ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, বদরুদ্দীন উমরের শিবের গীত ও উপেক্ষিত তিনজন

রাজু আলাউদ্দিন 
০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০০ আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০০

আদিপর্ব ও প্রেক্ষাপটের লেখককুল

ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে যেমন, তেমনি কেউ কেউ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বাইরে থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন। কিন্তু কীভাবে এর সূচনা হয়েছিল, তার এক নিবিড় ও বিশ্বস্ত বয়ান আমরা দেখতে পাব আবদুল হকের বইয়ে। ‘ভাষা আন্দোলনের আদিপর্ব’ নামক বইয়ের ভূমিকার শুরুতেই আবদুল হক লিখেছেন:  “সক্রিয় ভাষা-আন্দোলনের আরম্ভ ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে। সেই প্রথম ছাত্র-সম্প্রদায় অন্যতম (বলা উচিত অন্যতর) রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে অবতরণ করেছিলেন। কিন্তু এই আরম্ভেরও আরেকটি আরম্ভ ছিল, সেটি করেছিলেন লেখক-সম্প্রদায়। তাঁরাই রাষ্ট্রভাষার তত্ত্বগত দিকটি নিয়ে প্রথম আলোচনা করেছিলেন। কেউ একক রাষ্ট্রভাষা হিসেবে, কেউ অন্যতর রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবি উত্থাপন করেছিলেন। এ আলোচনার আরম্ভ ১৯৪৭ সালের জুন মাসে, কেননা তখনই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে শাসকদল মুসলিম লীগের উদ্দেশ্য উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা। মুসলিম লীগের তখন অপ্রতিহত প্রভাব। শুধু তাই নয়, পূর্ব-পাকিস্তানের (সীমারেখা তখনও নির্ধারিত হয়নি) শিক্ষিত সম্প্রদায়—রাজনীতিক এবং বুদ্ধিজীবী, ছাত্র এবং অছাত্র—সমগ্রভাবে না হলেও অধিকাংশই একমাত্র উর্দু রাষ্ট্রভাষার সমর্থক ছিলেন, অথবা উর্দু ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্রভাষার কথা চিন্তা করেননি। সেই সময়ে এদেশের লেখক-সম্প্রদায় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার দাবিও উত্থাপন করেছিলেন। এ নিয়ে অনেক দিন যাবৎ তাঁরা লিখেছিলেন, তারই ফলে ভাষা আন্দোলনের মানসিক প্রস্তুতি সম্ভব হয়েছিল।”১ 

বাংলা ভাষার পক্ষে প্রথম প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছিলেন লেখক আবদুল হক। ১৯৪৭ সালে পরপর চারটি প্রবন্ধ তিনি লিখেছিলেন। বছর দেড়েক পরে তিনি আরও একটি প্রবন্ধ লেখেন। প্রথম প্রবন্ধটির নাম ছিল “বাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব”—“এই দীর্ঘ প্রবন্ধ দু’কিস্তিতে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ২২শে জুন এবং ২৯শে জুন তারিখে দৈনিক ইত্তেহাদ-এর রবিবাসরীয় বিভাগে।”২ একই লেখকের দ্বিতীয় প্রবন্ধ “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা” ৩০ জুন দৈনিক আজাদ-এর সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছিল। এর প্রায় এক মাস পরে ‘উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ ২৭ জুলাই প্রকাশিত হয় ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকায়।

মাহবুব জামাল জাহেদী নামে এক তরুণ ২০ জুলাই ১৯৪৭ সালে দৈনিক ইত্তেহাদ-এ ‘রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন, তাতে তিনি বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব করেন। কবি ফররুখ আহমদ সওগাত-এর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত “পাকিস্তান: রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য” শীর্ষক প্রবন্ধে পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা প্রবর্তনের পক্ষে অভিমত প্রকাশ করেন। “এ ছাড়া ১৯৪৭ সালের মধ্যেই এ বিষয়ে আরও যাঁরা লিখেছিলেন তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কাসেম এবং ড. মুহম্মদ এনামুল হক।…বস্তুত ১৯৪৭ সালের মধ্যেই বাংলা রাষ্ট্রভাষার প্রতি বহু প্রখ্যাত স্বল্পখ্যাত এবং অখ্যাত লেখক তাঁদের দ্ব্যর্থহীন সমর্থন জানিয়েছিলেন। মূলত তারই ফলস্বরূপ পূর্ব-পাকিস্তানের শিক্ষিত-সমাজে এবং ছাত্র-সমাজের বাংলা রাষ্ট্রভাষার সপক্ষে একটা প্রবল জনমত গঠিত হয়েছিল। বলা প্রয়োজন, এ ব্যাপারে ঐ সমাজে প্রথমটায় কোনো পরিষ্কার ধারণা ছিল না। এমন কি অনেকের, বিশেষ করে রাজনৈতিক মহলে, উর্দুর প্রতিই সমর্থন ছিল বেশী।”৩

আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলা ভাষার পক্ষে প্রথম জুন মাসে কলম ধরেছিলেন আবদুল হক, জুলাই মাসে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও অন্যান্য লেখক বুদ্ধিজীবীরা।

“১৯৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলনের তীব্রতার মুখে পাকিস্তান সরকার পিছিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু বাঁকা পথে উর্দুর তরক্কীর উদ্দেশ্যে ১৯৪৯ সালের গোড়ার দিকে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান আরবি হরফে বাংলা লেখার সপক্ষে সক্রিয় অভিযান এবং অন্যান্য তৎপরতা আরম্ভ করেছিলেন।”৪

আবদুল হক ‘বাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ প্রবন্ধে বাঙালি জনগোষ্ঠীর উর্দুর পরিবর্তে বাংলা কেন প্রয়োজন তার প্রাসঙ্গিকতা যুক্তিতর্ক দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। এমনকি, যে-সব বিদেশি বাংলাভাষী অঞ্চলে বিভিন্ন প্রয়োজনে এসে থাকেন তাদেরকেও বাংলা ভাষা জানার আবশ্যকতা সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করেন। এছাড়া, সমগ্র পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যানুপাত তুলে ধরে আবদুল হক ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতে বলেন: “কেবল পূর্ব-পাকিস্তানের জন্যই নয়, পশ্চিম পাকিস্তানসহ সমগ্র পাকিস্তানেরই রাষ্ট্রভাষা হওয়ার দাবি এবং যোগ্যতা সবচেয়ে বেশী বাংলা ভাষার।”৫ 

এই দীর্ঘ প্রবন্ধে তিনি এও বলেন: “বিশেষত সাহিত্যিকদের সচেতন হতে হবে, এবং বাংলা ভাষার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।”(পৃ ২৫) আবদুল হক এই প্রবন্ধের একেবারে শেষের দিকে গভীর আস্থার সাথে বলেন: “পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা হবে, এতে কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না।”৬ 

এ কথা সবাই জানেন যে ভাষা-আন্দোলন নিছক বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিই ছিল না, এই আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটেছিল পূর্ব বাংলায়।

“জোর করে উর্দু রাষ্ট্রভাষা পূর্ব পাকিস্তানের উপর চাপিয়ে দিলে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে এসব উক্তি করেছিলেন বিভিন্ন লেখক, ১৪ই আগস্ট ১৯৪৭-এর মাস দুই আগে থেকে পরবর্তী চার পাঁচ মাসের মধ্যেই।”৭ দুই পাকিস্তান যে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে এমন কথা আমরা সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষা আন্দোলন বিষয়ক দীর্ঘ প্রবন্ধেও দেখতে পাব। 

ভাষা আন্দোলন এবং ভাষার সূত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন বাঙালি লেখকরা। আমরা ভাষা শহীদ ও ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক নেতাদের স্মরণ করি বটে, কিন্তু যারা তাঁদের ভাবুকতার বারুদ দিয়ে এই আন্দোলনের শিখা প্রজ্বলিত করেছিলেন তাঁদেরকে আমরা কতটুকু স্মরণ করি?


উপেক্ষিত তিনজন

আবদুল হক, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. মুহম্মদ এনামুল হক এবং সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখাগুলো রাজনৈতিক নেতা ও আন্দোলনকারীদের প্রেরণা হয়ে উঠেছিল, আমরা তাঁদেরকে কি প্রাপ্য সম্মান দিয়েছি? প্রাপ্য সম্মান দেওয়া তো দূরের কথা, এই আন্দোলনের ইতিহাস যখন রচিত হলো কারো কারো দ্বারা, তখন কেউ কেউ উপেক্ষা করেছেন বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো কোনো আন্দোলনকারীর ভূমিকাকে।

