চরিত্রহীন পড়ুয়ার শরৎপাঠ

স্বপন নাথ
০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২০ আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২০

সাহিত্যে ‘চরিত্রহীন’ ও ‘বেবুশ্যা (বেশ্যা)’ শব্দের প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাভাষী মানুষের কাছে জনপ্রিয় অনেক শব্দের মধ্যে এ শব্দ দুটি অত্যধিক জনপ্রিয়। কারণ ব্যক্তিকে অপমান বা কথায়-কথায় বা গালি হিসেবেও এগুলো প্রয়োগ করা হয়। কেউ অবনমিত বা অমর্যাদার ব্যক্তি না হলেও এসব গালি বা খিস্তি বিবেচনায় এসব শব্দ ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। এ-রকম শব্দগুলো যে বর্ণ-বিভাজিত সমাজের উৎসজাত, তা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্য পাঠ করলে অনুধাবন করা যায়। তবে নেতি-অর্থে ব্যবহৃত এসব প্রত্যয় চলমান রয়েছে। এখনও অধরা রয়ে গেল এর মীমাংসা।

'চরিত্রহীন' উপন্যাস প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১৭ সালে। এর আগে যমুনা পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। তবে সময় ও সামাজিক পরিস্থিতি সাপেক্ষে এ-উপন্যাসের বিষয়বস্তু ব্যতিক্রম। যে কারণে এর প্রকাশনা নিয়ে শরৎচন্দ্রের সন্দেহ ছিল। অন্য কিছু হিসেবে না নিলেও উপন্যাসে সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে বার্তা স্পষ্ট। সেকালে বাঙালিসমাজ উপন্যাসের বক্তব্য সহ্য করবে কিনা, এমন সংশয় ছিল তার মনে। ভারতবর্ষ পত্রিকায় পাণ্ডুলিপি পাঠালেও তা গ্রহণ করা হয়নি। এরপর শরৎচন্দ্র প্রমথনাথ ভট্টাচার্যকে চিঠি লিখে বলেন, "প্রমথ, হীরাকে কাচ বলিয়া ভুল করিলে ভাই। অনেক বিশেষজ্ঞ ও-বইটা পড়িয়া মুগ্ধ হইয়াছিল। ইহার উপসংহার জানিতে চাহিয়াছ, এ একটা 'scientific psycho and eathical novel' আর কেউ এমন করিয়া বাঙলায় লিখিয়াছে বলিয়া জানি না। এইতেই ভয় পাইলে ভাই? কাউন্ট টলস্টয়ের রিসরেকশন পড়েছ কি?" অজিত কুমার ঘোষও বলেছেন, ‘‘চরিত্রহীনে’র পাণ্ডুলিপি এবং ইহার প্রকাশিত অংশ পড়িয়া তৎকালীন পাঠক-সমাজে আতঙ্কজনক আলোড়ন শুরু হইয়া গিয়াছিল।’’

এ-উপন্যাস রচনার আগে শরৎচন্দ্র বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য পাঠ করেছেন। বিশ্বসাহিত্যের সাথেও তার যোগাযোগ ছিল। কৃষ্ণকান্তের উইল পড়ার পর তার প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানিয়েছিলেন, রোহিণীর এমন মৃত্যু তাকে আহত করেছে। বিশেষত বিষবৃক্ষ ও চোখের বালি উপন্যাসে নারীচরিত্রের অবজ্ঞা ও অবনমনে তিনি কষ্ট পেয়েছেন। ফলে তিনি ওই কাঠামোর বাইরে যাবার চেষ্টা করেছেন। বের হতে পেরেছেন কিনা? যে প্রশ্ন থেকেই যায়। এর প্রমাণ হলো সাবিত্রী, কিরণময়ী ও সরোজিনী। স্বীকার করছি, তিনি সাবিত্রী ও কিরণময়ীকে হত্যা করেননি বা আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেননি। কিন্তু নির্মিত অবস্থান থেকে বিচ্যুত করেছেন। অবশেষে তারা তো স্বাভাবিক জীবনে ছিল না। তা হলে ভাবতে থাকি—চিন্তারেখায় বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎ কী সমান্তরাল। এটাও সত্য সমাজস্থ এমন সমস্যায় একীভূত থেকে বৃত্ত থেকে বের হওয়া প্রায়-অসম্ভব।

