ থেকে অবলোকন করতে হয়। ধূসর-রঙা আতঙ্কিত মুখাবয়বের দীর্ঘকাল কারাভোগী আসামিদের এবং কোমরে বাঁশের ডাণ্ডা পিটুনির আঘাতপ্রাপ্ত ভীতু কয়েদিদের জড়ো করে পুতিগন্ধময় কারাগারে ঠাসাঠাসি করে বেঁধে রাখা হত। এইসব দৃশ্য আমার মধ্যে তীব্র এক অপরাধবোধের সৃষ্টি করত। কিন্তু এ বিষয়ে আমার কিছুই করার সাধ্য ছিল না। আমি ছিলাম তরুণ এবং মধ্যম শিক্ষিত। পূর্বাঞ্চলে আমার মতো অনেক ইংরেজেরই এরকম অবস্থা ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ক্রমে বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে কি-না তা আমি জানতাম না। তাদের সরিয়ে দেয়াটা কতটা যুক্তিগ্রাহ্য সেসব জানার চেষ্টাও আমি করিনি। এই সাম্রাজ্যকে স্থানচ্যুত করতে চাওয়া নবীন সাম্রাজ্যগুলোর চেয়ে এটি অনেক ভালো কি-না, এ বিষয়েও আমার ধারণা ছিল না। যে সাম্রাজ্যের আমি চাকুরি করছি তার প্রতি ছিল আমার একরাশ ঘৃণা এবং আমার কর্তব্যপালনকে দুঃসহ করে তোলা ইতর-প্রাণীদের প্রতি আমার ছিল ক্ষোভ। এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মনের এককোণে আমি ব্রিটিশ শাসনকে একটি অলঙ্ঘনীয় উত্পীড়নকারী হিসাবে ভাবতাম, যেন চিরকালের তরে পদানত সাধারণ জনগণের ইচ্ছাশক্তিকে তারা কঠোর হাতে দমন করছিল। আবার এটাও ভাবতাম যে, কোনো বৌদ্ধ পুরোহিতের ভুঁড়িতে বেয়োনেট চালানো বিশ্বে সেরা আনন্দের বিষয় হবে। এই ধরনের অনুভূতি সাম্রাজ্যবাদেরই কুফল বলা চলে। যদি পারেন কোনো ফিরিঙ্গি অফিসারকে কাজের অবসরে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।
একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল যা পরোক্ষভাবে আমাকে জ্ঞানচক্ষু খুলে দিল। এটি ছিল খুবই ছোট একটি ঘটনা। তবে সাম্রাজ্যবাদের আসল প্রকৃতি সম্পর্কে আমার পূর্ব ধারণা থেকেও এটি আরও স্পষ্ট আভাস দিল- উত্পীড়ক শাসককূলের নীতির আসল অভিপ্রায় বিষয়ে। একদিন ভোরবেলা শহরের অপর প্রান্তের একটি থানার সাব-ইন্সপেক্টর আমাকে টেলিফোন করে জানালো, একটি হাতি বাজারে তাণ্ডব চালাচ্ছে। আমি কি দয়া করে এসে এ ব্যাপারে দ্রুত একটা কিছু করব? আমি কী করতে পারি তা আমি জানতাম না, কিন্তু আমি দেখতে চেয়েছিলাম কী ঘটছে। আমি একটি টাট্টুঘোড়ায় চড়ে যাত্রা শুরু করলাম। আমি আমার পুরানো ৪৪ উইনচেস্টার রাইফেলটি হাতে নিলাম। একটি হাতিকে মারার জন্য এটা খুব ছোট হলেও আমি ভাবলাম হাতিটিকে সন্ত্রস্ত করতে রাইফেলের গুলির আওয়াজটি ফলপ্রসূ হতে পারে। পথিমধ্যে অসংখ্য বর্মিরা আমাকে থামিয়ে হাতির কীর্তিকলাপের কথা বলেছিল। ওটি কোনো বন্য হাতি নয়, পোষা একটি হাতি যা মত্ত হয়ে উঠেছিল। হাতিটাকে শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছিল। পোষা