বদরুদ্দীন উমর
ভাষার অধিকার থেকে জাতীয়তাবোধের সূচনা ও বিকাশ, এবং সবশেষে ৭১ সালে বাঙালির স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ—এসবই ভাষার জন্য লড়াইয়ের এক ধারাবাহিকতা। সুতরাং ভাষার জন্য লড়াই না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আদৌ সম্ভব হতো কি না সন্দেহ। সেই ভাষা আন্দোলনের সূচনা যারা ভাবুকতা ও প্রতিবাদের মাধ্যমে করেছিলেন তাদের সরকারি স্বীকৃতি যেমন অতিশয় ক্ষীণ, তেমনি এই আন্দোলনের ইতিহাস রচয়িতাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও উল্লিখিত, সেই বদরুদ্দীন উমরের ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থেও এদের কেউ কেউ উপেক্ষিত কিংবা অনুল্লিখিত। আর কৌতুককর ব্যাপার এই যে মৃত্যুর কিছুদিন আগেই বদরুদ্দীন উমর এক অভিযোগের বোমা ফাটিয়েছিলেন এই বলে যে: “মুক্তিযুদ্ধের লেখা ইতিহাস ৯০ ভাগ মিথ্যা”। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কারো কারো লেখায় যে বাড়াবাড়ি বা বাস্তবতাবর্জিত অংশ নেই, তা নয়। কিন্তু ৯০ ভাগই মিথ্যা, এটা বললে তাঁর মিত্রও বোধহয় তাঁর সাথে একমত হতে পারবেন না। ৯০ ভাগই মিথ্যা বলার পেছনে উমরের মনস্তাত্ত্বিক কারণটা আরও গভীরে। July Revolutionary Alliance-এর একটা ছোট্ট ভিডিয়ো ক্লিপ-এ (https://www.facebook.com/reel/1801040304426258) তাঁকে বলতে শোনা যায়, ২৪ সালের জুলাইকে তিনি বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা বলে মনে করেন। শুধু এটাই নয়, তাঁর বিভিন্ন রাজনৈতিক লেখায় তিনি আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কৃতিত্বকে প্রায় অস্বীকার করেছেন। ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তাই করেছেন। উমর সাহেব নিজে যদিও ভাষা আন্দোলন বিষয়ক তাঁর গ্রন্থে মিথ্যাচার করেননি, কিন্তু তিনিও কি সঠিক ইতিহাস রচনা না করার অভিযোগ থেকে মুক্ত? তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে যে ইতিহাস লিখেছেন, তার গলতি নিয়ে কিন্তু কাউকে আজ পর্যন্ত কথা বলতে শোনা যায় না। তবে একজন প্রশ্ন তুলেছিলেন, তিনি স্বয়ং সৈয়দ মুজতবা আলী।

গোলাম মোস্তাকীমের ভাষায় সেই অভিযোগের বর্ণনা পাওয়া যায় তাঁর ‘সৈয়দ মুজতবা আলী: প্রসঙ্গ অপ্রসঙ্গ’ বইটিতে: “বাংলাভাষা আন্দোলন নিয়ে তিনি কথা বলছিলেন। তিনি বললেন, “ভাষা আন্দোলনের ব্যাপারে সিলেট সম্পর্কে একটা মজার খবর আছে। ভাষা আন্দোলনের সময় একমাত্র সিলেট জেলায়, শহরে পুরুষরা বাংলা ভাষার বিরোধিতা করেছে। কিন্তু সিলেটের মহিলারা বোরখা পরে বাংলা ভাষার পক্ষে রাস্তায় মিছিল করেছে। আর আমার দুঃখটা কোথায় জানো? আমি একখানা আস্ত বই লিখে বদরুদ্দীন উমরের ‘পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ বইয়ে আমার নাম তুলতে পারলাম না। পক্ষান্তরে আমার গিন্নি একটা প্রতিবাদলিপিতে নাম সই করে তাঁর নাম বদরুদ্দীন উমরের বইয়ে তুলে ফেলল। একেই বলে কপাল।”

“আমার গিন্নি তখন সিলেট গভমেন্ট গার্লস স্কুলের হেড মিস্ট্রেস। তিনি ঐ প্রতিবাদলিপিতে শুধুই দস্তখত করেছিলেন। বদরুদ্দীন উমরের সঙ্গে দেখা হলে আমি বলতাম, “মশাই, পুরো একখানা বই লিখেও আপনার বইয়ে আমার জায়গা হলো না। কারণটা কি যে আমি ভারতীয় নাগরিক?” এই আমি ১৯৪৯ সালেই আমার ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ নামক বইয়ের শুরুতেই লিখছিলাম পাঞ্জাবিরা যদি বাঙালিদের উপর উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং তাতে যদি বাঙালিরা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যায় তাতে যেন কেউ বিস্মিত না হয়।”৮

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, বদরুদ্দীন উমরের শিবের গীত ও উপেক্ষিত তিনজন
৩ খণ্ডে রচিত বদরুদ্দীন উমরের ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে প্রায় পূর্ণাঙ্গ না হলেও, সবচেয়ে বিস্তৃত ও তথ্যবহুল গ্রন্থগুলোর একটি। পরবর্তীকালের ইতিহাস রচয়িতারা এই গ্রন্থের কাছে নানাভাবে ঋণী। আমরা জানি, ইতিহাসগ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে অনেক সময়ই অসম্পূর্ণতা থাকে, থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অসম্পূর্ণতা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পর দায়িত্বশীল ইতিহাসবিদরা পরবর্তী সংস্করণে তা পূরণ করেন। 