স্মরণীয় ভারতবর্ষ তখন ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার দাবি ও মুক্তিসংগ্রামে মুখর বলা যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাধিত হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে তার লেখা থেকেই বোঝা যায়, কী বার্তা তিনি দিতে চয়েছেন; তা অংশত স্পষ্ট না হলেও আমরা অবগত। 

শরৎ জীবনী থেকেই স্পষ্ট যে, তার জন্ম প্রথাগত ব্রাহ্মণ পরিবারে। তবে তিনি আচারাদি পালন করতেন না। স্মরণ রাখতে হয়, একটি স্ববিরোধী সমাজে সামন্ত, অভিজাত শ্রেণি বঞ্চিত, লাঞ্ছিতদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতো। তা হতে পারে মনোরঞ্জন, বিনোদন বা শ্রমের কোনও কাজে। বিশেষত নারীর কোনও সামাজিক মর্যাদা ছিল না। যা কিছুতে নিষেধ ছিল, সেসব কাজে অভিজাত শ্রেণি ছিল অগ্রণী। উল্লেখ্য যে, তাদের অপকর্মকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হতো না। ফলত তার কথাসাহিত্যে রূপায়ণ করেছেন এসব সামাজিক প্রসঙ্গ। যে কারণে দেড়শো বছর পরেও শরৎচন্দ্রকে অসাধারণ সাহসী লেখক বলেই মনে হয়। এমনকি এখনও যা আমরা বলতে পারি না, তা তিনি অবিচল বলেছেন। তিনি যেসব বিষয় খোলামেলা, সাবলীলভাবে সাহিত্যে উপস্থাপন করেছেন, এখনও তা বিরল। তার আগে-পরে কত সাহিত্য নিষিদ্ধ হয়েছে, তাও আমরা জানি।

তার লেখার দ্বৈত বৈশিষ্ট্য, গল্প বলার ধরন থেকে অনেকেই বলতে পারেন যে, শরৎচন্দ্র আর প্রয়োজন নেই। কিন্তু একটু বিরতি দিয়ে ভাবতে হয়। যেক্ষেত্রে তিনি সফল হয়েছেন, সাহিত্যে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তি-জীবনের পরিসর নির্মাণের যুদ্ধে। এজন্য কালান্তরেও তার সাহিত্য প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। দেড়শো বছরের ব্যবধানে কী অর্জিত হয়েছে। ভৌতকাঠামো, মুদ্রণ, প্রতিষ্ঠানের প্রসারতা, তথ্যপ্রবাহ, প্রযুক্তি, বিশ্বায়নের প্রভাব বেড়েছে তারই গ্রামীণসমাজে। মানুষ কতটুকু এগুলো তাতে। এ-প্রান্ত ও-প্রান্তের সংযোগ বিশ্বগ্রামের। হয়তো প্রযুক্তিতে কাল ব্যবধানের তুলনাই হয় না। এমন সময় আমরা চরিত্রহীন নিয়ে কথা বলছি। আবার ফিরে দেখি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নিজের কথা। ‘যে পরিবারে আমি মানুষ, সেখানে কাব্য উপন্যাস দুর্নীতির নামান্তর, সংগীত অস্পৃশ্য। সেখানে সবাই চায় পাশ করতে, এবং উকিল হতে।’ এমনকি এ উপন্যাস প্রকাশের পর তার নামের সাথে জুড়ে যায় চরিত্রহীন বিশেষণ। তিনি হয়ে গেলেন, ‘চরিত্রহীন শরৎচন্দ্র’। তবে তা সীমাবদ্ধ থাকলো বৃত্তাবদ্ধ বাঙালির উপহাসে। এ ছাড়াও গৃহদাহ, শ্রীকান্ত, শেষপ্রশ্ন, পথের দাবী পাঠে মনে হয় শরৎচন্দ্র সমকাল বিবেচনায় অসামান্য সাহসী এক কথাশিল্পী। চরিত্রহীন নামকরণেও রয়েছে তার সততার চিহ্ন।