হাতি মত্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে এভাবেই তাদের বেঁধে রাখা হয়। কিন্তু আগের রাতে হাতিটি শিকল ছিঁড়ে পালিয়ে যায়। ওরকম বেপরোয়া সময়ে মাহুতই ছিলেন একে শান্ত করার মতো একমাত্র ব্যক্তি। সে প্রাণীটির খোঁজে ছুটে বেরিয়েছিল কিন্তু ভুল রাস্তায় এগোনোর কারণে সে হাতিটি থেকে প্রায় বারো ঘণ্টা দূরে অবস্থান করছিল। সকালবেলায় আচম্বিতে হাতিটা পুনরায় শহরে আবির্ভূত হয়।
বর্মি জনগণ নিরস্ত্র ছিল বিধায় খুবই বিপন্ন বোধ করছিল। হাতিটা ইতোমধ্যে অনেকের বাঁশের কুঁড়েঘর ধ্বংস করেছে, একটি গরু মেরে ফেলেছে এবং কয়েকটি ফলের দোকানে হামলে পড়ে ফলের মজুদ সাবাড় করেছে। মিউনিসিপ্যালিটির একটি ময়লা ফেলার গাড়িতে হাতিটি হামলা চালালে গাড়ির ড্রাইভার প্রাণভয়ে লাফ দেয় এবং পালিয়ে যায়। এরপর হাতিটা গাড়িটাকে উল্টে ফেলে দিয়ে ওটার ওপর সহিংসতা চালায়। হাতিটি যে স্থানে দেখা গেছে সেখানেই বার্মার একজন সাব-ইনস্পেক্টর কয়েকজন কনস্টেবল নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। এলাকাটি ছিল অত্যন্ত দারিদ্র্য কবলিত। খাড়া পাহাড়ের জটিল ও সর্পিল বাঁকে বাঁকে তালপাতার ছাউনি দেওয়া বাঁশের তৈরি কুঁড়েঘরের সারি। আমার মনে আছে, সময়টি ছিল বর্ষা শুরুর দিকের একটি মেঘলা ও গুমোট সকাল। আমরা স্থানীয় লোকেদের হাতিটার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম। স্বভাবতই তাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পেতে ব্যর্থ হলাম।
প্রাচ্যের দেশগুলোতে সচরাচর এরকমই ঘটে। দূর থেকে শোনা একটি গল্প খুবই স্পষ্ট এবং তথ্যবহুল মনে হয় কিন্তু কাছে গেলে বিষয়টি ধোঁয়াশাপূর্ণ ও দুর্বোধ্য হয়ে যায়। কেউ হয়ত বলল হাতিটি এই দিকে গেছে, অন্যজন হয়ত আরেক দিক দেখিয়ে বলে, ওই পথে গেছে। এমনকি কেউ কেউ কোনও হাতির কথা শোনেনি বলেও দাবি করল। আমার মনে হলো পুরো গল্পটাই বোধহয় এক আজগুবি কাহিনীর ফুলঝুরি। এমন সময় একটু দূরে চেচামেচি শুনতে পেলাম। উচ্চনিনাদী, গলা ফাটানো একটা চিৎকার ভেসে এল, “দূরে যাও বাচ্চারা, এই মুহূর্তে এখান থেকে সরে পড়ো” একজন বৃদ্ধা হাতে একটা কঞ্চি নিয়ে একটি কুঁড়েঘরের কোণে এসে একদল ল্যাংটা ছেলেপুলেদের জটলাকে প্রচণ্ডভাবে তাড়াতে লাগলো। আরও কতিপয় নারী জিহ্বার দ্বারা টিকটক শব্দ এবং একই ধরনের চিৎকার করছিলেন। স্পষ্টতই ওখানে এমন কিছু ছিল যা শিশুদের দেখা উচিত নয়। আমি কুঁড়েঘরটির চারপাশে এক চক্কর ঘুরতে গিয়ে দেখলাম একটি মৃতদেহ হামাগুড়ি দেওয়ার ভঙ্গিতে কাদায় পড়ে আছে।