আশ্চর্যের ব্যাপার হলো বদরুদ্দীন উমরের বইটির পরবর্তী একাধিক সংস্করণ প্রকাশিত হলেও মুজতবা আলীর এই অভিযোগ আমলে নিয়ে তাঁর রচিত ইতিহাস তিনি সংশোধন করেননি কখনো। মুজতবা আলীর বিখ্যাত দীর্ঘ প্রবন্ধটি প্রথমে প্রকাশিত হয়েছিল সিলেট থেকে ‘আল ইসলাহ’ পত্রিকার ১১ বর্ষ ৭-১২ সংখ্যা কার্তিক চৈত্র ১৩৫৬ সালে, অর্থাৎ ইংরেজি ১৯৪৯ সালের শেষ নাগাদ কিংবা ১৯৫০-এর সূচনায়। তবে ‘আল ইসলাহ’-এ প্রকাশেরও আগে মুজতবা আলীর এই লেখাটির সারাংশ বক্তৃতা হিসেবেই প্রথম আত্মপ্রকাশ করে সিলেটের কেন্দ্রীয় সাহিত্য সংসদ-এর ১১ বর্ষের তৃতীয় সাহিত্য সভায়। ‘আল ইসলাহ’-এ যখন এটি প্রকাশিত হয়েছিল তখন “সম্পাদকীয় নোট-এর তারিখ ৩০/১১/১৯৪৭।”৯ উল্লিখিত হয়েছিল। তার মানে লেখাটি ভাষা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক সূচনাকালের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। মুজতবা আলীর এই প্রবন্ধটি কলকাতার বিখ্যাত সাহিত্য সাময়িকী ‘চতুরঙ্গ’-এর ১৯৪৮ জুলাই-আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। পরে বই আকারে এটি প্রথমে ১৩৬৩ বঙ্গাব্দে চট্টগ্রামের বইঘর প্রকাশনী এবং কলকাতার নবজাতক প্রকাশনী থেকে ইংরেজি ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধটির প্রকাশ সম্পর্কে এতসব তথ্য দেওয়ার কারণ এটাই যে যদি অনবধানতাবশত—এমনটা হওয়া অযৌক্তিক ও অসম্ভব নয় বিবেচনায় রেখেই বলছি—কোনো একটি উৎস গোচরে না এসে থাকে, তাহলে অন্তত আরও চার/পাঁচটি উৎস রয়েছে। গবেষক ও ঐতিহাসিক হিসেবে বদরুদ্দীন উমর এর একটিও লক্ষ্য করেননি—এটা খুবই অদ্ভুত ও অসম্ভব শোনায় না কি? এমনকি ২০২৪ সালে যখন তাঁর বইটির সর্বশেষ সংস্করণ প্রকাশিত হলো, সেখানেও তিনি এই অপূর্ণতাকে আমলে নেননি। এমন নয় যে এটি অখ্যাত কোনো লেখকের রচনা। এমনকি, লেখকের গুরুত্ব যদি বাদও দেই, রচনার গুণের কারণে এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেও মুজতবা আলীর এই লেখাটিকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই বিষয়ে আবদুল হক, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং ড. মোহাম্মদ এনামুল হকের লেখার যে গুরুত্ব, কমবেশি যদি নাও বলি, সমান গুরুত্ব রয়েছে মুজতবা আলীর এই লেখাটির। অথচ উমর তাঁর বইয়ের প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি হিসেবে যা বলেছেন তা প্রকৃত ঐতিহাসিকের আদর্শ পদ্ধতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়, কিন্তু বাস্তবে সেই আদর্শের প্রতিফলন ঘটেনি: “বইটিতে আমি কাগুজে তথ্য এবং মৌলিক আলাপ ও সাক্ষাৎকার এ দুইয়ের ভিত্তিতেই বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দিয়েছি। কাগুজে তথ্য অর্থাৎ খবরের কাগজ, অন্যান্য সাময়িকী, পার্টিসমুহের দলিলপত্র, ইশতাহার, পুস্তিকা ইত্যাদি সংগ্রহ করার জন্যে আমি বস্তুতপক্ষে ১৯৬৩ সাল থেকেই চেষ্টা করে আসছি।”১০

যিনি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য নানাভাবে সংগ্রহ করার চেষ্টা করে আসছেন ১৯৬৩ সাল থেকে তিনি মুজতবা আলীর লেখাটি সম্পর্কে অন্ধকারে রয়ে গেছেন বলে তাঁর নামটি উল্লিখিত হয়নি—এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? তাহলে কী কারণে—পরপর এতগুলো সংস্করণ হওয়ার পরও—মুজতবা আলীর প্রসঙ্গটি বাদ পড়ে গেল? মুজতবা আলী উষ্মার সাথে যা বলেছিলেন, সেটাই কি তবে মূল কারণ?