এ-উপন্যাস প্রকাশের পর তৎকালীন সমাজে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। আমরা অনুমান করি এখনও চরিত্রহীন বিষয়ে রয়েছে জটিলতা ও সমস্যা। যা-ই হোক তার লক্ষ শুধু সংস্কারের প্রতিবাদ নয়; প্রচলিত বৃত্ত ভেঙে ফেলা। যে চিন্তা আবর্তিত হচ্ছে বিধবা, পরিত্যক্ত নারীর অবস্থান ও কলঙ্ক নিয়ে। এসব সমস্যাকে বিতর্কের টেবিলে নিয়ে আসা। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল—‘প্যারাডাইম শিফট’। এ প্রসঙ্গে দুর্গাপদ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘ঊনবিংশ শতাব্দী এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত গণিকাশ্রেণিকে যে ঘৃণা, রঙ্গতামাশা, অবজ্ঞার পীড়নে পর্যুদস্ত করে হীন প্রতিপন্ন করার প্রবণতা বর্ধিত হয়েছিল তা থেকে বাঙালি-মনস্কতা যেন একটু একটু করে নড়ে উঠছিল শরৎচন্দ্রের লেখা উপন্যাস থেকে। সতী-অসতীর ভাবনাকে নতুন দিকে মোড় ঘুরিয়ে সমাজে ঝড় তুলে দিয়েছিলেন ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।’’

উপেন্দ্র-সুরবালা, সতীশ-সাবিত্রী-সরোজিনী, হারান-কিরণময়ী-দিবাকর—এর মধ্য দিয়ে চরিত্রহীন উপন্যাসের আখ্যান বিস্তৃত হয়েছে। একে একে যুক্ত হয়েছে বিপিন, মোক্ষদা, জগৎতারিণী, বৈদ্যনাথ, বেহারী, জ্যোতিষ, শশাঙ্কমোহন। সতীশ-সাবিত্রীর সম্পর্ক এবং এর ওপর ভিত্তি করে সৃষ্ট কাহিনি প্রধান বলে মনে হয়। এখানে গৃহকর্মীর সাথে ভদ্রবেশী সতীশের প্রেম সম্পর্কে যা দেখানো হয়েছে, তা নতুন ছিল না। ‘কিরণময়ীর আগে তিনি যেসব নায়িকার চরিত্র অঙ্কন করিয়াছেন তাহারা নীরব দুঃখভোগী, অন্তর্দ্বন্দ্বে পীড়িত এবং সমাজের উদ্ধত দণ্ডের সম্মুখে নতশির।’ আখ্যানের মর্মার্থ অনুধাবনে আগমন ঘটে কিরণময়ীর। সাবিত্রী মাঝে মাঝে ফিরে এলেও নিষ্প্রভ রয়ে যায়।

শরৎচন্দ্রের লক্ষ ছিল সমাজে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির দাপট, প্রতাপের রাজপ্রাসাদ ভেঙে দেওয়া। অবশেষে কিন্তু সমাপ্তি ঘটেছে নৈতিক আদর্শের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। সামাজিক চাপ অস্বীকার করতে পারেননি। লক্ষ করি সাবিত্রী নামের মধ্যেই রয়েছে যে নীতিবোধের ইঙ্গিত। এ উপন্যাসে প্রশ্ন হলো—পাত্র-পাত্রীরা চরিত্রচ্যুত হয়েছে কোথায়। আসলে এখানে চরিত্রহীন নামকরণ হলেও হীনতার স্তরে কেউ নেই। প্রেমের সম্পর্ক, বা নরনারীর একত্রে অবস্থান স্পষ্ট হলেও বিচ্যুত হয়েছে কিনা তা অস্পষ্ট। কেবলই প্রেমের প্রতি আবেগ, ভক্তির কারণে চরিত্রহীন বলা যায় কিনা। আবার সকল প্রেমই ব্যর্থ হয়েছে এখানে। বিচ্ছিন্নতায় বরং শাস্তি পেয়েছে।