লোকটির গায়ের রঙ কালো, ভারতীয় দ্রাবিড় কুলি। প্রায় নগ্ন অবস্থায় পড়ে থাকা এ লোকটি বেশিক্ষণ আগে মারা গেছে বলে মনে হল না। লোকমুখে জানা গেল, হঠাৎ করেই হাতিটি কুঁড়েঘরের কোণটিতে এসে লোকটিকে শুড় দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে। তারপর অতিকায় প্রাণীটি লোকটির মেরুদণ্ডে পায়ের চাপ প্রয়োগ করে একদম মাটিতে পিষে ফেলে। বর্ষাকাল বিধায় মাটিও ছিল নরম। কাদামাটিতে লোকটার মুখমণ্ডলের ছাপে এক ফুট গভীরতার কয়েক ফুট দীর্ঘ একটি গর্ত হয়ে গিয়েছে। একপাশে মর্মান্তিকভাবে মাথা মুচড়ে দুই হাত ক্রুশবিদ্ধ ভঙ্গিতে লোকটা উপুড় হয়ে পড়ে আছে। কর্দমাক্ত মুখমণ্ডল, বিষ্ফোরিত চোখ আর অসহ্য যন্ত্রণার অভিব্যক্তিতে দাঁত খিচুনি দিয়ে পড়ে আছে লোকটা। (দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, মৃত ব্যক্তিদের খুবই নীরব এবং শান্ত দেখতে হয়- একথা আমাকে কখনো বলবেন না। বরং আমার দেখা অধিকাংশ শবদেহই দেখতে নারকীয় ছিল)।
খরগোশের শরীর থেকে নিপুণভাবে চামড়া তুলে ফেললে যেমন দেখায়, বিশালাকার জন্তুটির পায়ের রগড়ানিতে লোকটির পিঠের চামড়াও তেমন দেখতে হয়েছিল। মৃত লোকটিকে দেখার সাথে সাথে আমি একটি হাতি মারা রাইফেল নিয়ে আসার জন্য কাছের এক বন্ধুর বাড়িতে আর্দালিকে পাঠালাম। আমি টাট্টু ঘোড়াটিকে আগেই ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলাম পাছে এটি ভয়ে পাগল হয়ে যাবে এবং হাতির গন্ধ পেয়ে আমাকে ফেলে দিতে পারে। অল্প কয়েক মিনিটের মধ্যে আর্দালি একটি রাইফেল এবং পাঁচটি কার্তুজ নিয়ে ফিরে এলো। এরই মধ্যে কিছু বর্মি এসে আমাদের জানালো, হাতিটি মাত্র কয়েকশ গজ দূরের নিচের দিকে ধানক্ষেতে রয়েছে।
কার্যত আমি সামনে এগোতে শুরু করার সাথে সাথে এলাকার ঘরবাড়ি থেকে সব লোক হুড়মুড় করে বের হয়ে এসে আমাকে অনুসরণ করল। তারা রাইফেলটি দেখেছিল এবং সবাই উল্লসিত হয়ে চিত্কার করছিল যে আমি হাতি শিকার করতে যাচ্ছি। হাতিটা যখন তাদের বাড়িঘর তছনছ করছিল তখন তারা হাতিটার প্রতি খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। কিন্তু এখন তাকে গুলি করা হবে তা ভিন্ন ছিল। এখন হাতি শিকার করা হবে জেনে সবাই আগ্রহ ফিরে পেয়েছে। বিষয়টি তাদের কাছে কিছুটা মজাদার ছিল, যেমনটা ইংরেজদের কাছেও হবে। তাছাড়া, তারা হাতিটার মাংস নিতে ইচ্ছুক। বিষয়টি আমাকে মৃদু অস্বস্তিতে ফেলল। হাতিটাকে হত্যা করার কোনো অভিপ্রায় আমার ছিল না। প্রয়োজনে নিজেকে রক্ষা করার তাগিদ থেকেই নিছক আমি রাইফেলটি আনতে পাঠিয়েছিলাম। এভাবে একদল লোক পিছু নিলে আত্মসংযম হারিয়ে ফেলা স্বাভাবিক।