সৈয়দ মুজতবা আলী
কিন্তু সেটাই বা কেন কারণ হতে যাবে? উমর তাঁর বইটিতে পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে তার যে-রাজনৈতিক পটভূমি তৈরি করেছেন সেখানে কেবল পূর্ব বাঙলাই নয়, তা বিস্তৃত হয়েছে ভারত পর্যন্ত; তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক তৎপরতাকেও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সাথে যুক্ত করে নিলেন। এভাবে যুক্ত করার আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল কি না সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এবং এই প্রশ্ন উত্থাপিতও হয়েছে বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত বদরুদ্দীন উমরকে নিয়ে তরুণ গবেষক ড. এম আব্দুল আলীম-এর একটি লেখায়। আমরা এই মুহূর্তে সেই বিতর্কে না গিয়ে শুধু এই যুক্তিতে স্থিত হতে পারি যে যে কারণে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন তৎপরতার ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, আসতে পারে রজনী পাম দত্ত, পূরণ চন্দ্র যোশীর উল্লেখ, এমনকি চীন, পাকিস্তান, বার্মা, যুগোশ্লাভিয়া ও সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্রদের উল্লেখও আমরা দেখতে পাই; সেই একই যুক্তিতে ‘ভারতীয়’১১ বলে ঠাহর করা মুজতবা আলীর ভাষা আন্দোলন বিষয়ক চিন্তার তৎপরতাও কি যুক্ত হতে পারতো না? যে আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষ সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও এই গ্রন্থে দেশি বিদেশি রাজনৈতিক তৎপরতা অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, সেখানে ভাষা আন্দোলনের তাত্ত্বিক পটভূমি রচয়িতার প্রত্যক্ষ সংযোগকে তিনি কীভাবে অস্বীকার করেন? ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনার জন্য তিনি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে অনিবার্যই শুধু বিবেচনা করলেন না, এর প্রেক্ষাপটকে বাঙলা ও ভারতীয় সীমানা পেরিয়ে এশিয়া ও ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত করলেন। কিন্তু রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত নন অথচ ভাষা আন্দোলনের চিন্তার উৎসমুখ হয়ে উঠলেন, তাঁদের কাউকে কাউকে রাখলেন বিবেচনার বাইরে। এটা বদরুদ্দীন উমরের এক শোচনীয় স্ববিরোধ, এবং গবেষক হিসেবে স্বেচ্ছাচারিতার এক সংকীর্ণ দৃষ্টান্ত। মুজতবা আলী যদি নাগরিক পরিচয়ে ভারতীয় হয়েও থাকেন, তারপরও ভাষা আন্দোলনের চিন্তার সূত্রপাত ঘটানো অন্যতম চরিত্র হিসেবে তাঁকে এড়ানোর কোনো গ্রহণযোগ্য যুক্তি থাকতে পারে না। 

যদি ধরেও নেই যে আমাদের চিন্তাচেতনার জাতীয় বিকাশের সাথে যুক্ত কেবল আমাদের এই অঞ্চলের ভাবুকদেরকেই এই গ্রন্থে আলোচনার জন্য সীমিত করে নিয়েছেন, তাহলে সেই কথাটি তিনি ভূমিকায় উল্লেখ করলেই পারতেন। ভূমিকায় সেরকম কোনো ইঙ্গিত বা স্পষ্ট কোনো উল্লেখ তিনি করেননি। 

তাছাড়া, মুজতবা আলীর জন্ম এই অঞ্চলে, তিনি ঘটনাক্রমে ভারতের নাগরিক হয়েছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর লেখায় এবং তাঁর জীবনেও এই অঞ্চলের জীবনাচার, ভাষা ও সংস্কৃতি এতটা আবেগের সাথে উপস্থিত ছিল যে তিনি যতটা না ভারতীয় ছিলেন, তার চেয়ে বেশি ছিলেন এই বাংলাদেশের।

মুহম্মদ মুসলিম চৌধুরী: এসেছিলে তবু আসো নাই

শুধু মুজতবা আলীই নন, বদরুদ্দীন উমরের গ্রন্থের কোনো এক সংস্করণে উল্লিখিত হয়ে আবার পরের সংস্করণে বাদ পড়েছেন এমন নামও আছে, তিনি মুহম্মদ মুসলিম চৌধুরী। মুসলিম চৌধুরী অন্যদের মতো অতটা পরিচিত নন, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্নে তাঁরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। প্রাবন্ধিক গবেষক ইসরাইল খানের ভাষ্যমতে: “সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখাটি ৯ নভেম্বর ১৯৪৭ তারিখের সিলেটের “কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে’’র ১১ বর্ষের নির্ধারিত তৃতীয় সাহিত্য সভায় প্রদত্ত একটি বক্তৃতা। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত ওই আলোচনা সভার সভাপতি ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় লেখক ও বুদ্ধিজীবী মুহম্মদ মুসলিম চৌধুরী। তিনিও “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন।”১২