সমাজে যে উদ্দেশে চরিত্রহীন ভাবা হয়, তা আগেও হয়েছে। চরিত্রহীনতার বোধ ও ধারণাই হচ্ছে মৌল কথা। যে আতঙ্ক এ-উপন্যাস পাঠের প্রতিক্রিয়ায় লক্ষ করি। এর নিরীক্ষায় যদি মিশেল ফুকো বা দস্তয়েভস্কি তত্ত্ব বিবেচনা করি, তাহলে দেখব এখানে কেউ বিচ্যুত হয়নি। দৃশ্যমান এই কামনা-বাসনা, অনুভূতি, শৃঙ্খল, শৃঙ্গার ও শৃঙ্গারত্ব সবই জৈবজগতের সহজাত। কিন্তু কালক্রমে ব্যক্তি-এককের ইচ্ছা, অনিচ্ছা, কামনা, শৃঙ্গারবোধ বিমূর্ত কখনও মূর্ত এক ক্ষমতাকাঠামোর ভেতর ভুক্ত ও শাসিত হওয়া শুরু হলো। তখন ব্যক্তির অধিকার বিসর্জন দিতে হলো শাসন ও ত্রাসের কাছে; নিয়ন্ত্রণের কাছে। এমন কি মানুষের মনোদৈহিক সৌন্দর্য, লক্ষণ, পরিবর্তন, প্রকাশ সবই বন্দি হয়ে গেল নিয়মের ভেতর। এর সাথে যুক্ত হলো ক্ষমতার স্তরবিন্যাস। ফুকো দেখালেন, মানবসমাজের প্রেমও ওই ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে অগ্রাহ্য, বাতিল ও নিয়ন্ত্রণ হতে থাকে। যে ক্ষমতাকাঠামো শৃঙ্খলার নামে নিষ্ঠুরতা অনুমোদন করে। বস্তুত আমরা বলতে পারি না চরিত্রহীনতার আয়োজন সফল নাকি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ওই ত্রাসের সমাজকাঠামের মধ্যে কোনও সম্পর্কই অভ্যর্থিত হওয়ার কথা নয়। যেমন, বিধবা রমণীরা সমাজভুক্ত হলেও যেহেতু ক্ষমতাকাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন সেহেতু পরিত্যক্ত বলেই বিবেচিত হলো। এ উপন্যাসে লক্ষণীয় সমাজে তখন নিষ্ঠুরতা অনুমোদনের বাস্তবতায় মানুষের সদিচ্ছাও পরাজিত হয়েছে। এ নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধেই শরৎচন্দ্রের অবস্থান। কিরণময়ী সদম্ভে যখন বলে, "আমি ভগবান মানিনে, আত্মা মানিনে, জন্মান্তর মানিনে, স্বর্গ নরক ও-সব কিছুই মানিনে—ও সমস্তই ভুয়ো, একেবারে মিথ্যে। মানি শুধু ইহকাল, আর এই দেহটাকে।" এত দৃঢ়তা, সাহস কিরণময়ীর মধ্যে শরৎ আরোপ করেছেন—শুধু কথা আর কাহিনির জন্য নয়।