কাঁধে রাইফেল নিয়ে আমি পাহাড় বেয়ে নেমে এলাম, নিজেকে বোকা অনুভব করে বোকার মতো তাকাচ্ছিলাম। ক্রমবর্ধমান মানুষের ভীড় আমার পায়ে পায়ে ধাক্কা খাচ্ছে। নিচে, কুঁড়েঘরগুলো থেকে আরও দূরে প্রথমেই পাথুরে রাস্তা পড়ে। এরপর হাজার গজ এলাকা জুড়ে পরিত্যক্ত কর্দমাক্ত ধানক্ষেত। তখনও চাষ দেয়া হয়নি, তবুও মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিপাতের আর্দ্রতার ফলে জন্ম নেয়া মোটা একধরনের ঘাসে ছেয়ে আছে স্থানটি। হাতিটা রাস্তা থেকে আট গজ দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল, তার বাম পাশটা আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম। ওটা নিকটবর্তী ভীড়ের প্রতি বিন্দুমাত্র খেয়াল করছিল না। ঘাসের গুচ্ছ ছিঁড়ে ছিঁড়ে তুলে, হাঁটুতে ঝেড়ে পরিষ্কার করে হাতিটা তার মুখের ভেতর চালান করে দিচ্ছিল। আমি রাস্তায় থেমে গেলাম। হাতিটাকে দেখা মাত্রই আমি স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলাম, ওটাকে গুলি করা উচিত হবে না। একটি সচল হাতিকে গুলি করে হত্যা করা মারাত্মক ব্যাপার। বিশাল এবং ব্যয়বহুল কোনো যন্ত্রপাতি ধ্বংস করার সাথে এটাকে তুলনা করা যায়। সম্ভব হলে এ রকম একটি হত্যাকাণ্ড এড়িয়ে যাওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। এইটুকু দূরত্বে শান্তিপূর্ণভাবে ঘাস মুখে পুরে খেতে থাকা হাতিটাকে গরুর চেয়ে বেশি বিপজ্জনক দেখাচ্ছিল না।
আমি তখন ভেবেছি এবং এখনও মনে করি, হাতিটার উন্মত্ত আবেশ ইতোমধ্যেই থেমে গিয়েছিল। সেক্ষেত্রে ওটার মাহুত ফিরে এসে তাকে আটক না করা পর্যন্ত হাতিটা নিছক নিরীহভাবে ঘুরে বেড়াবে। তাছাড়া আমি অন্তত তাকে গুলি করতে চাইনি। হাতিটা ফের অসভ্য হয়ে ওঠে কি-না দেখার জন্য আমি কিছুক্ষণের জন্য ওটার ওপর নজরদারী করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভাবলাম এরপর বাড়ি ফিরে যাব। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমি চারপাশে তাকালাম সেই ভিড়ের দিকে যারা আমাকে অনুসরণ করেছিল। কিন্তু ওই মুহূর্তেই আমাকে ঘিরে এগিয়ে আসা চারপাশের জনতার মাঝে চোখ বুলিয়ে নিলাম। দেখি বিশাল জনতার সমাবেশ, কম করে হলেও দুই হাজার এবং প্রতি মিনিটে আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। দীর্ঘ পথের উভয় পাশ দখল করে আছে এই জনতার ভিড়। চটকদার সব পোশাক পরা ভীরু চেহারার মানুষের মহা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম- এইটুকু মজা পাওয়ার জন্য সবাই খুশিতে উতলা। সবাই নিশ্চিত যে হাতিটাকে গুলি করা হবে। বাজীকরের খেলা দেখার মতো আগ্রহ নিয়ে তারা আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারা আমাকে পছন্দ করেনি কিন্তু আমার হাতে থাকা জাদুকরী রাইফেলটির কারণে সেই মুহূর্তে ওদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিলাম। এবং অপ্রত্যাশিতভাবে আমি অনুভব করলাম, হাতিটাকে গুলি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