মুসলিম চৌধুরীর এই প্রবন্ধটি গবেষক বদরুদ্দীন উমর ‘জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন’ নামক প্রকাশনা কর্তৃক জুলাই ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’-এর তৃতীয় খণ্ডে ‘আল-ইসলাহ পত্রিকার প্রতিবেদন: পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামে প্রকাশিত হলেও, বাতিঘর থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ সংস্করণে সেটি অনুপস্থিত, এমনকি, লেখকের নামটি পর্যন্ত কোথাও উল্লিখিত হয়নি।

জীবনানন্দ দাশ: উপেক্ষা সে করেছে আমারে

বদরুদ্দীন উমর তাঁর বইয়ের প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় লেখা সংগ্রহ সম্পর্কে বলেছেন: “কলকাতার পত্রপত্রিকাগুলি থেকে আমার নির্দেশিত প্রাসঙ্গিক অংশগুলো কপি করে পাঠিয়েছেন জনাব সৈয়দ হোসেন রেজা।”১৩

তাঁর এই বক্তব্য জানার পরপরই আমরা কয়েকটি তথ্য স্মরণ করব প্রাসঙ্গিক সূত্রে। ভাষা আন্দোলনের সময় প্রকাশিত বাংলা ভাষার প্রধান কবি জীবনানন্দ দাশের একটি প্রবন্ধের কথা। বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা উদ্বিগ্ন ছিলেন তার প্রমাণ আমরা দেখতে পাব ইংরেজি ও বাংলাভাষায় রচিত যথাক্রমে 'The Future of Bengali Language and Literature’ এবং 'বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’ নামক দুটি প্রবন্ধে। প্রবন্ধ দুটি বিষয়ের গুরুত্বে এবং বাংলা সাহিত্যের এক প্রধান কবির প্রতিক্রিয়া হিসেবেও গুরুত্ব বহন করে। মনে রাখা দরকার যে তিরিশের প্রধান লেখকদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশই একমাত্র লেখক যিনি সাহিত্য ব্যতীত অন্যান্য নানান বিষয় তো বটেই, এমনকি বাংলা ভাষার বিপন্ন অবস্থা সম্পর্কে তাঁর ভাবনা ও বেদনার চিহ্নগুলো স্পষ্ট রেখায় এঁকেছিলেন সেই সংকটকালে।

জীবনানন্দ দাশ

তাঁর যে দুটি লেখায় এই উদ্বেগ উল্লেখ করেছিলেন তার একটি মৃত্যুর বছর দুই আগে (১৯৫২ সালে) লিখেছিলেন ইংরেজিতে, আর বাংলায় লেখা প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা ১৬ চৈত্র ১৩৫৮ সালে, অর্থাৎ, ইংরেজি ১৯৫২ (২৯ মার্চ) সালে। এও খুব আশ্চর্যের ব্যাপার যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষা মুছে ফেলার যে ষড়যন্ত্র চলছিল—৪৭ থেকে ৫২ সাল পর্যন্ত—সে সম্পর্কে জীবনানন্দ দাশ ছাড়া তিরিশের অন্য চার পাণ্ডবই ছিলেন প্রতিক্রিয়াহীন। বদরুদ্দীন উমরের গ্রন্থে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও গৌণ লেখকের উল্লেখ থাকলেও, জীবনানন্দ দাশ তাঁর কাছে উপেক্ষিতই থেকে গেছেন। এমন নয় যে জীবনানন্দ দাশ তখন অচেনা ছিলেন। ১৯৫২ সালের মধ্যে তাঁর প্রধান কাব্যগ্রন্থগুলো (পাঁচটি) প্রকাশিত হয়ে গেছে। তাঁকে নিয়ে সাহিত্যজগতে বাদানুবাদও চলছে। ফলে তাঁর সম্পর্কে বা তাঁর লেখা সম্পর্কে অবহিত না থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তাছাড়া, বাংলা লেখাটি তখন প্রকাশিত হয়েছে কলকাতার দেশ পত্রিকায় (১৬ চৈত্র ১৩৫৮)। দ্বিতীয়ত, ইংরেজি লেখাটি যদিও জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি, কিন্তু পরে জীবনানন্দের অগ্রন্থিত রচনা হিসেবে গ্রন্থকারে ২০১৮ সাল থেকেই এটি লভ্য হয়ে উঠেছে। তবু, ইংরেজি রচনাটি বহু বছর পর প্রকাশ হওয়ার কারণে যদি তাঁর নজরে নাও আসে, বাংলা প্রবন্ধটি কি তাঁর নজরে পড়া উচিত ছিল না? বদরুদ্দীন উমরের বইটির সর্বশেষ সংস্করণটি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৪ সালে, সেখানেও তো উল্লিখিত হতে পারতো বাংলা ভাষা নিয়ে জীবনানন্দ দাশের আশঙ্কা ও উদ্বেগের কথা।