সতীশ, দিবাকর দৃঢ়, সক্রিয় পুরুষ হিসেবে নির্মিত হয়নি। তা ছাড়া পাঠকৃতি নির্মাণে বাঈজিগৃহ, নাচ, মদ্যপানের দৃশ্য, আড্ডা, প্রেমে জড়িত হওয়া, গৃহের বাইরে রাতযাপন, দূর নিবাসে প্রেমিক-প্রেমিকার একসাথে থাকা ইত্যাদি নির্ভার লেখক হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি। তাতে কোনও সংকোচ নেই। সাবিত্রী সতীশের ঘরে ঝিয়ের কাজ করলেও ছিল রুচিশীল ও উচ্চবংশীয়। বৈধব্য ও বিচ্ছিন্ন ছিল বলে তাকে বাইরে কাজ করতে হয়েছে। এ সূত্রে সতীশের ব্যক্তিগত ভালোমন্দও খোঁজ খবর রাখতো। এক পর্যায়ে সতীশের প্রতি সাবিত্রীর ভালোলাগা ও মায়া তৈরি হয়। তবে গৃহকর্মী হলেও সাবিত্রীর ছিল অসামান্য স্নিগ্ধতা। ওই গুণই তাকে সাবিত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। সতীশ ক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে সাবিত্রীর প্রতি। কিন্তু সতীশ সাবিত্রীর প্রতি সেভাবে সম্মান জানাতে পারেনি। সে সাবিত্রীর প্রতি প্রেমের আবেগ দেখিয়েছে; কিন্তু এগোতে পারেনি। মাদকাসক্তি, পতিতালয়ে যাতায়াত ইত্যাদিতে সতীশ যথেষ্ট উদার মনোভাবের পরিচয় দিয়েছে বটে; কিন্তু প্রতিদিন তার পূজা-আহ্নিক না দিলে চলে না। আবার এসব আচারিকতার জন্য সাবিত্রীসহ সকলেই সহায়তা করেছে। কিন্তু কোথা হতে বারবার জেগে ওঠে ছদ্মবেশী সততা ও সংস্কারের চর।

সতীশের দুঃখ, অসুস্থতায় সাবিত্রী রাত জেগে সেবা করেছে। সাবিত্রীর কারণেই সতীশের বাউন্ডুলে, অনিয়ন্ত্রিত জীবনে আসে স্থিতি। এ আখ্যানের অধিকাংশ জুড়ে আছে সতীশ-সাবিত্রীর সম্পর্ক ও টানাপড়েনের কথা। সতীশ স্বীকার করেছে, "কেন যে সাবিত্রী অবিশ্রাম আকর্ষণ করে, কেনইবা কাছে আসিলে এমন নিষ্ঠুর আঘাত করিয়া দূরে সরাইয়া দেয়, সেদিন সারা রাত্রি ধরিয়া ভাবিয়াও ইহার একটা অস্পষ্ট কারণও খুঁজিয়া পাইল না।"

সাবিত্রী যখন বিপিনকে মদ্যপ অবস্থায় তার বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে তখন মাদকাসক্ত সতীশের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। আসলে সাবিত্রী নিজেও ভালোবাসে সতীশকে; কিন্তু পেছনে তাড়া করে সংশয়। না হলে সতীশের বিয়ে বা অন্য কোনও নারীর প্রসঙ্গ এলে সাবিত্রীর কষ্ট পাবার কথা নয়। এক পর্যায়ে সতীশ সরোজিনীর সাক্ষাৎ এবং মিলনের লক্ষে উপেন্দ্র-র উদ্যোগে সাবিত্রী ভেতরে দগ্ধ হয়েছে। এ সময় সাবিত্রী যা বলেছে তা সতীশকে দূরে সরে যাওয়া অর্থে বলেনি; মূলত এতে প্রকাশিত হয়েছে সাবিত্রীর হৃদয়জ যন্ত্রণা। নিজেকে অপবিত্র আখ্যা দিলেও সে সতীশের কাছে থাকতে চায়নি। সতীশের দুর্বলতার কারণেই সাবিত্রী অজুহাতের দেওয়াল তুলেছে। বলেছে, ‘এই দেহটা আমার আজও নষ্ট হয়নি বটে, কিন্তু তোমার পায়ে দেবার যোগ্যতাও এর নেই। এই দেহ নিয়ে যে আমি ইচ্ছে করে অনেকের মন ভুলিয়েচি, এত আমি কোনোমতেই ভুলতে পারব না! এ দিয়ে আর যারই সেবা চলুক, তোমার পূজা হবে না।’ সতীশ সাবিত্রীর আত্মব্যাখ্যাকে বিশ্বাস না করলেও কোনও সক্রিয়তা ছিল না সবিত্রীকে কাছে রাখার। সমাজ সংস্কারের প্রতি আনুগত্য ছিল সাবিত্রীর, তবে ভালোবাসায় সে ছিল অবিচল।