উপস্থিত জনতা আমার কাছে যেরকম আশা করছিল, আমাকে সেরকমই করতে হয়েছিল। আমি স্পষ্ট অনুভব করতে পারলাম, তাদের দুই হাজার ইচ্ছাশক্তি মিলে আমাকে অপ্রতিরোধ্যভাবে চাপ দিচ্ছে। এবং রাইফেল হাতে নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মুহূর্তে প্রাচ্যে শ্বেতাঙ্গ মানুষদের আধিপত্যের অসারতাকে আমি প্রথম উপলব্ধি করলাম। এই আমি, অস্ত্রধারী সাদা চামড়ার মানুষটি স্থানীয় নিরস্ত্র জনতার সামনে আপাতদৃষ্টিতে সেই নাটকের মুখ্য অভিনেতা হিসেবে উদিত হয়েছি। কিন্তু বাস্তবে আমি ছিলাম পিছনের ভীরু মুখগুলোর অভিলাষ মেটাতে ইতস্তত ঠেলে দেওয়া বিচারবুদ্ধিহীন এক পুতুল। আমি সেই মুহূর্তে উপলব্ধি করেছি, শ্বেতাঙ্গ মানুষ অত্যাচারী হয়ে ওঠার ফলে তার নিজের স্বাধীনতাকেও সে বিনষ্ট করে। তাকে প্রচলিত রীতির একজন সাহেবের মতো নিজেকে এক ধরনের ফাঁপা পুতুল হিসেবে জাহির করতে হয়। কেননা তাদের শাসনের প্রধান শর্তই হল সারাজীবন শুধু স্থানীয় লোকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা এবং এরকম প্রতিটি সংকটে স্থানীয়দের আশানুরূপ কাজ করে যাওয়া। তাকে একটি মুখোশ পরতে হয় এবং তার মুখটিও মুখোশের সাথে মানানসই হয়ে ওঠে। হাতিটিকে আমার গুলি করতে হয়েছিল। রাইফেলটি আনার সময়েই আমি গুলি করার জন্য নিজেকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করেছিলাম। একজন সাহেবকে অবশেষে সাহেবের মতোই আচার-আচরণ রপ্ত করতে হয়। নিজের মনকে জানার জন্য তাকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দেখাতে হবে এবং নির্দিষ্ট কিছু কাজ করতে হবে। দুই হাজার লোক পরিবৃত হয়ে সারাটি পথ আমি রাইফেল হাতে করে এলাম। এরপর কিছু না করাটা একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। জনতা আমাকে দেখে হাসবে। জনতা আমাকে দেখে হাসবে। এবং আমার পুরো জীবন তথা প্রাচ্যে প্রতিটি শ্বেতাঙ্গ মানুষের জীবন একটি দীর্ঘ সংগ্রামেরই নামান্তর, কোনও হাস্যকর বিষয় নয়।
কিন্তু আমি হাতিটাকে গুলি করতে চাইনি। আমি লক্ষ্য করছিলাম হাতিটি ব্যস্ততম ঠাকুরমাসুলভ ভঙ্গিমায় ঘাসের গোছাগুলোকে হাঁটুতে ফেলে ঝাড়ছিল। আমার মনে হল প্রাণীটাকে গুলি করার বিষয়টি হত্যা হিসেবেই পরিগণিত। পশু শিকার বিষয়ে সেই বয়সে আমি মোটেই খুঁতখুঁতে ছিলাম না। তবে আমি কখনো হাতি শিকার করিনি এবং সেরকম কোনো ইচ্ছেও ছিল না। এত বৃহৎ একটা প্রাণী হত্যা চিরকাল নিন্দনীয় বলেই বিবেচিত। তাছাড়া প্রাণীটার স্বত্বাধিকারীর কথাও বিবেচনায় রাখা দরকার। একটি জীবিত হাতির কম করে হলেও একশত পাউন্ড মূল্য। আর মৃত হাতির দাঁত থেকে