শুধু বদরুদ্দীনের গ্রন্থেই তিনি উপেক্ষিত হননি, পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলন নিয়ে যারাই বই লিখেছেন তাদের কারোর গ্রন্থেই জীবনানন্দ দাশের কোনো উল্লেখ নেই। উমর সাহেবের পরে যে বইটিকে এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ বলে মনে করা হয়, বশীর আলহেলাল রচিত ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ গ্রন্থেও তার ছিটেফোঁটা উল্লেখ দেখা যায় না।

সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ভাষা আন্দোলন নিয়ে পরবর্তীকালে যারাই ইতিহাস লিখতে গিয়েছেন তারা অনেকেই বদরুদ্দীনের রচিত খণ্ডগুলো অন্ধ অনুকরণ ও অনুসরণ করেছেন। এমনকি, ইউপিএল থেকে ভাষা আন্দোলন পটভূমি গ্রন্থমালা হিসেবে আতিউর রহমানের সম্পাদনায় যখন ৫ খণ্ডে ‘ভাষা আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক পটভূমি’ নামে প্রকাশিত হলো, তার কোনো খণ্ডেই জীবনানন্দ দাশের উল্লেখ নেই। বদরুদ্দীনের গ্রন্থে কেন মুজতবা আলী কিংবা জীবনানন্দ দাশের উল্লেখ নেই—এ বিষয়ে কাউকেই কোনো প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়নি আজ পর্যন্ত। অথচ মুজতবা আলী এবং জীবনানন্দ দাশকে এড়িয়ে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কোনোভাবেই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে কেবল রাজনীতির জায়গা থেকে দেখলে হবে না, সাহিত্যিক প্রতিক্রিয়াকে অংশভুক্ত করে না দেখলে এই ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, কারণ এই আন্দোলনের শুরুই হয়েছিল লেখক বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়ার সূত্রে।

বদরুদ্দীন উমরের এই গ্রন্থটি ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে ইতিহাসভিত্তিক হলেও এটি গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে অনাদর্শ ও লক্ষ্যভ্রষ্ট। লক্ষ্যভ্রষ্ট, কারণ এটি যতটা না ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস হয়ে উঠেছে তার চেয়ে বেশি কমিউনিস্ট আন্দোলনের তথ্যভিত্তিক এক গবেষণাগ্রন্থে পরিণত হয়েছে। অধ্যাপক আলীম এ বিষয়ে লেখা তাঁর একটি প্রবন্ধে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। আগ্রহী পাঠকেরা সেটি পড়ে দেখতে পারেন। অধ্যাপক আলীম মনে করেন, বদরুদ্দীন উমরের বইটি ভাষা আন্দোলন নিয়ে ইতিহাস যদি হয়ে থাকে ৩০ শতাংশ, বাকি ৭০ শতাংশই হচ্ছে রাজনৈতিক ইতিহাস। ফলে, এটি ভাষা আন্দোলনের যথার্থ ইতিহাস হয়ে ওঠেনি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গ্রন্থের যথার্থ মর্যাদা পেতে পারে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বশীর আল হেলালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। বদরুদ্দীন উমরের বইটি যতটা না ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, তার চেয়ে বেশি শিবের গীত। তাঁর বইটি কেবল লক্ষ্যভ্রষ্টই নয়, এটি অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর। 