সতীশ অবশেষে প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিজের স্বস্তি, শান্তি খুঁজে পেতে চেষ্টা করেছে; পাখির সুর, বন জঙ্গলের নান্দনিক পরিবেশে। অপরদিকে সাবিত্রী স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছে অনিশ্চিত জীবন। অন্যদিকে অসামান্য আলোকদীপ্ত চরিত্র কিরণময়ী। যেমন সাহস তেমন প্রজ্ঞাবান। কিরণময়ী যখন কাহিনিতে প্রবেশ করে তখনই তার সম্পর্কে সামান্য ধারণা দিয়েছেন লেখক। যাতে কিরণময়ীর অন্তর্জগৎ কিছুটা ধরা পড়ে। ‘অন্ধকারে তাহার চোখ দুটো হিংস্র জন্তুর মতই জ্বলিতে লাগিল। তার মনে হইতে লাগিল, ছুটিয়া গিয়া কাহারো বক্ষঃস্থলে দংশন করিতে পারিলে সে বাঁচে। হাতের দীপটা উঁচু করিয়া ধরিয়া উন্মাদ ভঙ্গি করিয়া বলিল, আগুন ধরিয়ে দেবার উপায় থাকলে দিতুম।’ এটি শুধু কথার কথা নয়, অন্তর্দহনেরই প্রতিরূপ। কারণ বয়োবৃদ্ধ স্বামী-সংসারে জীবনের কিছুই দেখেনি। বিপরীতে শুধু সংসারের বোঝাই বহন করেছে কিরণ। এ বাস্তবতার মধ্যে জীবন সম্পর্কে চমৎকার উপলব্ধি কিরণময়ীর। ফলে বিয়ে নামের সামাজিক বিধির বিপক্ষে তার যত যুক্তি। উপেন্দ্রকে কিরণময়ী ভালোবেসেছে। কিন্তু ‘যুধিষ্ঠি’রসম উপেন্দ্র বন্ধন অতিক্রম করতে পারেনি। উপেনের উদ্দেশে কিরণময়ী বলেছে, "বিয়ের মন্ত্র কর্তব্যবুদ্ধি দিতে পারে, ভক্তি দিতে পারে, সহমরণের প্রবৃত্তিও দিতে পারে, কিন্তু মাধুর্য দেওয়ার শক্তি ত তার নেই। সে ভক্তি আছে শুধু ঐ প্রকৃতির হাতে।" কিরণময়ীর ভাষা উচ্চারণে দ্রোহের বার্তা আমরা পেয়ে থাকি। যা এ-উপন্যাসের পাত্রপাত্রী বা অন্য আখ্যান থেকেও আলাদা। ফলে এ-কিরণময়ী, বাংলাসাহিত্যে বিরল চরিত্র।

এ থেকেই বোঝা যায় লেখকের আদর্শ, উদ্দেশ্য অনুকরণে অর্থাৎ চরিত্রহীনতার ব্যাকরণ প্রকাশে কিরণময়ীর উপস্থাপন। যেমন তার কথা— "পৃথিবীর আকর্ষণ ত চিরদিনই আছে, কিন্তু সে আকর্ষণে আত্মসমর্পণ করতে গাছের পাকা ফলটিই পারে, কাঁচায় পারে না। তার আঁশ, শাঁস পৃথিবীর রসেই পাকে, স্বর্গের রসে পাকে না। সুন্দর ফুল রূপ দিয়ে, গন্ধ দিয়ে, মধু দিয়ে অঙ্কুরে পরিণত হয়—এই তার প্রকৃতি, এই তার প্রবৃত্তি, এই তার স্বর্গীয় প্রেম। বিশ্বজুড়ে এই যে অবিচ্ছিন্ন সৃষ্টির খেলা, রূপের খেলা চলছে, স্বর্গীয় নয় বলে এতে দুঃখ করবার বা লজ্জা পাবার ত কিছুই দেখিনে।"