বড়জোর পাঁচ পাউন্ড পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু আমাকে দ্রুত কাজে নেমে পড়তে হল বিষয়ে। অভিজ্ঞ মনে হওয়া কতিপয় বার্মিজদের দিকে আমি ঘুরে তাকালাম, শুরু থেকেই তারা এখানে আছে। হাতিটা কেমন আচরণ করছিল -এ বিষয়ে তাদের জিজ্ঞেস করলাম। তারা সবাই একই কথা বলল : ওটাকে ওখানে একা থাকতে দিলে সে আপনার দিকে মনোযোগ দিবে না কিন্তু ওটার খুব কাছে গেলে আক্রমণও করে বসতে পারে। এই মুহূর্তের কর্তব্যের বিষয়ে আমি পুরোপুরি সচেতন ছিলাম। আমাকে হাতিটার পঁচিশ গজের মধ্যে প্রবেশ করে তার আচরণ পরীক্ষা করতে হবে। সে আক্রমণ করলে আমি গুলি ছুড়তে পারব। যদি সে আমার প্রতি কোনো আগ্রহ না দেখায় তবে মাহুতের ফিরে আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশে রাখাই নিরাপদ হবে। তবে আমি এও জানতাম যে আমি ওরকম কিছু করব না। রাইফেল চালনায় আমি অতটা অভিজ্ঞ ছিলাম না, আর মাটি এতটাই নরম ছিল যে প্রতি পদক্ষেপেই তা দেবে যাচ্ছিল। হাতিটি আক্রমণ করার পর যদি আমার গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হত তখন আমার অবস্থা স্টিমরোলারের নিচে চাপা পড়া ব্যাঙের মতো হতো। কিন্তু তখন পর্যন্তও আমি আমার সাদা চামড়ার কথা ভাবিনি, শুধু আমার দিকে সাগ্রহে তাকিয়ে থাকা ভীরু চেহারার বর্মিদের কথা ভাবছিলাম। সেই মুহূর্তে জনতা আমাকে লক্ষ্য করছে। স্বাভাবিকভাবেই আমি ভয় পাইনি তবে একা থাকলে হয়তো পেতাম। একজন শ্বেতাঙ্গকে অবশ্যই স্থানীয়দের সামনে ভয় পাওয়া চলবে না। এবং সাধারণত সেকারণেই এই শর্মা শঙ্কিত নন। আমার মনে একটাই ভয় ছিল, যদি কোনো ভুল হয়ে যায় তাহলে সেই দুই সহস্র বর্মি জনগণ আমাকে হাতির তাড়া খেতে, ধরা পড়তে এবং পদদলিত হতে দেখবে। এরপর টিলার উপর পড়ে থাকা ওই ভারতীয় লোকটির মতো হাসতে হাসতে মরতে দেখবে। এরকম কিছু একটা ঘটলেই তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো হাসবে। এটা কখনই হতে দেওয়া যাবে না। সুতরাং আমার তখন একটাই পথ খোলা ছিল।
আমি ম্যাগাজিনে গুলি ভরলাম এবং আরও ভালো লক্ষ্য স্থির করতে রাস্তায় শুয়ে পড়লাম। জনতা খুব নিশ্চল হয়ে পড়ল এবং অবশেষে নাট্যমঞ্চের যবনিকা উঠতে দেখে অসংখ্য গলা থেকে গভীর, নিচু, সুখী নিঃশ্বাসের সাথে একটি চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মোটের উপর তারা তাদের ক্ষণিকের আমোদ উপভোগ করতে উন্মুখ। জার্মানিতে তৈরি সুন্দর রাইফেলটির দৃষ্টি ফেলার স্থানটিতে একটি লক্ষ্যবিন্দু নির্দেশিত ছিল। তখন জানতাম না, কোনো হাতি শিকারের সময় দুই কানের ফুটো বরাবর ধাবমান কাল্পনিক দণ্ডটিতে গুলি করতে হয়। হাতিটি পাশ ফিরে থাকার কারণে ওটার কানের গর্ত বরাবর নিশানা স্থির