তথ্যসূত্র: 
১. ভাষা আন্দোলনের আদিপর্ব, আবদুল হক, মুক্তধারা, এপ্রিল ১৯৮৪,পৃ ৫
২. ভাষা আন্দোলনের আদিপর্ব, আবদুল হক, মুক্তধারা, এপ্রিল ১৯৮৪, পৃ ১১
৩. ভাষা আন্দোলনের আদিপর্ব, আবদুল হক, মুক্তধারা, এপ্রিল ১৯৮৪,পৃ ১৩
৪. ভাষা আন্দোলনের আদিপর্ব, আবদুল হক, মুক্তধারা, এপ্রিল ১৯৮৪, পৃ ১৪
৫.  ভাষা আন্দোলনের আদিপর্ব, আবদুল হক, মুক্তধারা, এপ্রিল ১৯৮৪, পৃ ২০
৬. ভাষা আন্দোলনের আদিপর্ব, আবদুল হক, মুক্তধারা, এপ্রিল ১৯৮৪, পৃ ২৬
৭. ভাষা আন্দোলনের আদিপর্ব, আবদুল হক, মুক্তধারা, এপ্রিল ১৯৮৪, পৃ ৬২  
৮. সৈয়দ মুজতবা আলী: প্রসঙ্গ অপ্রসঙ্গ, গোলাম মোস্তাকীম, স্টুডেন্ট ওয়েজ, বৈশাখ ১৪১৫ বঙ্গাব্দ, পৃ ১১১
৯. পূর্ব বাঙলার সাময়িকপত্র, ইসরাইল খান, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৯, পৃ ৭৩৪  
১০.পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, বদরুদ্দীন উমর, বাতিঘর, ২০২৪ , পৃ ১০
১১. সৈয়দ মুজতবা আলীর নাগরিকত্ব নিয়ে পরস্পরবিরোধী কিছু তথ্য থাকায় তাঁকে ভারতীয় নাগরিক বলা হলেও, বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি করারও কিছু যৌক্তিক কারণ আছে। তিনি বগুড়া কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যখন যোগদান করেন, সেটা ১৯৪৯ সাল, অর্থাৎ পাকিস্তান আমল। সেই সময় একটি কলেজে ভারতীয় নাগরিক পরিচয়ে এর অধ্যক্ষ হবেন, তেমনটা প্রায় অসম্ভব যদি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ভারতবিদ্বেষ ও ভারতবিরোধিতার কথা মনে থাকে। মুজতবা আলী বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় আসেন। পরের বছর জুনে একবার মাসখানেকের জন্য কলকাতায় চিকিৎসার জন্য গেলেও তিনি আমৃত্যু ঢাকায়ই বসবাস করেছেন। ১৯৭৪ সালে তিনি এই দেশেই মৃত্যুবরণ করেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম বর্তমান ভারতে, কিন্তু তিনি এদেশে মৃত্যুবরণ করেন।  
১২. ড. মুহম্মদ এনামুল হক: ‘পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্র-ভাষার পরিপ্রেক্ষিতে উর্দু ও বাংলা’, ইসরাইল খান, প্রকাশকাল: ১ অক্টোবর ২০২৫, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
১৩.পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, বদরুদ্দীন উমর, বাতিঘর, ২০২৪, পৃ ১১

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
আবারও রোহিঙ্গাদের ‘বাংলাদেশি বানানোর’ চেষ্টা, আঁতুড়ঘর কি কলমাকান্দা নির্বাচন অফিস?
আবারও রোহিঙ্গাদের ‘বাংলাদেশি বানানোর’ চেষ্টা, আঁতুড়ঘর কি কলমাকান্দা নির্বাচন অফিস?
মাঝ আকাশে বাথরুম বিপত্তি, গন্তব্যের আগেই জরুরি অবতরণ
মাঝ আকাশে বাথরুম বিপত্তি, গন্তব্যের আগেই জরুরি অবতরণ
আজ বিশ্ব ডাক দিবস
আজ বিশ্ব ডাক দিবস
এআই কনটেন্ট শনাক্তে গুগলের নতুন টুল, ব্যবহার করবেন যেভাবে
এআই কনটেন্ট শনাক্তে গুগলের নতুন টুল, ব্যবহার করবেন যেভাবে
সর্বাধিক পঠিত
রংপুরে চার খুন: খেজুর-শসা-সিগারেট কারা খেয়েছিল নিশ্চিত করলো সিআইডি
রংপুরে চার খুন: খেজুর-শসা-সিগারেট কারা খেয়েছিল নিশ্চিত করলো সিআইডি
মন্ত্রী বললেন বাবা শোনো, বিক্ষোভকারী বললেন ‘এখানে দেশ বিক্রি হচ্ছে, ঢুকতে দেবো না’
মন্ত্রী বললেন বাবা শোনো, বিক্ষোভকারী বললেন ‘এখানে দেশ বিক্রি হচ্ছে, ঢুকতে দেবো না’
ফ্যামিলি কার্ডের জন্য টিপসই দিয়ে বিধবা জানলেন ‘বিয়ে হয়ে গেছে’
ফ্যামিলি কার্ডের জন্য টিপসই দিয়ে বিধবা জানলেন ‘বিয়ে হয়ে গেছে’
বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সেই মাহদীকে
বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সেই মাহদীকে
রাতে হঠাৎ অসুস্থ, হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা গেলেন থানার ওসি
রাতে হঠাৎ অসুস্থ, হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা গেলেন থানার ওসি