দিবাকর যখন ধর্মীয় বাণী বা এর বিশ্লেষণ বলত, তা শুনে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছে, "কেবলই কথার মারপ্যাঁচ। নির্গুণ, নিরাকার, নির্লিপ্ত, নির্বিকার, এ-সব কেবল কথার কথা। এর কোন মানে নেই। যদি কিছু থাকে ত সে এই যে, যাঁরা এ-সকল কথা আবিষ্কার করচেন, এ- সম্বন্ধে কেউ চিন্তামাত্র করবে না- সব নিষ্ফল, সমস্ত পণ্ডশ্রম।" বস্তুত চরিত্রহীন নামকরণে যথার্থতা প্রমাণের সুযোগ ছিল সাবিত্রী ও কিরণময়ীর। কিন্তু সেক্ষেত্রে তা হয়নি। তারা দুজনেই ঐতিহ্যিক মর্ম ধারণ করে বসে আছে। অবশেষে কিরণময়ী জ্বলে উঠেছিল দিবাকরের সাথে রেঙ্গুনে। কিন্তু হীন হওয়ার মতো কোনও বৈশিষ্ট্যই এখানে নেই। শুধু বাঙালির পরচর্চা বৈশিষ্ট্যে তাকে চরিত্রহীন বলা যেতে পারে। ওই কিরণময়ী দিবাকরের রেঙ্গুনে গমন ও একসাথে অস্পষ্ট অবস্থানের প্রতিক্রিয়া চরিত্রহীনতা নিশ্চিত করে না। কারণ চরিত্র খোয়ানোর মতো কোনও ইংগিত লেখক দেখাননি। বরং যারা এ সামাজিক আচারিকতার ভান ও অভিনয় ধরে রেখেছে, মূলত তারাই চরিত্রহীন হয়ে উঠেছে। যারা ব্যক্তির অধিকার পূরণে বাধা দিয়েছে, অগ্রসর জীবনে পরাজিত হতে উদ্বুদ্ধ করেছে, তারাই চরিতহীনতার পরিচয় দিয়েছে। শরৎচন্দ্র মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন ঠিকই; কিন্তু বিঘ্নিত হয়েছে তার প্রকল্প। তবে নিষিদ্ধ ভাবনার বিপক্ষে তার ভূমিকা অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত। এজন্য সমালোচক বলেছেন,  ‘উপন্যাসটি বাংলা কথাসাহিত্যের ধারায় এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। প্রচলিত উপন্যাস-প্রকরণে যেন এক যুগান্তর সৃষ্টি করেছেন শিল্পী। উপন্যাসটিতে নরনারীর হৃদয়ের পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতা, নিষিদ্ধ প্রেমের ছবি এঁকেছেন তিনি। সাবিত্রী কুলত্যাগিনী বিধবা নারী হলেও তার অন্তরস্থিত প্রেমের পবিত্র মাধুর্যময় সৌরভে সতীশ আকৃষ্ট না হয়ে পারেনি। কিরণময়ী প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্না বুদ্ধিমতী সুন্দরী অথচ প্রেম-বুভুক্ষু। বিবাহিত জীবনের দাম্পত্য সুখ থেকে বঞ্চিত। উপেন্দ্রের প্রতি তার ভালবাসা সামাজিক স্বীকৃতি পায় না সত্য, তার নারীহৃদয়ের অপূর্ণ মানবজীবনের রিক্ত দিকটি আমাদের বেদনাপ্লুত করে। সাবিত্রী-সতীশ-কিরণময়ী-উপেন্দ্র-দিবাকর ইত্যাদি—কেউই চরিত্রহীন নয়, দরদি লেখকের সহানুভূতির স্পর্শে চরিত্রগুলি তাদের অন্তরস্থিত সত্তাকে অকুণ্ঠভাবে মেলে ধরেছে।’