করলাম। আসলে আমি ওটার কানের কয়েক ইঞ্চি সামনে রাইফেল তাক করলাম, ভেবেছিলাম মস্তিষ্ক আরও সম্মুখভাগে থাকবে। ট্রিগার টানার পর আমি কোনো প্রকারের বিকট আওয়াজ বা ধাক্কা অনুভব করিনি। নিশানা ব্যর্থ হলেই এরূপ হয়- তবে আমি জনতার মধ্য থেকে উল্লাসের নারকীয় গর্জন শুনতে পাই। সেই মুহূর্তে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে কেউ ভাবতে পারে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাতিটার মধ্যে একটি রহস্যময় ভয়ানক পরিবর্তন এসেছে। প্রাণিটা একটুও আন্দোলিত হয়নি বা পড়েও যায়নি কিন্তু তার শরীরে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। তাকে হঠাৎ ছিন্নভিন্ন, সঙ্কুচিত, প্রচণ্ড বৃদ্ধ দেখাচ্ছিল। যেন বুলেটের ভয়ঙ্কর আঘাত তাকে ভূপাতিত না করেই অসাড় করে দিয়েছে। পাঁচ সেকেন্ড সময়কে মনে হয়েছিল দীর্ঘ সময়। অবশেষে, আমি সাহস করে বলতে পারি- হাতিটা হাঁটুমুড়ে বসে পড়ল। তার মুখ থেকে লালা গড়াচ্ছিল। মনে হল এক প্রচণ্ড বার্ধক্য তাকে গ্রাস করে ধরেছে। হাতিটাকে হাজার বছর বয়সী মনে হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। একই নিশানায় আমি আবার গুলি ছুড়লাম। আমার দ্বিতীয় গুলিতে হাতিটা পড়ে না গিয়ে মরিয়া হয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তবে তার মাথাটা নিম্নমুখী হয়ে ছিল, পাগুলো কাঁপছিল। আমি তৃতীয়বারের মতো গুলি ছুড়লাম। এটা ছিল তার মরণ গুলি। এক তীব্র যন্ত্রণায় তার সারা শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে তার পা থেকে অবশিষ্ট শক্তিটুকুও কেড়ে নিল।
কিন্তু পড়ে যাওয়ার সময় মনে হল সে আরেকবার ওঠার চেষ্টা করছিল। কারণ তার পিছনের পা অসাড় হয়ে যাবার পর মনে হচ্ছিল যেন একটা পাহাড় ধ্বসে পড়ছে আর শুড়টা একটি গাছের মতো আকাশের দিকে পৌঁছেছে। প্রাণীটা শুধুমাত্র একবারই হুংকার ছাড়ল। তারপরে তার পেটটা আমার দিকে তাক করে হাতিটা ধরাশায়ী হলো। পতনের ফলে মাটি এমনভাবে কেঁপে উঠল যে, রাইফেল নিয়ে আমি যেখানে শুয়ে ছিলাম সেই স্থানটিও কেঁপে উঠল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। আমাকে পাশ কাটিয়ে বর্মি জনতা কাদার উপর দিয়ে দৌড়ে নামতে লাগল।
এটা নিশ্চিত যে, হাতিটা আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না, তবে প্রাণীটা তখনও মরেনি। দীর্ঘ ঘর্ঘর শব্দে সে খুব ছন্দময়ভাবে শ্বাস নিচ্ছে। তার পার্শ্বদেশে বিশাল ঢিবির মতো ফুলে ওঠা অংশটি যন্ত্রণাকাতরভাবে ওঠা-নামা করছে। তার মুখ হা করে খোলা থাকার ফলে ফ্যাকাশে লালবর্ণ গলার কন্দরের মধ্যে অনেক নিচ অব্দি আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। প্রাণিটার