নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে শিক্ষকের ভূমিকার কথা ভাবি—জীবনের সকল বাঁকে তারা সাজিয়ে রেখেছেন স্বর্ণঘট যা আলোকময় শব্দে পূর্ণ। পথে যেতে যেতে প্রমগ্ন হলেই দেখতে পাই সমস্ত শব্দ ইন্দ্রধনুর রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে—যে প্রান্ত দিগন্তের দিকে বিস্তৃত সে দিকে আমার যাত্রাকে করে তুলছে আনন্দময়। আমি আলোকময় শব্দের কাছে বিনত থেকে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের উজ্জ্বল অবয়বের দিকে তাকিয়ে থাকি।
এসএমআই স্যার আটের দশকের প্রথমদিকে আমাদের আধুনিক কবিতা ও শেক্সপিয়ার পড়িয়েছেন। ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ পড়াতে গিয়ে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব নিয়ে আলোকপাত করেছেন—এ যুদ্ধের ফলে প্রধানত ইউরোপে যে সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়বিক বিপর্যয় সংঘটিত হয় তার রূপকল্পময় আখ্যান হিসেবে কবিতাটি নির্মিত হয়েছে। পোড়োভূমির অধিবাসীদের আত্মিক বিশুষ্কতা ও বন্ধ্যাত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি ‘স্পিরিচুয়াল ডিহাইড্রেশন’ শব্দবন্ধ উচ্চারণ করেন। এ প্রকাশটি রূপকাশ্রিত, সচরাচর শ্রুত হয় না বলে এর দ্যোতনা এখনও আমাকে স্পর্শ করে। ‘স্পিরিচুয়াল ডিহাইড্রেশন’ শব্দবন্ধ বিভিন্ন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এটি এমন একটি অবস্থাকে বোঝায় যেখানে কেউ শারীরিক পানিশূন্যতার স্থলে আধ্যাত্মিকভাবে ক্লান্ত, সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা পরিতৃপ্তিহীন থাকে। কিছু লেখক এটিকে খ্রিষ্টীয় শাস্ত্রে উল্লিখিত “লিভিং ওয়াটার” অর্থাৎ পবিত্র আত্মার অভাবের সাথে তুলনা করেন। আধ্যাত্মিক পানিশূন্যতার লক্ষণগুলোর মধ্যে বিরক্তি, শান্তির অভাব, ক্লান্তি, এবং শূন্যতার অনুভূতি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
‘দ্য ক্যান্টারবেরি টেইলস’ এর ‘দ্য জেনারেল প্রোলগ’-এ চসার এপ্রিলের দৃশ্যপট অঙ্কন করেন—যখন বৃষ্টি খরার আবহ দূর করে মৃত্তিকা সিঞ্চিত করে, বৃক্ষ পুষ্পে শোভিত হয়, পশ্চিমা বাতাসের কোমল শ্বাসে নবাঙ্কুর আন্দোলিত হয়, পাখির মিষ্টি কূজন শ্রুত হয়, তখন মানুষজন তীর্থযাত্রার প্রেরণা লাভ করে। কিন্তু দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড-এ বসন্তদিনে পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে ‘ড্রাইড টিউবার্স’ সংকুচিত জীবন নিয়ে টিকে থাকে। ‘স্পিরিচুয়াল ডিহাইড্রেশন’ প্রকাশটি ব্যবহার করে এসএমআই স্যার নির্দয়তম এপ্রিল, পুনর্জীবনহীন ল্যান্ডস্কেপ, ঊষর পার্বত্য পরিবেশ, গণৎকারের প্রবঞ্চনা, অবাস্তব লন্ডন শহর, টাইপিস্টের যান্ত্রিক জীবন, পবিত্র গ্রেইল সন্ধানের ব্যর্থ প্রচেষ্টা প্রভৃতি ইমেজের প্রতীকী অর্থ সুস্পষ্ট করে তুলতেন।
এসএমআই স্যার আমাদের রবার্ট ফ্রস্টের কবিতাও পড়িয়েছেন। শ্রেণিকক্ষে তিনি ‘স্টপিং বাই উড্স অন আ স্নোয়ি ইভনিং’, ‘মেন্ডিং ওয়াল’, ‘দ্য ডেথ অভ দ্য হায়ার্ড ম্যান’ , ‘আফটার অ্যাপল-পিকিং’ প্রভৃতি কবিতার সুবোধ্য বিশ্লেষণ উপস্থাপন করতেন। কবিতার আপাত সরল চিত্রকল্পের অন্তর্নিহিত অর্থের নানা স্তর তিনি অবলীলায় উন্মোচন করতেন। আমার চেতনায় রবার্ট ফ্রস্টের কবিতাগুলো বিশেষ করে ‘স্টপিং বাই উড্স অন আ স্নোয়ি ইভনিং’ গভীরভাবে রেখাপাত করে। ফ্রস্টের কবিতার দুর্মর আকর্ষণের কারণে আমি কর্মজীবনে ফ্রস্টের কবিতা নিয়ে গবেষণায় প্রবৃত্ত হই ও ‘রবার্ট ফ্রস্ট: আ ক্রিটিক্যাল স্টাডি ইন মেজর ইমেজেস অ্যান্ড সিম্বলস’ শীর্ষক একটি গবেষণা গ্রন্থ প্রণয়ন করি।