হীন চরিত্র নির্মাণে তার সদিচ্ছা ছিল, কিন্তু ফিরে তাকিয়েছেন সমাজের দিকে। ফলে যেখানে নীতি হয়ে উঠেছে প্রধান। তাহলে কি মূল্যবোধের নামে চেপে থাকা সামাজিক আচারাদির বিরুদ্ধে সমাজ স্থিত মানুষকে উসকে দেওয়া ছিল তার কাজ? তখন বৈধব্য জীবনের প্রতি মানুষের অবহেলা, উদাসীনতা ছিল চরমে। কিন্তু প্রেম বা সম্পর্ককে পরস্পর সম্মানে উচ্চকিত করেছে একমাত্র কিরণ। কিরণময়ীর কথা, "আমি বিধবা, আমার উপরে কারো ন্যায়সংগত দাবি নেই, তুমিও অবিবাহিত, তোমার হৃদয়ের উপরেও কারো অধিকার নেই। অতএব, আমাকে ভালোবেসে তুমি অন্যায় কিছুই করিনি…।" এখানে ফিওদোর দস্তয়েভস্কি (নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড)-র কথা স্মরণ করি। "Though after all everyone does do that; people do pride themselves on their diseases, and I do, may be, more than anyone. We will not dispute it; my contention was absurd. But yet I am firmly persuaded that a great deal of consciousness, every sort of consciousness, in fact, is a disease."

এ-কথার অনুকূলে বলি সতীশ, উপেন্দ্র, হারান, দিবাকর সামাজিক বিধিবন্ধনে অধিক সচেতন বলেই তারা মানসিকভাবে অসুস্থ। অতি সচেতনতার কারণেই তারা নিজেকে এবং একইসাথে অন্যকেও হারিয়েছে। চরিত্রহীন বলতে যা বোঝানো হয়েছে, তাতে উপন্যাসের পাত্র-পাত্রী কেউ চরিত্রহীন হয়ে ওঠেনি; চরিত্রহীন ছিল সমাজব্যবস্থা।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
দেড় মাস ধরে আতঙ্কের মধ্যে কাটাচ্ছি, আমাদের আবার পূজার আনন্দ!
দেড় মাস ধরে আতঙ্কের মধ্যে কাটাচ্ছি, আমাদের আবার পূজার আনন্দ!
রোনালদোর আল্টিমেটাম, এই কোচ থাকলে পর্তুগাল দলে ফিরবেন না!
রোনালদোর আল্টিমেটাম, এই কোচ থাকলে পর্তুগাল দলে ফিরবেন না!
বৃহস্পতিবার ১০ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায়
বৃহস্পতিবার ১০ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায়
‘ধন্যবাদ লিও’: মেসির বিদায়ে আবেগঘন বার্তা নেইমার, রোনালদিনিয়ো ও সুয়ারেসদের 
‘ধন্যবাদ লিও’: মেসির বিদায়ে আবেগঘন বার্তা নেইমার, রোনালদিনিয়ো ও সুয়ারেসদের 
সর্বাধিক পঠিত
ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে নতুন গাইডলাইন দিলো আইভ্যাক
ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে নতুন গাইডলাইন দিলো আইভ্যাক
১৯৪৭ সালের পর আসাম থেকে বাংলাদেশে আসছে প্রথম কোনও নৌযান
১৯৪৭ সালের পর আসাম থেকে বাংলাদেশে আসছে প্রথম কোনও নৌযান
মান-অভিমান ভুলে এক মঞ্চে ফিরছেন জিৎ-দেব
মান-অভিমান ভুলে এক মঞ্চে ফিরছেন জিৎ-দেব
‘মানবিক’ বিবেচনায় যুব মহিলা লীগ নেত্রীর মুক্তি চাইলেন ছাত্রদল নেতা
‘মানবিক’ বিবেচনায় যুব মহিলা লীগ নেত্রীর মুক্তি চাইলেন ছাত্রদল নেতা
কবে বিয়ে করবেন কেয়া পায়েল, জানালেন নিজেই
কবে বিয়ে করবেন কেয়া পায়েল, জানালেন নিজেই