মৃত্যুর জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম, কিন্তু তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি তখনও শিথিল হয়নি। অবশেষে আমি অনুমানে তার হৃৎপিণ্ড বরাবর আমার অবশিষ্ট দুটি গুলি ছুড়ে মারলাম। হাতিটার বুক থেকে লাল মখমলের মতো ঘন রক্ত গড়াতে লাগল, কিন্তু তবুও সে মরেনি। গুলির আঘাতে তার বিশাল দেহটা একটুও নড়ল না, বিরতিহীনভাবে যন্ত্রণাদায়ক শ্বাসক্রিয়া তখনো চলছিল।
প্রাণীটা প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়ে খুব ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিল। আমার থেকে দূরবর্তী এমন এক জগতে সে পাড়ি দিচ্ছিল যেখানে কোনোরকম বুলেটই ওর আর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমি অনুভব করলাম এই তীক্ষ্ণ চিৎকারের অবসান ঘটানো উচিত। ওখানে পড়ে থাকা যুগপৎ চলতশক্তিহীন এবং মরতে অসক্ষম সেই বিশাল প্রাণীটিকে ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছিল। আমি আমার ছোট রাইফেলটি আনিয়ে প্রাণীটির হৃৎপিণ্ড এবং গলার নিচ বরাবর একের পর এক গুলি ছুঁড়তে লাগলাম। এতগুলো গুলি কোনো ছাপ ফেলতে পারল বলে মনে হল না। তার নিদারুণ যন্ত্রণাদায়ক শ্বাসক্রিয়া তখনো ঘড়ির টিক টিক শব্দের মতো চলছিল।
অবশেষে আমি আর সহ্য করতে না পেরে ওখান থেকে চলে এলাম। পরে জেনেছি হাতিটা আরো আধঘণ্টা পর প্রাণ ত্যাগ করেছে। আমি ওখান থেকে সরে আসার আগেই বার্মিজরা ঝুড়ি ও দা নিয়ে এসে জড়ো হয়েছিল। পরে শুনেছিলাম, বিকেলের আগেই তারা হাতিটার কঙ্কাল ব্যাতিত সবকিছুই কেটে কুড়িয়ে নিয়েছিল।
পরে অবশ্য হাতি শিকারের ব্যাপারটি নিয়ে অন্তহীন আলোচনা শুরু হয়। হাতিটার মালিক খুবই ক্রোধান্বিত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু শুধুমাত্র ভারতবর্ষীয় লোক হওয়ার কারণে সে কিছুই করতে পারেনি।
তা ছাড়া, আইনগতভাবে আমি সঠিক কাজটি করেছি। কারণ একটি পাগলা হাতিকে যদি তার মালিক নিয়ন্ত্রণ করতে অসমর্থ হয় তাহলে ওটাকে পাগলা কুকুরের মতোই হত্যা করা উচিত।
ইউরোপীয়দের মধ্যে এ বিষয়ে মতভিন্নতা দেখা গিয়েছিল। প্রবীণেরা বলছিল, আমি সঠিক কাজটি করেছি আর তরুণেরা বলছিল, একটি কুলিকে হত্যার দায়ে এত বড়ো একটা পশুহত্যা করা খুবই লজ্জাজনক। কারণ ভারতীয় নিচু-শ্রেণির একটি আদিবাসী কুলির চেয়ে একটি হাতির মূল্য অনেক বেশি।
হাতিটা কুলিটিকে হত্যা করেছিল বলে আমি খুব সন্তুষ্ট ছিলাম কারণ ঐ ব্যাপারটিই আমাকে হাতিটাকে হত্যা করার অজুহাতকে বৈধতা প্রদান করেছে। আমি আজো ভাবি কেউ কী বুঝতে পেরেছিল যে, অন্যদের কাছে আহাম্মক প্রমাণিত হওয়া থেকে নিজেকে রেহাই দিতেই হাতিটাকে আমি গুলি করেছিলাম।