সাতের দশকের শেষদিক থেকে দৈনিক সংবাদে আমি নিয়মিতভাবে সাহিত্য সাময়িকী পড়েছি। সৈয়দ শামসুল হকের ‘হৃৎকলামের টানে’ ও এসএমআই স্যারের ‘অলস দিনের হাওয়া’ ছিল আমার দুটি প্রিয় কলাম। আটের দশকে ছাত্ররা সংবাদপত্র পড়ে অনেককিছু শিখেছে। তখন ইন্টারনেটের প্রচলন ছিল না বলে ই-মেইল, ফেসবুক বা ভিডিয়ো স্ট্রিমিং ওয়েবসাইট ব্যবহারের স্বপ্নও দেখিনি। বই, পত্রপত্রিকা ও শিক্ষকের প্রভাষণ ছিলে জ্ঞানচর্চার ভিত্তি। শিক্ষক লেখক হলে তার নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণের সময়কাল নির্ধারিত থাকে না। ‘যে ছায়ারে ধরব বলে করেছিলাম পণ’—রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের এ গানের একটি ইমেজ অনুসরণ করে ‘অলস দিনের হাওয়া’ শীর্ষক কলামে এসএমআই স্যার দীর্ঘ বিশ বছর বিশ্বসাহিত্যের কিরণ ছড়িয়েছেন।
শ্রেণিকক্ষের বাইরে তার বুদ্ধিদীপ্ত ও বোধ্য আলোচনা আমাকে প্রতিনিয়ত ঋদ্ধ করেছে। বস্তুত বিশ্বসাহিত্য নিয়ে তার অবলোকন বাংলাদেশের অগণিত পাঠকের মনে এঁকে দিয়েছে অভূতপূর্ব আলোকরেখা। তিনি যে গভীর ও প্রাঞ্জল ভাষায় টেড হিউজের বার্থডে লেটার্স, সিলভিয়া প্লাথের দি বেল জার, উমবার্তো ইকোর উপন্যাস, জোসেফ ব্রডস্কির কবিতা, জে.এম কুতসিয়ার উপন্যাস, বার্গাস ইয়োসার উপন্যাস, গাব্রিয়েল ওকারার কবিতা, মানুষ ও মিনোটর : ল্যাটিন আমেরিকার উপন্যাস, গ্রেয়াম গ্রিনের কথাসাহিত্য, পেসোয়ার কবিতা, রবার্ট ব্লাইয়ের কবিতা, মিলান কুন্ডেরার অমরত্ব, অক্টাভিও পাসের কবিতা, বোর্হেসের আধুনিকতা প্রভৃতি বিষয়ে প্রায় আড়াইশটি কলাম লিখেছেন তা সমসাময়িক কোনো সাহিত্যিকের কর্মপ্রচেষ্টার ভেতর লক্ষণীয় নয়। তবে মাত্র আটচল্লিশটি কলাম সহযোগে ২০১২ সালে ‘অলস দিনের হাওয়া’ গ্রন্থকারে প্রকাশিত হয়। বইটি ২০২০ সালে পুনর্মুদ্রিত হয় এবং এটি প্রবন্ধকারের দীর্ঘদিনের বন্ধু অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ারুল হক স্যারের অনুকূলে উৎসর্গিত হয়। দ্বিতীয় সংস্করণে প্রবন্ধের সংখ্যা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়নি। পত্রিকায় প্রকাশিত কলামগুলোর একটি বান্ডিল অসাবধানতাবশত জীর্ণ কাগজের বর্জ্য হিসেবে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ায় ‘অলস দিনের হাওয়া’ বৃহদায়তন কলেবর ধারণ করতে পারেনি। পত্রিকা অফিস থেকে সবগুলো কলাম সংগ্রহ করা কম ঝকমারি কাজ নয়। এসএমআই স্যারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখা এখনও গ্রন্থভুক্ত হতে পারেনি। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে আমি বাংলাদেশ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং সেন্টার লাইব্রেরিতে বসে করুণাময় গোস্বামী সম্পাদিত একটি পত্রিকায় চর্যাপদ থেকে সমকালীন বাংলা কাব্য সম্পর্কে এসএমআই স্যারের একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ পাঠ করেছিলাম। এ প্রবন্ধটি গ্রন্থ হিসেবে মুদ্রিত হলে কাব্যসাহিত্যের গবেষকগণ উপকৃত হতেন। কিন্তু অনবদ্য এ প্রবন্ধটি বিপুল পাঠকের দৃষ্টিসীমার বাইরে সংগোপিত রয়েছে।
কর্মজীবনে আমি এক বৎসরের অধিককাল এসএমআই স্যারের সঙ্গে কাজ করার বিরল সুযোগ লাভ করেছি। হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট (এইচ-ই-কিউ-ই-পি)-এ আমি কয়েক বছর কর্মরত থেকেছি এবং এসএমআই স্যার পরামর্শক হিসেবে ‘স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ফর হায়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ: ২০১৮-২০৩০’-এর পরিবর্ধন ও পরিমার্জনার দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে ‘স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ফর হায়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ: ২০১৮-২০৩০’ একটি অনন্য পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের ভেতর জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠন, জাতীয় গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউ-জি-সি)-কে উন্নীত করে উচ্চশিক্ষা কমিশন (এইচ-ই-সি) গঠন উল্লেখযোগ্য। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে স্থিরীকৃত হয়েছিল। এইচ-ই-কিউ-ই-পি-এর তৎপরতায় বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠিত হয় ও বর্তমানে তা বিধিবদ্ধ কার্য সম্পাদন করছে।
কর্মস্থলে প্রাজ্ঞ শিক্ষকের সাহচর্য অনেক সুফল বয়ে আনে। আমরা যখন এসএমআই স্যারের সাথে মতবিনিময় সভায় বসতাম তখন বিমল পরিবেশ বিরাজ করত। তিনি শান্ত থেকে আলোচ্য বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতেন, কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের অভিমত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন ও উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে ‘স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং’-এর গ্রহণযোগ্য রূপায়ণ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতেন। উল্লেখ্য যে ‘স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং’ প্রণয়নের জন্য প্রাথমিকভাবে ছয়টি কমিটি গঠন এবং কমিটির নিকট থেকে প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়েছিল। এসএমআই স্যার এ প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করেছেন এবং আমাদের সহযোগিতায় স্টেকহোল্ডারগণের সাথে আলোচনা করে সংকলকের ভূমিকা পালন করেছেন।
এসএমআই স্যার যা পড়িয়েছেন, শিখিয়েছেন সব কি স্মৃতির ভেতর প্রোজ্জ্বল? মোটেই না। যা শিখেছি তা বিস্মিত হলে কিছু থাকে কি? নিশ্চয়ই থাকে। আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী বি. এফ. স্কিনার তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন: ‘এডুকেশন ইজ হোয়াট সারভাইভ্জ হোয়েন হোয়াট হ্যাজ বিন লার্ন্ড হ্যাজ বিন ফরগটেন।’ স্কিনারের উক্তিটি শিক্ষার অন্তর্বস্তুর স্বরূপ উন্মোচন করে। প্রকৃত শিক্ষা নির্দিষ্ট তথ্য বা জ্ঞান অর্জন-ধারণের বিষয় নয়, বরং তা অনুধাবনশক্তি, নৈপুণ্য ও বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তির সমষ্টি যা সার্বক্ষণিকভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। শিক্ষা এমন একটি প্রক্রিয়া যা একজন শিক্ষার্থীর অনুচিন্তন, যুক্তি প্রদর্শনের শক্তি ও নতুন প্রতিবেশে অভিযোজিত হওয়ার ক্ষমতাকে উজ্জ্বল করে তোলে। অধ্যয়নের মাধ্যমে অর্জিত কোনো জ্ঞান সময়ের চলিষ্ণুতার সাথে ম্লান হতে পারে। কিন্তু শিক্ষার স্থায়ী প্রভাব অর্থাৎ বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বা স্বাধীনভাবে শিক্ষা গ্রহণের যোগ্যতা অক্ষয় হয়ে থাকে। স্কিনারের ভাষ্যানুযায়ী শিক্ষা তথ্য স্থানান্তরের প্রথাগত ধারণার পরিবর্তে এমন একটি পদ্ধতি যা শিক্ষার্থীদের চেতনার ভেতর স্থায়ী, মৌলিক গুণাবলির উন্মেষ ঘটায়। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার মধ্যে এমন একটি সম্পদ অনুসন্ধান করেছেন ‘যা কেবল আমাদের তথ্য দেয় না, সত্য দেয়; যা কেবল ইন্ধন দেয় না, অগ্নি দেয়।’
এসএমআই স্যার অসময়ে লোকান্তরিত হয়েছেন। তবে তিনি আমাদের স্নায়ুর ভেতর বহ্নিসুর জাগিয়ে তুলেছেন বলে আমরা জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে পেরেছি। তার প্রভাবে সমাজের একটি অংশ আলেকময় হয়েছে। মহীয়ান এ শিক্ষককে নিবেদন করছি আমার শ্রদ্ধা ও প্রণতি।